তিন দিনের টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরীর অনেক এলাকায় পানি জমেছে। কোথাও হাঁটুসমান, আবার কোথাও কোমরপানি। এতে দৈনন্দিন স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে চাকরি, ব্যবসা–বাণিজ্য। রোজগার বন্ধ হওয়ায় নিম্নআয়ের মানুষ পড়েছেন বেশি ভোগান্তিতে। নগরীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও বন্ধ রয়েছে। নগরীর পুলিশ লাইন্স থেকে এক কিলোমিটারের মধ্যেই শান্তিবাগ আবাসিক এলাকা। নামে ‘শান্তিবাগ’ হলেও এই এলাকার ৩ নম্বর লেনের বাসিন্দারা তিন দিন ধরে আছেন অশান্তিতে। ১২ বছর বয়সী ইয়ানুর আক্তার স্কুলে যেতে পারছে না। তার ভাই মুনতাহা ইসলাম ও মোস্তাকিম ইসলামের দিন কাটছে খাটের ওপর শুয়ে–বসে। কেননা, তাদের খাটের নিচে হাঁটুসমান আর ঘরের সামনে কোমরপানি। বাবা না থাকায় মা রেখা বেগমের সঙ্গে এখানে থাকে তারা। সঙ্গে থাকেন রেখা বেগমের খালাতো ভাই তামিম হাসান। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গিয়ে দেখা যায়, খাটে বসে চিড়া–মুড়ি খাচ্ছেন তামিম হাসান। কেমন আছেন জানতে চাইলে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন।
ঘরের সামনে থাকা পানিতে দাঁড়িয়ে ছাড়েন দীর্ঘশ্বাস। আঞ্চলিক ভাষায় বলেন, ‘তিন দিন ধরি দোজখত আছি। রান্দির ন পারি। গোসলও গড়ির ন পারি। ঘরর সামনে কোর হমান পানি। ঘরের ভেতরও পানি আর পানি। কমোডের ভিতর দিয়েরে পানি ঢুকের ঘরের ভিতররত। কোনো কিছু দি মানাইর ন পারি। ঘণ্টাখানিক পর পর বালতি দিয়েরে পানি হিচন পরের আঁরারে।’ তামিম হাসান যখন কথা বলছিলেন তখন পানি থইথই করছিল শান্তিবাগ আবাসিক এলাকায়। এখানে ঘর তুলে ২০টি পরিবারকে ভাড়া দিয়েছেন ইউসুপ সাহেব নামের এক ব্যক্তি। পাশে খাল থাকায় এসব ঘরে পানি ওঠে প্রতি জোয়ারে। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি এই পানিকে বাড়িয়ে দিয়েছে দ্বিগুণ। শুধু শান্তিবাগ আবাসিক এলাকা নয়, নগরীর পাঁচলাইশ ও ইপিজেডসংলগ্ন নেভি কলোনি এলাকার বেশির ভাগ বাসিন্দা এখনও জলাবদ্ধতার কারণে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। নেভি হাসপাতালের পাশেই বহুতল ভবনের কলোনি।
সেখানে পরিবার নিয়ে যারা থাকেন তাদের বেশির ভাগই চাকরি করেন নৌবাহিনীতে। বহুতল এই ভবনের বাসিন্দারাও তিন ধরে আছেন বিপদে। গতকাল বিকেলেও সারি সারি দালানের নিচে পানি টলমল করছিল। কলোনির পাশেই স্টেশনারি দোকান শরিফুল ইসলামের। তিনি বলেন, কলোনিতে থাকা একেকটি ভবন ৮–৯ তলা। তিন দিন ধরে বাজার সদাই করতে নামতে পারছেন না সেখানকার বাসিন্দারা। সোমবার থেকে এখানে পানি বাড়তে থাকে। বৃষ্টি যত বেড়েছে পানি তত বেড়েছে। একপর্যায়ে কোমরসমান পানি হয় আশপাশের এলাকাতে। বৃহস্পতিবার কিছুটা কমলেও এখনও পানিতে ভাসছে পুরো কলোনি। পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকাতেও পানি আছে এখনও। আগের দিনের তুলনায় কিছুটা কমলেও গতকালও পানিবন্দি ছিল এখানকার মানুষ। এই এলাকার বেশির ভাগ দোকানে পানি উঠেছে। নষ্ট হয়েছে অনেকের জিনসপত্র। নিজের ওষুধের দোকান থেকে পানি সেচছিলেন মোহাম্মদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘বৃহস্পতিবার রোদের দেখা পেয়েছিলাম কিছুক্ষণ। কিন্তু সন্ধ্যা থেকে আবার অঝোরে নেমেছে বৃষ্টি।
এ কারণে আবার পানি ঢুকেছে দোকানে। গত তিন দিন দোকান থেকে পানি সেচতে সেচতেই দিন গেছে আমার।’ কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিতে তিন দিন ধরে দুর্ভোগের নগরীতে পরিণত হয়েছে চট্টগ্রাম। পানি ঢুকে পড়ায় নগরের বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস কিংবা পরীক্ষা হয়নি। এইচএসসি পরীক্ষাও অনুষ্ঠিত হয়নি। বিমান চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও চট্টগ্রাম–কক্সবাজার রুটে বন্ধ ছিল ট্রেন চলাচল। চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে পণ্য ওঠানামা করলেও বহির্নোঙরে বুধবারও ব্যাহত হয়েছে পণ্য খালাস কার্যক্রম। টানা বৃষ্টিতে নগরের মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, মোহাম্মদপুর, চকবাজার, আগ্রাবাদ, হালিশহর, রামপুরা, বেপারীপাড়া, মুহুরীপাড়া, উত্তর কাট্টলী, দেওয়ান বাজার, কাপাসগোলা, শান্তিবাগ, পাঠানটুলি, পুলিশ লাইন্স, এয়ারপোর্ট, চান্দগাঁও, মোহরা, কুয়াইশ, অক্সিজেনসহ বেশকিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও হাঁটুসমান, আবার কোথাও কোমরপানি জমে যায়।


