মায়ামিতে লিওনেল মেসি পাড়ি জমান ২০২৩ সালে। ইউরোপ ছেড়ে আমেরিকায় পাড়ি দেওয়ায় অনেক মেসিভক্তই তখন কিছুটা হতাশ ছিলেন। কিন্তু লিওনেল মেসির ছিল ভিন্ন পরিকল্পনা। উত্তর আমেরিকায় বিশ্বকাপ নিয়ে তখনই ভেবেছিলেন তিনি। ভেবেছিলেন, আর্জেন্টিনাকে নিয়ে আরও একবার বিশ্বকাপের মঞ্চে উৎসব করার কথা। দিনে দিনে লিওনেল মেসি সেই লক্ষ্য পূরণের পথেই ছুটছেন। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে আর্জেন্টিনা। ‘কেপ ভার্দে’ শঙ্কা কাটিয়েছে তারা। শেষ ৩২–এর লড়াইয়ে জয় পেয়েছে ৩–২ ব্যবধানে। কষ্টের এ জয়টাই আর্জেন্টিনাকে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে দিয়েছে আরও অনেকটা। ফুটবল মাঝেমধ্যে অবিশ্বাস্য গল্প লেখে। এমন গল্প, যেখানে পরিসংখ্যান হার মানে আবেগের কাছে। যেখানে ছোট্ট একটি দেশ কয়েক মুহূর্তের জন্য থামিয়ে দেয় বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের শ্বাস। আর সেই গল্পের শেষ অধ্যায়ে আবারও মুক্তিদূত হয়ে হাজির হন লিওনেল মেসি। মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে কেপ ভার্দের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ম্যাচটি ছিল তেমনই। একদিকে বিশ্বকাপের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন। অন্যদিকে মাত্র ৫ লাখের কিছু বেশি মানুষের একটি দেশ।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে দুই দলের ব্যবধান ছিল ৬৭ ধাপ। কাগজ কলমে ম্যাচটি হওয়ার কথা ছিল একপেশে। কিন্তু ফুটবল তো আর কাগজে খেলা হয় না। মেসির অসাধারণ গোলে এগিয়ে গিয়েছিল আর্জেন্টিনা। মনে হচ্ছিল, পরিচিত ছন্দেই খেলবে আর্জেন্টিনা। কিন্তু অদম্য কেপ ভার্দে হাল ছাড়েনি। একবার নয়, দুবার সমতায় ফিরেছে তারা। বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় অঘটনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল আফ্রিকার ছোট্ট দেশটি। কিন্তু ঘানার তান্ত্রিকের ভবিষ্যদ্বাণী আর কেপ ভার্দে প্রেসিডেন্টের আশার গুড়ে বালি নিক্ষেপ করলেন লিওনেল মেসি। গ্যালারিতে তখন নিস্তব্ধতা। কোটি কোটি আর্জেন্টাইন সমর্থকের বুকের ভিতর কাঁপন। বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা কি তবে বিদায় নিতে যাচ্ছে? ঠিক এমন সময় বোঝা যায়, কেন আর্জেন্টিনাকে এত সহজে হারানো যায় না। এই দলটি হাল ছাড়তে জানে না। কোচ লিওনেল স্কালোনির কথাতেই যেন সেই সত্যের প্রতিধ্বনি, ‘আমাদের দল কখনো হাল ছাড়ে না।’ অতিরিক্ত সময়ের ১১১ মিনিটে ভাগ্যও যেন সাহসীদের পক্ষ নিল। লিওনেল মেসির কর্নার কিকের পর রোমেরোর চাপ সামলাতে না পেরে আত্মঘাতী গোল করলেন কেপ ভার্দের বোর্হেস। সেই এক মুহূর্তেই বেঁচে গেল আর্জেন্টিনা। বেঁচে গেল মেসির স্বপ্নও। মেসি এবারও গোল করলেন। বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা আরও বাড়ল। কিন্তু এই রাতটি শুধু গোলের নয়। এই রাতটি ছিল নেতা মেসির। যখন সতীর্থদের চোখে উদ্বেগ, তখনো তার চোখে ছিল বিশ্বাস। যেন তিনি জানতেন, এই গল্পের শেষটা এখনো লেখা হয়নি। আসলে মেসির ক্যারিয়ারটাই এমন। কখনো কাঁদিয়েছে, কখনো হাসিয়েছে। ২০১৪ সালে বিশ্বকাপ ট্রফির সামনে দাঁড়িয়ে অপূর্ণতার দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলেন।
২০২২ সালে সেই ট্রফি বুকে জড়িয়ে পূর্ণ করেছিলেন জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। আর এবার! ৩৯ বছর বয়সেও তিনি একই আবেগ নিয়ে ছুটছেন আরেকটি অসম্ভব স্বপ্নের পেছনে। আর্জেন্টিনা এখন টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখছে। ১৯৬২ সালে ব্রাজিলের পর আর কোনো দল এই কীর্তি গড়তে পারেনি। সামনে অপেক্ষা করছে মিসর। তারপর আরও কঠিন পথ। কিন্তু এই ম্যাচ আরেকটি শিক্ষা দিয়ে গেল। ফুটবলে ছোট–বড় বলে কিছু নেই। কেপ ভার্দে হারলেও কোটি মানুষের হৃদয় জিতে নিয়েছে। আর আর্জেন্টিনা বুঝেছে, বিশ্বকাপে এক মুহূর্তের অসতর্কতাও কতটা ভয়ংকর হতে পারে। তবু শেষ পর্যন্ত আলোটা আবারও গিয়ে পড়েছে একজনের ওপর। তার নাম লিওনেল মেসি। তিনি হয়তো আর আগের মতো ৯০ মিনিট দৌড়ে বেড়ান না। কিন্তু একটি স্পর্শ, একটি পাস কিংবা একটি গোলেই পুরো ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারেন। তিনি মাঠে থাকলে আর্জেন্টিনা কখনো বিশ্বাস হারায় না। সমর্থকরাও না। কারণ তারা জানে, শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত মেসির ওপর আস্থা রাখা যায়। এই বিশ্বাসই আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি।



