নিউ ইয়র্ক টাইমস–এর এক প্রতিবেদনকে সমর্থন করে সৌদি গোয়েন্দা সূত্রটি জানিয়েছে, সৌদি আরবের অঘোষিত শাসক ও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস) ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পরামর্শ দিয়েছেন যেন তিনি ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ মাঝপথে থামিয়ে না দেন। সৌদি আরবের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই যৌথ অভিযান মধ্যপ্রাচ্যের ভূ–রাজনীতিকে নতুন করে সাজানোর একটি ‘ঐতিহাসিক সুযোগ’। মঙ্গলবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প সৌদি যুবরাজের এই ভূমিকার বিষয়ে কিছুটা ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন, “হ্যাঁ, তিনি (এমবিএস) একজন যোদ্ধা। সে আমাদের সঙ্গেই লড়াই করছে।” যদিও এখন পর্যন্ত এই যুদ্ধে সৌদি আরবের সরাসরি কোনও সামরিক সংশ্লিষ্টতার খবর পাওয়া যায়নি, তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তানের নেতৃত্বে চলমান শান্তি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে রিয়াদ সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। সৌদি ভূ–রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোহাম্মদ আলহামেদ বলেন, “এখন সবকিছু নির্ভর করছে ইরানের সিদ্ধান্তের ওপর। ইরান যদি শর্তগুলো মেনে নিয়ে আলোচনায় বসে, তবে উত্তেজনা কমানোর পথ খোলা আছে। কিন্তু তারা যদি শর্ত প্রত্যাখ্যান করে হামলা চালিয়ে যায়, তবে সৌদি আরব আর বসে থাকবে না।”
তিনি আরও বলেছেন, সৌদি আরব হুট করে কোনও সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না, বরং তারা প্রতিটি পদক্ষেপ বিবেচনা করে দেখছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল যুদ্ধে সৌদি আরব ইতোমধ্যে আক্রান্ত হয়েছে। এক সপ্তাহ আগে সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলের ইয়ানবু তেল শোধনাগারে ইরানের ড্রোন আঘাত হেনেছে। পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি ইরান কার্যত বন্ধ করে দিলেও সৌদি আরব লোহিত সাগরের পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল রফতানি সচল রাখতে পেরেছে। কিন্তু ইয়ানবুতে হামলা চালিয়ে তেহরান আসলে রিয়াদকে এই বার্তাই দিয়েছে যে, তাদের এই অর্থনৈতিক লাইফলাইনও নিরাপদ নয়। এছাড়া ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা যদি এই যুদ্ধে যোগ দেয়, তবে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে। শিয়া ও সুন্নি বিশ্বের নেতৃত্ব নিয়ে ইরান ও সৌদি আরবের দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের।
২০০৮ সালের একটি গোপন মার্কিন নথি অনুযায়ী, তৎকালীন সৌদি বাদশাহ আবদুল্লাহ ইরানকে নির্দেশ করে যুক্তরাষ্ট্রকে বলেছিলেন, ‘সাপের মাথা কেটে ফেলুন’। সৌদি নির্বাসিত বিশ্লেষক খালিদ আলজাবরি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রিয়াদ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের পক্ষপাতী ছিল। কিন্তু যখন যুদ্ধ শুরু হয়েই গেছে, তখন আহত সিংহ (ইরান) আরও বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তিনি আরও বলেন, ‘নীতিটি ছিল এমন, যুদ্ধ শুরু করবেন না, কিন্তু যদি শুরু করেই ফেলেন, তবে কাজটি শেষ করে তবেই থামুন।’ বিশ্লেষকদের মতে, মোহাম্মদ বিন সালমান ট্রাম্পের ওপর বিশাল বিনিয়োগ করেছিলেন এই আশায় যে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। কিন্তু ২০১৯ সালে সৌদি তেল স্থাপনায় বড় হামলার পর ট্রাম্প প্রশাসন কেবল মৌখিক সমর্থন দিয়েছিল, কোনও সামরিক প্রতিশোধ নেয়নি।
সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই সৌদি আরব চীনের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করেছিল যাতে কোনও যুদ্ধে ইরান সরাসরি সৌদি আরবের ওপর হামলা না করে। ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস–এর ফেলো এলি গেরানমায়েহ বলেন, ‘এমবিএস তার সব বাজিতেই হেরেছেন। তিনি ট্রাম্পের পরিবার ও হোয়াইট হাউসে বিনিয়োগ করেছিলেন, কিন্তু দিনশেষে দেখা যাচ্ছে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের চাওয়াকে উপেক্ষা করে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ইচ্ছাই প্রাধান্য পাচ্ছে।’ অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতোমধ্যে ইরানের চূড়ান্ত সামরিক পরাজয় দাবি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত আমিরাতি রাষ্ট্রদূত ইউসেফ আল ওতাইবা বলেন, ‘শুধু একটি যুদ্ধবিরতিই যথেষ্ট নয়। ইরানের সব ধরণের হুমকি নির্মূল হয় এমন একটি চূড়ান্ত ফলাফল আমাদের প্রয়োজন।’ সৌদি আরব এখন এক কঠিন দ্বিধায়। সরাসরি যুদ্ধে জড়ালে তাদের লোহিত সাগরের পাইপলাইনও ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। গেরানমায়েহ বলেন, ‘বোমা বর্ষণ বন্ধ হলে রিয়াদকে গভীরভাবে ভাবতে হবে। এটি কেবল যুক্তরাষ্ট্রকে দূরে ঠেলে দেওয়া নয়, বরং নিজের হাতে আরও বিকল্প রাখা নিয়ে।’



