উপস্থিত সম্মানিত শুধীবৃন্দ, আন্তরিক সালাম ও শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করছি।
স্বীকার করতে হবে, আজ আমরা সকলেই ভাগ্যবান সম্প্রদায়, তার প্রধান কারণ হল, অদ্যাবধি আমরা সকলেই বেঁচে আছি; কথায় বলে যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে তেমন নয়, যে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে জীবদ্দশায়; শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করার পর আমাদের হাতে আর কিছুই করার থাকবে না। আমরা নিজেরাই হয়ে যাব নিথর অকেজো মাংস পিন্ড। কথায় বলে হাতী মারা গেলেও লাখ টাকা, আমরা সকলেই মানুষ, খোদার হাতে সৃষ্ট। তিনি এক বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে মানুষ সৃষ্টি করেছেন, তা সকলেই স্বীকার করে থাকেন। মানুষ নির্মিত হয়েছে খোদার সুরতে ও তাঁর স্বীয় প্রতিনিধি হিসেবে। যেহেতু খোদা হলেন অদৃশ্য এক রূহানী সত্ত্বা, যাকে চর্মচোখ দিয়ে দর্শন করা সম্ভব নয়, তাই মানুষ হবে তাঁর দৃশ্যমান প্রতিচ্ছবি। কিতাবের আলোকে সৃষ্টি রহস্য নিয়ে গবেষণা করা হলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে।
দুঃখের বিষয় হলো, মানুষের যাত্রারম্ভ থেকে তারা চরমভাবে ধোঁকা খেল খোদার দুষমন ইবলিসের দ্বারা। খোদার নিষেধ অমান্য কর ইবলিসের পরামর্শমত তারা কাজ করে বসল। ফল স্বরুপ তাদের অপরাধ বোধ জাগ্রত হলো, এবং বুঝতে পারলো, তারা উলঙ্গ। নিজেদের উলঙ্গতা ঢেকে রাখার জন্য ব্যার্থ প্রচেষ্টা করলো ঘাগড়াপাতা দিয়ে আবরু তৈরী করার। অবাধ্যতার পাপ তাদের হৃদয়ে উপ্ত হলো। পাপের বীজ অংকুরীত হয়ে ফুলে ফলে শাখা–প্রশাখা প্রবৃদ্ধি লাভ করতে শুরু করলো। ভাই ভাইকে কতল করে জঘণ্য পাপী হিসেবে প্রমাণীত হলো। বর্তমান বিশ্ব নিজেই প্রমাণ বহন করছে, আমরা আর খোদার প্রতিনিধি থাকতে পারলাম না, বরং কুলটা ইবলিসের খাস নোমায়েন্দা হিসেবে নরকপুরী পরিচালনা করে চলছি। ঐশি বিবেক বা সততা সতজ্ঞান বলতে কিছুই অবশিষ্ট নেই আমাদের হৃদয়ে। নিজেরা একান্ত স্বার্থপর। খোদার আদর্শ পরিহার করে শয়তানের মন্ত্রনানুযায়ী নরবিধ্বংসী কাজে নিয়ত গবেষণা করে চলছি। মানুষের হাতে বর্তমানে এমন মারনাস্ত্র আছে, যার একটা বিষ্ফোরিত হলো লক্ষকোটি প্রাণ একমূহুর্তে ঝরে পড়বে।
খোদার পরিকল্পনা হলো মাত্র একজন মানুষের ঔরষ থেকে গোটা বিশ^মানব সৃষ্টি, যেন তারা সকলে স্বজন–প্রিয়জন পারষ্পরিক প্রেম সহমর্মীতা নিয়ে জগতে বসবাস করে, যা হলো খোদার মুল পরিকল্পনা। খোদা ও মানুষের দুষমন তা বাস্তবায়ন করতে দিল না। আজ মানুষ পরষ্পর সাপ নেউলে সম্পর্ক নিয়ে বিশ^টা নৃশুণ্য করার ফিকিরে ব্যস্ত। প্রেমের বিপরীতে তাদের মধ্যে স্বার্থপরতা হিংসা বিদ্বেষ নিয়ে মেতে থাকে সদাসর্বদা।
