উচ্চ সুদের হার, ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অসহনীয় চাঁদাবাজি, জ্বালানি অনিশ্চয়তা এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতাকে বর্তমান অর্থনীতির জন্য ‘আত্মঘাতী’ বলে মনে করে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। সংগঠনের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেছেন, জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী চাঁদাবাজি ও অনিয়ম বন্ধ করা না হলে সরকারের সব আশা বিফলে যাবে। গতকাল সোমবার রাজধানীর মতিঝিল ডিসিসিআই কার্যালয়ে ‘বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় নবগঠিত সরকারের নিকট ঢাকা চেম্বারের প্রত্যাশা’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠের পাশাপাশি সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন তাসকীন আহমেদ। তাসকীন আহমেদ বলেন, ব্যবসায়ীদের কারখানা থেকে পণ্য বের করতে গেলেও চাঁদা দিতে হয়, আবার ঢোকাতে গেলেও চাঁদা দিতে হয়। ফ্যাসিবাদের কারণে আওয়ামী লীগ সরকার ৫ আগস্টে (২০২৪ সাল) চলে যাওয়ার আগে যেমন চাঁদা দিতে হতো, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও দিতে হয়েছে। কোথাও কোথাও চাঁদাবাজির রেট ২০ থেকে ৫০ শতাংশ বেড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এক দিনের জন্যও দুর্নীতি কমেনি।
নানা স্থানে অতিষ্ঠ হয়ে মানুষ চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে রাস্তায় নামছে। নির্বাচিত সরকারকে অবশ্যই চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। চাঁদাবাজির ভয়াবহ প্রভাব তুলে ধরে তিনি জানান, চাঁদাবাজি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে সবজিসহ সব ধরনের পণ্যমূল্য বেড়ে যায়। চাঁদাবাজি কেবল রাস্তায় বা ঘাটে নয়, বরং ট্রেড লাইসেন্স করা, ইনকাম ট্যাক্স ও ভ্যাট অফিসের মতো সরকারি সেবা খাতের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। ব্যবসায়িক খরচ কমাতে হলে ট্রাক ও রাস্তাঘাটের চাঁদাবাজি বন্ধ করা জরুরি। কারণ এর চূড়ান্ত বোঝা সাধারণ মানুষের ওপরেই পড়ে। গার্মেন্ট বা কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিক যে ঝুট বা ‘স্ক্র্যাপ’ ১০ হাজার টাকায় বিক্রি করতে পারতেন, তা পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হলে তাও এক ধরনের চাঁদাবাজি। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে সরকারি দলের পরিচয় দিয়ে চাঁদাবাজি হয়। চাঁদাবাজি শক্ত হাতে দমন করা না গেলে নতুন সরকারের অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না বলেও সরকারকে সতর্ক করেন তিনি। চাঁদাবাজি বন্ধের সমাধান হিসেবে তিনি দেশের প্রায় ২৬ লাখ বেকার যুবককে ক্ষুদ্রশিল্প ও স্টার্টআপ ব্যবসায় যুক্ত করার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রস্তাব দিয়ে বলেন, বেসরকারি খাতকে চাঙ্গা করা ছাড়া কর্মসংস্থানের লক্ষ্য পূরণ সম্ভব নয়। ডিসিসিআই সভাপতি জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখার কারণে ব্যবসায়ীদের বর্তমানে ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ হারে সুদে ব্যাংক ঋণ নিতে হচ্ছে, যা ব্যবসা পরিচালনা ব্যয়বহুল ও অলাভজনক করে তুলেছে।
তিনি উল্লেখ করেন, ঋণ শ্রেণীকরণের সময়সীমা ৯ মাস থেকে তিন মাসে নামিয়ে আনায় অনেক ব্যবসায়ী খেলাপি হয়ে পড়ছেন। ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, গত চার থেকে পাঁচ বছর ব্যবসায়ীরা ঠিকমতো ব্যবসা করতে পারছেন না। খেলাপি ঋণের পরিমাণ অনেক বেড়ে আর্থিক খাতে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। গত কয়েক বছরে কভিড, বৈশ্বিক সংঘাত এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ফলে ব্যবসায়ীদের মূলধন ঘাটতি দেখা দিয়েছে। যার ফলে অনেক সচল ব্যবসায়ীও অনিচ্ছাকৃত খেলাপি হয়ে পড়েছেন। শিল্প খাতের সংকট তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে গ্যাসের চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে। এর ওপর নতুন শিল্প ও ক্যাপটিভ পাওয়ারের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম বাড়িয়ে যথাক্রমে ৪০ টাকা ও ৪২ টাকা নির্ধারণ করায় উৎপাদন খরচ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এতে পণ্য উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যা স্থানীয় চাহিদা পূরণ এবং রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণ প্রসঙ্গে বলা হয়, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় উত্তরণ কমপক্ষে তিন বছর পিছিয়ে দেওয়া জরুরি।
আশার কথা, সরকার দায়িত্ব নিয়ে প্রথম দিনে জাতিসংঘকে চিঠি দিয়েছে। ব্যবসাবান্ধব নীতি গ্রহণ বিষয়ে বিএনপি সরকারের কাছে ডিসিসিআই সভাপতি কিছু দাবি তুলে ধরেন। এর মধ্য রয়েছে আগামী ৯ থেকে ১২ মাসের মধ্যে এনবিআরের সম্পূর্ণ অটোমেশন নিশ্চিত করা। এ ছাড়া টার্নওভার ট্যাক্স ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে পুনরায় শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ নির্ধারণ এবং জ্বালানি নীতিকে যুগোপযোগী করে জ্বালানি ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে ঢাকা চেম্বার।



