আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ৯ আগস্ট। ১৯৯৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বৈশ্বিক স্বীকৃতি ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিতের বার্তা নিয়ে দিবসটি পালনে স্বীকৃতি পায়। বিশ্বব্যাপী আদিবাসী জনগণ তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়, ভূমির অধিকার, আঞ্চলিক অধিকার, প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকার ও নাগরিক মর্যাদার স্বীকৃতির দাবিতে দিবসটি পালিত হয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হয়। তবে আজও সেই বার্তার বাস্তব প্রতিফলন পুরোপুরি দেখা যায়নি সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন জেলা উপজেলার চা বাগানগুলোতে বসবাসকারী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনে। যাদের অধিকাংশই চা শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। হবিগঞ্জের মাধবপুর ও চুনারুঘাট উপজেলার ২৩টি চা বাগানে বসবাস করছে বহু আদিবাসী পরিবারের সদস্য। প্রতিবছর দিবসটি আসে যে বার্তা নিয়ে তার তেমন প্রভাব নেই এই জনগোষ্ঠীর জীবনে।
এখানকার চা বাগানগুলোতে মুন্ডা, সাঁওতাল, দেববর্মা, ওঁরাও, রেলি, কল ও ভূমিজসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের হাজারো মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চা বাগানে শ্রম দিয়ে জীবনযাপন করলেও দারিদ্র্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সংকট এখনও তাদের নিত্যসঙ্গী। মাধবপুর উপজেলার নোয়াপাড়া, সুরমা, জগদীশপুর, তেলিয়াপাড়া ও চুনারুঘাটের আমু, নালুয়া, চন্ডিছড়া, বেগমখান, লালচান, পারকুল চা বাগানসহ বিভিন্ন এলাকায় অধিকাংশ আদিবাসী পরিবার জরাজীর্ণ বসতভিটা আর অল্পাহারে অর্ধাহারে জীবন কাটাচ্ছে। বিশুদ্ধ পানির সংকট, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা, শিক্ষা এবং মানসম্মত চিকিৎসাসেবার অভাব তাদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে। নোয়াপাড়া চা বাগানের শ্রমিক মালতি মুন্ডা জানান, প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করেও সংসারের প্রয়োজন মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে। অভাবের কারণে সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়াই তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্ব আদিবাসী দিবস সম্পর্কে তাদের জানা নেই বিশেষ কিছু। নালুয়া চা বাগানের জগেন সাঁওতাল নামে এক শ্রমিক বলেন, অসুস্থ হলে বাগানের হাসপাতাল থেকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়া যায় না।
উন্নত চিকিৎসার জন্য বাইরে যেতে হলে বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হয়, যা অধিকাংশ পরিবারের পক্ষেই সম্ভব নয়; ফলে অনেকেই যথাযথ চিকিৎসা ছাড়াই কষ্ট ভোগ করেন। আদিবাসী সমাজকর্মী সাধন সাঁওতাল বলেন, অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে বহু শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অনেক শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও আর্থিক সংকট ও সচেতনতার অভাবে মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। পাশাপাশি পুষ্টিহীনতা, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের মধ্যে একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের পাশাপাশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সামনে আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির অস্তিত্ব সংকট। সাতছড়ির আদিবাসী নেতা চিত্তরঞ্জন দেববর্মা বলেন, নতুন প্রজন্মের অনেকেই মাতৃভাষা ব্যবহার করছে না।
ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে তাদের ঐতিহ্যবাহী ভাষা, গান, নৃত্য ও সংস্কৃতির নানা উপাদান। তেলিয়াপাড়া চা বাগানের ইউপি সদস্য সাইমন মুরমু বলেন, শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে দিবস পালন করলেই হবে না। আদিবাসীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, সহজলভ্য চিকিৎসা, নিরাপদ পানি, বাসযোগ্য আবাসন এবং মাতৃভাষা সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলেই তাদের জীবনমানের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব হবে। এদিকে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে রোববার সকালে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উদযাপন কমিটি, চুনারুঘাটের উদ্যোগে উপজেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল– আদিবাসী জীবন ও ঐতিহ্যগত জ্ঞান সুরক্ষায় এগিয়ে আসুন। কমিটির সভাপতি চিত্তরঞ্জন দেববর্মার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন চুনারুঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গালিব চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সৈয়দ লিয়াকত হাসান, উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মীর সিরাজ, পৌর বিএনপির সভাপতি ফজলুল হক তরফদার, বাপা হবিগঞ্জ শাখার সভাপতি মনসুর উদ্দিন আহমেদ ইকবাল, সাবেক মেয়র নাজিম উদ্দিন সামসু, ধরা হবিগঞ্জ শাখার আহ্বায়ক তাহমিনা বেগম গিনি এবং পরিবেশ সংগঠক তোফাজ্জল।