তথাপি এখন পর্যন্ত আমরা বেঁচে আছি, আর এটাই হলো আমাদের জন্য একটা অপূর্ব সুযোগ। মাবুদের কাছে ফিরে যাবার মানুষের মত মানুষ হিসেবে আবার আমরা বাঁচতে পারব, যে কথা তিনি কালামের আলোকে আমাদের জ্ঞাত করে চলছেন। যেমন কালামপাকে রয়েছে, “তখন আমার লোকের যাদের আমরা বান্দা বলে ডাকা হয়, তারা যদি নম্র হয়ে মুনাজাত করে ও আমার রহমত চায় এবং খারাপ পথ থেকে ফেরে, তবে বেহেশত থেকে তা শুনে আমি তাদের গুনাহ মাফ করব এবং তাদের দেশের অবস্থা ফিরিয়ে দেব” (২খান্দাননাম ৭:১৪) “মাবুদ কাছে থাকতেই তাঁর দিকে ফির; তিনি কাছে থাকতে থাকতে তাঁকে ডাক। দুষ্ট লোক তার পথ ত্যাগ করুক আর খারাপ লোক তার সব চিন্তা ত্যাগ করুক। সে মাবুদের দিকে ফিরুক, তাতে তিনি তার উপর মমতা করবেন; আমাদের আল্লাহ্র দিকে ফিরুক, কারণ তিনি সম্পূর্ণভাবেই মাফ করবেন” (ইশাইয়া ৫৫ : ৬–৭)।
পাপের বিষক্রিয়া বুঝতে পারে না বলে এমন কোনো মানুষ আছে কি? চলার পথে নানাবধি ঘাত–প্রতিঘাতে আমরা চরম শিক্ষা লাভ করে থাকি। আমরা পরিষ্কারভাবে বুঝতে পেরেছি, মানুষ খুন করার মধ্যে খোদার সত্য প্রতিষ্ঠা পেতে পারে না; বরং প্রেম ও ক্ষমার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে হারিয়ে যাওয়া ভ্রাতৃত্ত্ব ও সহমর্মীতা। আমাদের কৃত পাপ অপরাধের জন্য যখন অনুতাপানলে জ¦লেপুড়ে অঙ্গার হই ঠিক তখন মাবুদ আমাদের পুনর্গঠনের জন্য এগিয়ে আসেন। তাঁর ছায়া তলে লাভ করে থাকি পরম তৃপ্তি। “সেই সময় বনি–ইসরাইলরা বলেছিল যে, মাবুদ দূর থেকে তাদের দেখা দিয়েছিলেন। তখন মাবুদ তাদের বলেছিলেন, অশেষ মহব্বত দিয়ে আমাদের তোমাদের মহব্বত করেছি; অটল মহব্বত দিয়ে আমি তোমাদের কাছে টেনেছি” (ইয়ারমিয়া ৩১ : ৩)।
যেহেতু মাবুদ মাওলা আমাদের সৃষ্টি করেছেন কেবল তাঁরই প্রতিনিধিত্ব করার জন্য, তথাপি আমরা মাংসিক কামনা–বাসনা চরিতার্থ করার টানে নিজেদের উপর নিজেরাই চরম ক্ষতি করে বসেছি। কিন্তু মাবুদ স্বীয় আদুরে সৃষ্টি কখনোই ভুলতে পারেন না। প্রেমের আতিসহ্যে তিনি মানুষকে নিজের কাছে ফিরিয়ে নেবার জন্য এক বিশেষ ব্যবস্থা হাতে নিয়েছেন। অনেকেরই সে বিষয়ে জানা আছে আর হয়তো কেউবা শুনতেই পায়নি অদ্যাবধি এমন চমৎকার রহমতের দরজার খবর যা সদাসর্বদা খোলা রয়েছে অনুতপ্ত গুনাহগারদের জন্য। কালামপাকে তেমন বর্ণনা রয়েছে, “আমি যাদের মহব্বত করি তাদেরই দোষ দেখিয়ে দিই ও শাসন করি। সেজন্য এই অবস্থা থেকে মন ফিরাতে আগ্রহী হও। দেখ, আমি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আঘাত করছি। কেউ যদি আমার গলার আওয়াজ শুনে দরজা খুলে দেয় তবে আমি ভিতরে তার কাছে যাব এবং তার সংগে খাওয়া–দাওয়া করব, আর সে–ও আমার সংগে খাওয়া–দাওয়া করবে” (প্রকাশিত কালাম ৩ : ১৯–২০)। লুক লিখিত সুসমাচারে বিষয়টি এভাবে বর্ণীত রয়েছে, “যারা হারিয়ে গেছে তাদের তালাশ করতে ও নাজাত করতে ইবনে–আদম এসেছেন ” (লুক ১৯ : ১০)।
