গত শুক্রবার এই চিঠি পাঠানো হয়। সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে বিরোধিতার জন্য বিরোধিতার সস্তা রাজনীতির চর্চর জন্য যে এমন চিঠি দেয়া হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক বিদ্যুৎ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খানের বিদ্যুৎ উৎপাদনে নেতিবাচক কিছু কর্মকা–ের কারণে বিপর্যয়কর বিদ্যুৎ সেক্টর পেয়েছে নতুন সরকার। ক্ষমতা গ্রহণের পর বিদ্যুৎ উৎপাদনে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। গতকালও দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১ নম্বর ইউনিটে আবারও বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়েছে। এই ইউনিট থেকে ৫০ থেকে ৫৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ হচ্ছে। গতকাল রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি ইউনিট চালুর খবর পাওয়া গেছে। চলতি মাসে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি ইউনিট চালু হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে বিরোধী দল জামায়াত সস্তা রাজনীতি করছে। অর্থনীতির মতোই বিদ্যুৎ সেক্টরকেও খাদের কিনারে রেখে গেছে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ।
হাসিনা পালানোর পর অন্তর্বর্তী সরকার সময় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সেক্টরকে গতিশীল করার কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। বরং সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান পায়রা বন্দরের কয়লা টার্মিনাল প্রকল্পটি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক না হওয়ার অজুহাত তুলে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে তা বাতিল করা হয়েছিল। অথচ কয়লার অভাবে রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎপাদন বন্ধ ছিল। ইসরাইল–ইরাক যুদ্ধে হরমুজ প্রণালী দিয়ে আমেরিকা অনুগত দেশগুলোর জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়ায় জ্বালানির বৈশ্বিক সংকট সৃষ্টি হয়। সেই সংকট এখনো কাটেনি। জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অথচ সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে জামায়াত সেটাকে আসন্ন স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন) রাজনৈতিক ইস্যু বানাতে চাচ্ছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চিত্র তুলে ধরে গত ১৪ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেছেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়; এটি একটি বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট। ইসরাইল ও ইরানের যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় কীভাবে এনার্জি ডাইভারসিফিকেশন করা যায়, কীভাবে জ্বালানি মজুত বাড়ানো যায় এবং ঘাটতি কীভাবে দূর করা যায় এসব বিষয়ে সরকার ইতিমধ্যে একটি কমিটি গঠন করেছে। দ্রুতই এব্যাপারে কিছু সিদ্ধান্ত নেবে। এর আগে ১৩ আগস্ট বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলা ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে আগামী ২০২৯ সালের মধ্যে পায়রা, মংলা এবং হিরণ পয়েন্টে নতুন তিনটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। জ্বালানি খাতে সরকার দ্রুতগতিতে কাজ করছে। তবে কিছু বিষয় সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলেও দিনরাত এ নিয়ে কাজ চলছে এবং খুব দ্রুতই সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে। মন্ত্রী আরো জানান, শিল্প খাতে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ ও সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকার ইতোমধ্যে তিনবার শিল্প উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। এই কঠিন সময়ে কাজের গতি ত্বরান্বিত করতে তিনি সকলের নৈতিক সমর্থন আহ্বান জানান। সৌরবিদ্যুৎ (সোলার) প্রকল্পগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে জাতীয় পর্যায়ের বিশাল বিদ্যুৎ ঘাটতি অনেকাংশে কমে আসবে।
সরকারের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সব ধরনের সুযোগ ও উৎসকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন। শিল্পকারখানা সচল রাখার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইন্ডাস্ট্রি না চললে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থমকে যাবে। তাই সরকার সব দিক থেকেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এদিকে গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ার মধ্যে সুখবর হলো, আমেরিকা থেকে আসা এলএনজিবাহী জাহাজ বিডাব্লিউ লেসমাস মহেশখালীর ভাসমান টার্মিনালে ভিড়েছে। নির্ধারিত সময়ের আগেই সেটি গত শুক্রবার টার্মিনালে নোঙর করছে। ওই জাহাজের এলএনজি দিয়ে রাতেই বন্ধ সামিট পাওয়ার লিমিটেডের টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরুর কথা জানিয়েছেন রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির একজন কর্মকর্তা। সেটি চালু হলে গ্যাস সরবরাহ বাড়তে পারে। জ্বালানি সংকট নিরসন ও বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে সরকার যখন নানামুখী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে তখন বিদ্যুৎ–জ্বালানি সংকট ইস্যুতে জনগণকে ক্ষেপিয়ে তোলার কৌশল নিয়েছে বিরোধী দল জামায়াত।
জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের শরীক এনসিপির আহবায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, এমপি হাসনাত আবদুল্লাহ এবং মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী দেশজুড়ে চলমান তীব্র বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটকে সরকারের পরিকল্পনাগত ব্যর্থতা ও অব্যবস্থাপনা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তারা সরকার পতনের আন্দোলনের হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, সরকার গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে এবং জনদুর্ভোগ কমাতে না পারলে তাদের ক্ষমতায় থাকতে দেয়া হবে না। ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টকে দেয়া চিঠিতে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, ‘বর্তমানে দেশজুড়ে তীব্র বিদ্যুৎ সংকট চলছে। লাগামহীন লোডশেডিংয়ের কারণে সাধারণ মানুষের জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি শিল্পোৎপাদন, ব্যবসা–বাণিজ্যসহ অর্থনৈতিক কর্মকা–ও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে এই সংকটকালে আমরা নীরব থাকতে পারি না। দেশের এই উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংসদে অর্থবহ আলোচনা ও আশু সমাধান খোঁজা অত্যন্ত জরুরি। বিদ্যুৎ নিয়ে বিরোধী দলের এতো মাথাব্যথা, অথচ দেশে ৪ কোটি বেকার, চাকরির জন্য ঘরে ঘরে হাহাকার; এ নিয়ে বিরোধী দলের মাথাব্যথা নেই।


