ব্যাংক খাতে মন্দ ঋণের পাহাড় জমেছে। বর্তমানে ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৯৪ শতাংশই মন্দমানের। অর্থাৎ যে ঋণগুলো ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে কম, সেগুলোর সিংহভাগই খেলাপি ঋণ। টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ এখন প্রায় ৫ লাখ ২৪ হাজার কোটি টাকা। গত এক বছরে এই ঋণ বেড়েছে প্রায় ২ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা। আর মন্দঋণে আধিক্যের কারণে বিপুল অঙ্কের নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) ঘাটতিতে রয়েছে খাতটি। গত ডিসেম্বর শেষে প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে এক লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকা। সূত্রগুলো বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে জাল–জালিয়াতি ও যোগসাজশের মাধ্যমে ঋণের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট ও বিদেশে পাচার হয়েছে। এসব ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় জামানত না থাকায়, তা আদায়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে সেগুলোকে মন্দমানে চিহ্নিত করছে ব্যাংকগুলো। এ কারণে মন্দঋণের হার অস্বাভাবিক বেড়েছে। অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মন্দমানের ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা খুব কম থাকে। ফলে এ মানের ঋণ বাড়লে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ সক্ষমতা কমে যায়। কারণ এর বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন রাখতে হয়, যা তাদের নিট আয়ে প্রভাব ফেলে। এতে দুর্বল হয়ে পড়ে ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি। অন্যদিকে মন্দঋণের কারণে ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যবস্থাপনার ব্যয়ও বাড়ছে।
অর্থাৎ বিপুল পরিমাণের মন্দঋণ বৃদ্ধি ব্যাংক খাতের গভীর অসুস্থতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী, ঋণ শ্রেণিকরণের তিনটি ধাপ রয়েছে। খেলাপি হওয়ার পর তিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত নিম্নমান, ছয় থেকে ১২ মাস পর্যন্ত সন্দেহজনক এবং ১২ মাসের বেশি সময় খেলাপি থাকলে তা মন্দঋণ বা আদায় অযোগ্য ঋণ হিসাবে চিহ্নিত হয়। এই তিনটি পর্যায় বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংকগুলোকে নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) সংরক্ষণ করতে হয়। এর মধ্যে নিম্নমান ঋণের বিপরীতে ২০ শতাংশ, সন্দেহজনকের বিপরীতে ৫০ শতাংশ এবং মন্দমান বা ক্ষতিজনক ঋণের বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন রাখতে হয়।
কেন বাড়ছে মন্দঋণ : খাতসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুর্বল ঋণ মূল্যায়ন ও উপযুক্ত জামানতের অভাব, রাজনৈতিক প্রভাব, ইচ্ছাকৃত খেলাপিপ্রবণতা এবং দীর্ঘদিনের মামলাজট, ইত্যাদি কারণে ঋণ দ্রুত মন্দমানে পরিণত হচ্ছে। আবার দীর্ঘ সময় ধরে পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠন সুবিধা নিয়েও বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান ঋণ ফেরত না দেওয়ায় সেগুলো আবার খেলাপি হয়ে মন্দমানের কাতারে নেমে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছ ১৭ লাখ ১১ হাজার ৪০২ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপির পরিমাণ ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকা; যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। এর মধ্যে মন্দমানে খেলাপি হয়েছে ৫ লাখ ২৩ হাজার ৭১২ কোটি টাকা। এটি মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৯৪ শতাংশ। প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, নীতি সহায়তা ও শিথিল নীতিমালার আওতায় ঢালাও পুনঃতফসিল ও অবলোপন বৃদ্ধি পাওয়ায় শেষ তিন মাসে খেলাপি ঋণের সঙ্গে মন্দঋণ কমলেও শতকরা হিসাবে বেড়েছে। গত সেপ্টেম্বরে মন্দঋণের হার ছিল ৮৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ। ডিসেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৩ দশমিক ৯৯ শতাংশে। আর এক বছরের হিসাবে মন্দঋণের পরিমাণ ও হার দুটোই বেড়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংক খাতে মন্দমানের খেলাপি ঋণ ২ লাখ ৯১ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা বা ৮৪ দশমিক ৩২ শতাংশ।
ফলে গত এক বছরের ব্যবধানে মন্দঋণ বেড়েছে ২ লাখ ৩২ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, মন্দঋণ হলো খেলাপি ঋণের সর্বশেষ ও সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণি। যেসব ঋণ আদায়ের আর কোনো বাস্তব সম্ভাবনা নেই, সেগুলোই এই শ্রেণিতে পড়ে। অর্থাৎ এগুলো কার্যত ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদ, যেগুলো পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, মন্দঋণের বিপরীতে ১০০ শতাংশ প্রভিশন সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক। কিন্তু ব্যাংকগুলো সেই পরিমাণ প্রভিশন রাখতে পারছে না বলেই বড় ধরনের প্রভিশন ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই ঘাটতি সরাসরি ব্যাংকের আয় ও মূলধনের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। আমানতকারীদের ঝুঁকি প্রসঙ্গে ড. তৌফিক আহমেদ বলেন, ব্যাংকের আয় থেকেই প্রভিশন রাখতে হয়। ফলে বিপুল অঙ্কের মন্দঋণ থাকলে এবং যথাযথ প্রভিশন সংরক্ষণ না হলে আমানতকারীদের অর্থও পরোক্ষভাবে ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। কারণ, এতে ব্যাংকের মুনাফা কমে যায় এবং আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হয়।
তিনি আরও বলেন, নীতিনির্ধারকদের উচিত ছিল খেলাপি ঋণের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া; কিন্তু বাস্তবে বারবার নীতিগত সুবিধা বা প্রণোদনা দেওয়ার মাধ্যমে খেলাপিদের সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। এতে বাজারে একটি ভুল বার্তা যায় যে, শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সরকার কোনো না কোনোভাবে উদ্ধার করবে। তারমতে, কাগজে–কলমে খেলাপি ঋণের হার কমানো গেলেও যদি প্রকৃত আদায় না বাড়ে, তাহলে সমস্যার সমাধান হয় না। বরং এতে দায়ীদের জন্য এক ধরনের প্রণোদনা তৈরি হয়। প্রকৃত সংস্কার ও কঠোর জবাবদিহিতা ছাড়া মন্দঋণের সংকট কাটানো সম্ভব হবে না বলেও মনে করেন তিনি।
প্রভিশন ঘাটতির ফাঁদ : মন্দঋণের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো–এগুলো থেকে অর্থ আদায়ের সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। ফলে ব্যাংকগুলোকে নিয়ম অনুযায়ী এই ঋণের বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন রাখতে হয়। কিন্তু বাস্তবে প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে বিশাল অঙ্কের। গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯১ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা। গত এক বছরের ব্যবধানে এই ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ৮৫ হাজার ৩১১ কোটি টাকা। যদিও শেষ তিন মাসে কাগুজে খেলাপি ঋণ কমার কারণে প্রায় ১ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৯ কোটি টাকার মতো প্রভিশন ঘাটতি কমেছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রভিশন ঘাটতি বেশি থাকলে ব্যাংকের মুনাফা কমে যায়, মূলধন চাপের মুখে পড়ে এবং নতুন ঋণ বিতরণে সক্ষমতা হ্রাস পায়। ফলে সামগ্রিকভাবে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।