অপরাধ প্রবণ মানুষ একদিকে পাপ করে আবার পাপের প্রতিফল দেখে অনুতাপ করতেও কালবিলম্ব করে না। মানুষের স্বভাব বসন্তের কোকিল অথবা ক্যামেলিয়া বা গিরগিটি তুল্য যা অবস্থা পরিবেশ পরিস্থিতি মোতাবেক নিজেদের বদলীয়ে ফেলে। এমন পরিবর্তনের ক্ষমতা বা কৌশল মানুষকে বাকরূদ্ধ করা সম্ভব হলেও অন্তর্যামী খোদাকে হতভম্ব করার উপায় নেই। তবে তিনি ক্রোধে ধীর ও দয়ায় মহান। তিনি সদা অপেক্ষা করেন মানুষের অনুশোচনার ক্ষণটুকু পর্যন্ত। যেমন অনুতপ্ত ব্যক্তি যখনই খোদার কাছে মাগফেরাতের জন্য ব্যকুল হয়ে ফিরে আসে, মানুষের হৃদয়ের অবস্থান দেখে তৎক্ষনাত তিনি তাকে মাগফেরাত দান করেন।
কালামের পয়গাম তো এমনই হয়ে থাকে। মানুষকে দোষারোপ করার জন্য তাঁর আগ্রহ নেই বরং মানুষের মধ্যে অর্থাৎ অন্তরে চিরস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করার জন্যই তিনি সার্বিক ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করেছেন। কালামপাকে পরিষ্কার বর্ণীত রয়েছে, খোদা মানুষকে এতটাই প্রেম করেছেন যা স্বার্থান্ধ মানুষের পক্ষে অনুধাবন করা সম্পূর্ণ অসম্ভব। “আল্লাহ মানুষকে এত মহব্বত করলেন যে, তাঁর একমাত্র পুত্রকে তিনি দান করলেন, যেন যে কেউ সেই পুত্রের উপর ঈমান আনে সে বিনষ্ট না হয় কিন্তু অনন্ত জীবন পায়। আল্লাহ মানুষকে দোষী প্রমাণ করবার জন্য তাঁর পুত্রকে দুনিয়াতে পাঠান নি, বরং মানুষ যেন পুত্রের দ্বারা নাজাত পায় সেজন্য তিনি তাঁকে পাঠিয়েছেন” (ইউহোন্না ৩ : ১৬–১৭)।
খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসীহ মানুষের পাপের কাফফারা পরিশোধ করার জন্য নিজের প্রাণ পর্যন্ত কোরবানি দিয়েছেন। গুনাহগার মানুষ সাধুসন্তে পরিণত হতে হলে তাকে আপন পাপাচার স্বীকার করতে হবে এবং মন্দ পথ থেকে প্রভুর পথে ফিরে আসতে হবে। আমাদের গড়ে তুলতে হবে মাবুদের সাথে আন্তরিক সম্পর্ক। প্রশ্ন জাগতে পারে, মাবুদ হলেন রূহানী সত্ত্বা। মাটির মানুষ যেমন করে রূহের সাথে আত্মিয়তা গড়ে তুলতে পারে? তাছাড়া, যাকে প্রত্যক্ষ করা অসম্ভব, তার সাথে মধুময় সম্পর্ক কি করে গড়ে তুলবো? জবাব অতিসহজ। খোদাকে আমরা আমনা সামনা প্রত্যক্ষ করেছি মানবরূপে আবির্ভুত খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসীহের মাধ্যমে। কালামপাকে যথার্থ বর্ণীত রয়েছে, “এই পুত্রই হলেন অদৃশ্য আল্লাহর হুবহু প্রকাশ। সমস্ত সৃষ্টির আগে তিনিই ছিলেন এবং সমস্ত সৃষ্টির উপরে তিনিই প্রধান, কারণ আসমান ও জমীনে, যা দেখা যায় আর যা দেখা যায় না, সব কিছু তাঁর দ্বারা সৃষ্ট হয়েছে। আসমানে যাদের হাতে রাজত্ব, কর্তৃত্ব, শাসন ও ক্ষমতা রয়েছে তাদের সবাইকে তাঁকে দিয়ে তাঁরই জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। তিনিই সব কিছুর আগে ছিলেন এবং তাঁরই মধ্য দিয়ে সব কিছু টিকে আছে” (কলসীয় ১ : ১৫–১৭)।
