বহুল আলোচিত চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলায় খলনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল হক ডনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গতকাল সকালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সিআইডির ঢাকা মেট্রো পশ্চিমের বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএসপি) গোলাম বেনজীর জানান, সালমান শাহ হত্যা মামলার কারণে ডনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা ছিল। ইমিগ্রেশনের স্টপ লিস্টেও তার নাম ছিল। ওমরা হজে যাওয়ার সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদিকে, সালমান শাহ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার ডনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। গতকাল শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম মো. জুয়েল রানার আদালত এ আদেশ দেন। এর আগে, বিকালে তাকে আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন সিআইডির পরিদর্শক আরিফুর রহমান। রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পিপি ওমর ফারুক ফারুকী শুনানিতে বলেন, ‘আসামি ডন দীর্ঘদিন পলাতক ছিল। আজ (রবিবার) সে বিদেশে পালিয়ে যাচ্ছিল। বিমানবন্দর থেকে তাকে সিআইডি আটক করেছে। এ আসামি সরাসরি হত্যাকাণ্ডে জড়িত।’ পিপি ওমর ফারুক শুনানিতে দাবি করেছেন, সালমান শাহকে হত্যার জন্য খলনায়ক ডনের সঙ্গে ১২ লাখ টাকায় চুক্তি করেছিলেন শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই। তার দাবি, রিজভী আহমেদ নামে মামলার এক আসামি অন্য একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় দেওয়া স্বীকারোক্তিতে বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। পিপি শুনানিতে আরও বলেন, অপর একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় রিজভী আহমেদ স্বীকারোক্তি দিয়েছেন।
সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, সালমান শাহর স্ত্রী সামিরার সঙ্গে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের গোপন সম্পর্ক ছিল। সেই সম্পর্কের জেরেই আজিজ মোহাম্মদ ভাই সালমান শাহকে হত্যার জন্য ডনের সঙ্গে ১২ লাখ টাকায় চুক্তি করেন বলে স্বীকারোক্তিতে দাবি করা হয়েছে। শুনানিতে আসামি পক্ষে কোনো জামিন আবেদন না থাকায় আসামি ডনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। গত বছরের ২০ অক্টোবর সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তার ভাই মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম রমনা থানায় সালমানের স্ত্রী সামিরা হক, সামিরার মা লতিফা হক লিও ওরফে লুসি ও খলনায়ক আশরাফুল হক ডনসহ ১১ আসামির বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। আদালত পরে সিআইডিকে মামলাটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। প্রসঙ্গত, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনের বাসায় চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন ওরফে সালমান শাহ মারা যান। এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেছিলেন তার বাবা প্রয়াত কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। পরে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ করে মামলাটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন জানান তিনি। অপমৃত্যু মামলার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের বিষয়টি একসঙ্গে তদন্ত করতে সিআইডিকে নির্দেশ দেন আদালত। ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় সিআইডি। প্রতিবেদনে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করা হয়।
ওই বছরের ২৫ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন গৃহীত হয়। সে সময় সিআইডির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে তার বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী রিভিশন মামলা দায়ের করেন। পরে মামলার তদন্ত চলে যায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই)। দীর্ঘ তদন্ত ও ৪৪ জনের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে পিবিআই ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। এতে বলা হয়, চিত্রনায়ক সালমান শাহকে হত্যা করা হয়েছে এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি, পারিবারিক কলহ ও মানসিক যন্ত্রণার কারণে তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন। সালমান শাহের আত্মহত্যার কারণ প্রসঙ্গে তখন পিবিআই কর্মকর্তারা বলছেন, আত্মহত্যার কারণগুলোর মধ্যে আমরা তদন্তে পেয়েছি– সালমান শাহ ও চিত্রনায়িকা শাবনূরের অতিরিক্ত অন্তরঙ্গতা, স্ত্রী সামিরার সঙ্গে দাম্পত্য কলহ, মাত্রাধিক আবেগপ্রবণতার কারণে একাধিকবার আত্মঘাতী হওয়ার বা আত্মহত্যার চেষ্টা, মায়ের প্রতি অসীম ভালোবাসা, জটিল সম্পর্কের বেড়াজালে পড়ে পুঞ্জীভূত অভিমানে রূপ নেওয়া এবং সন্তান না হওয়ায় দাম্পত্য জীবনে অপূর্ণতা। তখন এক প্রতিক্রিয়ায় সালমানের মা নীলা চৌধুরী ও মামা আলমগীর কুমকুম পিবিআইয়ের এই প্রতিবেদনকে ‘মনগড়া, ভিত্তিহীন ও সাজানো নাটক’ বলে অভিহিত করেছিলেন। গত বছরের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক বাদীপক্ষের করা রিভিশন মঞ্জুর করে মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। পরে ঢাকার রমনা থানায় মামলাটি করা হয়। মামলার অগ্রগতি এবং ডনের গ্রেপ্তার ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে বহুল আলোচিত এই মৃত্যুরহস্য।