ঐশি মানব মসীহ জগতে মানুষের সাথে আর দশজন লোকের মত জীবন–যাপন করেছেন। একদিকে তিনি রূহানী চরিত্র প্রকাশ করেছন ঐশি প্রাধিকার ও কুদরত বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে, আর একদিকে মানুষের নিত্যনৈমিত্তিক চাহিদা পুরণ করার দিকেও নজর দিয়েছেন এবং কুদরতিভাবে সমস্যার সমাধান দিয়েছেন। মানুষের পক্ষে অনেক কিছুই সাধন করা সম্ভব ছিল না, তিনি মুখের কথায় তেমন কঠিন সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান দিয়েছেন। তার শিক্ষা ছিল ব্যতিক্রমী শিক্ষা, মৃতকে জীবিত করে তোলা রূহানী ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ করতে পারেন না। জন্মান্ধের চোখ খুলে দেয়া ছিল অলৌকিক কাজ, কেবলমাত্র খোদার পক্ষেই তা করা সম্ভব। মসীহ যেহেতু পাকরূহের মানবাকারে প্রকাশ তাই ঐশি কাজগুলো তিনি অতিসহজেই সুসম্পন্ন করে দিয়েছেন। পরিশেষে তিনি মৃত্যুকে পর্যন্ত জয় করেছেন, যদিও তিনি আমাদের মত মানুষ ছিলেন, যা ছিল পাকরূহের মানব পরিচয়, আর রূহের দিক দিয়ে সার্বিক ঐশি পরাক্রম প্রকাশ করায় তিনি হলেন খোদার হুবহু প্রকাশ।
গুনাহের কারণে মানুষ খোদার কাছে ঋণি, আর এই ঋণ শোধ না দেয়া পর্যন্ত মানুষের মুক্তপাপ হবার কোনোই উপায় নেই। পাপের আজাব অনন্ত দোযখ, কিন্তু খোদার দান অনন্ত জীবন যা তারা প্রাপ্ত হয়েছে খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসীহের পূতপবিত্র রক্তের মূল্যে। কেবল বিশ্বাস স্থাপনের মাধ্যমে আপনি আমি হতে পেরেছি সম্পূর্ণ বেগুনাহ, খোদার সাথে পুনর্মিলনের অপূর্ব দাতব্য সুযোগ। নাজাত লাভ হলো প্রত্যেক গুনাহগারের এক বিশেষ সুযোগ যা মসীহের উপর বিশ্বাস স্থাপনের মাধ্যমে সকলের কাছে হয়ে থাকে সুলভ। “আল্লাহর রহমতে ঈমানের মধ্য দিয়ে তোমরা নাজাত পেয়েছ। এটা তোমাদের নিজেদের দ্বারা হয় নি, তা আল্লাহরই দান। এটা কাজের ফল হিসাবে দেওয়া হয় নি, যেন কেউ গর্ব করতে না পারে। আমরা আল্লাহর হাতের তৈরী। আল্লাহ মসিহ ঈসা সংগে যুক্ত করে আমাদের নতুন করে সৃষ্টি করেছেন যাতে আমরা সৎ কাজ করি। এই সৎ কাজ তিনি আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন, যেন আমরা তা করে জীবন কাটাই ” (ইফিষীয় ২ : ৮–১০), “যদি কেউ মসিহের সংগে যুক্ত হয়ে থাকে তবে সে নতুনভাবে সৃষ্ট হল। তার পুরানো সব কিছু মুছে গিয়ে নতুন হয়ে উঠেছে। এই সব আল্লাহ থেকেই হয়। তিনি মসিহের মধ্য দিয়ে তাঁর নিজের সংগে আমাদের মিলিত করেছেন, আর তাঁর সংগে অন্যদের মিলন করিয়ে দেবার দায়িত্ব আমাদের উপর দিয়েছেন। এর অর্থ হল, আল্লাহ মানুষের গুনাহ না ধরে মসিহের মধ্য দিয়ে নিজের সংগে মানুষকে মিলিত করছিলেন, আর সেই মিলনের খবর জানাবার ভার তিনি আমাদের উপর দিয়েছেন। সেজন্যই আমরা মসিহের দূত হিসাবে তাঁর হয়ে কথা বলছি। আসলে আল্লাহ যেন নিজেই আমাদের মধ্য দিয়ে লোকদের কাছে অনুরোধ করছেন। তাই মসিহের হয়ে আমরা এই মিনতি করছি, “তোমরা আল্লাহর সংগে মিলিত হও।” ঈসা মসিহের মধ্যে কোন গুনাহ ছিল না; কিন্তু আল্লাহ আমাদের গুনাহ তাঁর উপর তুলে দিয়ে তাঁকেই গুনাহের জায়গায় দাঁড় করালেন, যেন মসিহের সংগে যুক্ত থাকবার দরুন আল্লাহর পবিত্রতা আমাদের পবিত্রতা হয়” (২করিন্থীয় ৫ : ১৭–২১)।


