জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এরশাদের বাড়ি রংপুর। সে কারণে রংপুর এক সময় ‘লাঙ্গলের ঘাঁটি’ ছিল। জাতীয় পার্টির দখলে ছিল বৃহত্তর রংপুরের ২২টি আসন। তবে সময়ের ব্যবধানে সেখানে ভাগ বসায় আওয়ামী লীগ। সর্বশেষ জাতীয় পার্টির দখলে ছিল রংপুরের একটিসহ বিভাগের তিনটি আসন। এবারের নির্বাচনে বিভাগের ৩৩ আসনের একটিতেও জিততে পারেনি জাতীয় পার্টি।হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের হাতে গড়া জাতীয় পার্টিকে রংপুরে রীতিমতো মাটিতে নামিয়ে এনেছে জামায়াতে ইসলামী। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজ দুর্গেই দুর্গতিতে পড়েছে দলটি। বৃহত্তর রংপুরের একটি আসনেও জিততে পারেননি দলের নেতারা। ফলে এরশাদহীন এই দলের এমন পরিণতিতে ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান নিয়ে শঙ্কিত নেতাকর্মীরা। রংপুরের ছয়টি সংসদীয় আসনে জামায়াত জোটের প্রার্থীরা জয়ী হওয়ায় এ অঞ্চলে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের বার্তা মিলছে। বিএনপির সঙ্গে লড়াইয়ে বড় ব্যবধানে জয় আর জাতীয় পার্টির আসনশূন্য অবস্থান আগামীতে রংপুর অঞ্চলের রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা মনে করছেন, এবার রংপুরের জনগণ ‘আবেগের লাঙ্গল’ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় জামায়াতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে বিএনপির সঙ্গে।
রংপুর–১ (গঙ্গাচড়া) আসনে এক লাখ ৪৭ হাজার ২৪৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন জামায়াতের রায়হান সিরাজী। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মোকাররম হোসেন সুজন পান ৬৯ হাজার ১৩১ ভোট।
রংপুর–২ (তারাগঞ্জ–বদরগঞ্জ) আসনে এক লাখ ৩৫ হাজার ৫৫৬ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন জামায়াতের প্রার্থী এটিএম আজহারুল ইসলাম। তাঁর নিকটতম বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ আলী সরকার পান ৮০ হাজার ৫৩৮ ভোট। এই আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী আনিছুল ইসলাম মণ্ডল পেয়েছেন ৩৩ হাজার ৯৩০ ভোট।
রংপুর–৩ আসনে এক লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন জামায়াতের প্রার্থী মাহবুবুর রহমান বেলাল। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বিএনপির সামসুজ্জামান সামু পান ৮৫ হাজার ৪৯৮ ভোট। জাতীয় পার্টির প্রার্থী দলটির চেয়ারম্যান জি এম কাদের পান ৪৩ হাজার ৭৯০ ভোট।
রংপুর–৪ (কাউনিয়া–পীরগাছা) আসনে এক লাখ ৪৯ হাজার ৯৬৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন ১১ দলীয় জোট প্রার্থী এনসিপির আখতার হোসেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বিএনপি এমদাদুল হক ভরসা পান এক লাখ ৪০ হাজার ৫৬৪ ভোট। এই আসনে জাতীয় পার্টির আবু নাসের শাহ মো. মাহবুবার রহমান পান ৩৩ হাজার ৬৬৪ ভোট।
রংপুর–৫ (মিঠাপুকুর) আসনে এক লাখ ৭৬ হাজার ৪১১ ভোট পেয়ে জয়ী হন জামায়াতের গোলাম রব্বানী। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থী গোলাম রব্বানী পান এক লাখ ১৫ হাজার ১১৬ ভোট। জাতীয় পার্টির প্রার্থী এসএম ফখর উজ–জামান পান ১৬ হাজার ৪৯০ ভোট।
রংপুর–৬ (পীরগঞ্জ) আসনে এক লাখ ২০ হাজার ১২৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন জামায়াতের নুরুল আমিন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সাইফুল ইসলাম পান এক লাখ ১৭ হাজার ৭০৩ ভোট। জাতীয় পার্টির নুর আলম মিয়া ভোট পান মাত্র এক হাজার ২৮টি।
জাতীয় পার্টির এমন ভরাডুবির বিষয়ে দলটির তৃণমূলের কর্মী–সমর্থকরা দুষছেন চেয়ারম্যানসহ স্থানীয় নেতাদের। তবে ভোটের দিন রংপুরে অবস্থান করলেও দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে কোথাও দেখা যায়নি। মাঠে ছিলেন না পার্টির কেন্দ্রীয় নেতারাও। অনেকের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। রংপুর নগরের ষাটোর্ধ্ব আব্দুল্লাহ মিয়া বলেন, ‘এরশাদের মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টি যাত্রা পার্টিতে পরিণত হয়। নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করাসহ এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা না থাকায় ভোটাররা ভোট দেয়নি।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, ‘ঘাঁটি’ বলে পরিচিত রংপুরে এখন জাতীয় পার্টির ভোটার নেই। কো–চেয়ারম্যান ও সাবেক সিটি মেয়র মোস্তাফিজার রহমানের জনপ্রিয়তায় এখানে এতদিন দলটি টিকে ছিল। ভোটাররা এবার তাদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। এ ব্যাপারে সুশাসনের জন্য নাগরিক–সুজন রংপুর জেলা সভাপতি অধ্যক্ষ ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, জাতীয় পার্টির গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নেই। তার ওপর রয়েছে স্বামী–স্ত্রী, দেবর–ভাবির দ্বন্দ্ব, একনায়কতন্ত্র কার্যক্রম ও নেতাকর্মী–সমর্থকদের সঙ্গে না রাখায় দলটি ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে পড়েছে। সর্বোপরি বরাবরই এখানে জিতলেও রংপুরের উন্নয়নে কোনো কাজ করেনি।
এরশাদের পর জি এম কাদের ও এরশাদের ছেলে সাদ এরশাদ এমপি হলেও তারা আন্তরিক ছিলেন না। এলাকার মানুষ এরশাদের কারণে এতদিন ভোট দিলেও বিগত সরকারের দোসর হওয়ায় লোকজন মুখ ফিরিয়ে নেয়। এবার তারা ভোটের মাধ্যমে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। তিনি বলেন, সাড়ে ১৫ বছর কোণঠাসা ছিল জামায়াতের নেতাকর্মী। তারা এবার ভোটারদের কাছে টানার সব কৌশল প্রয়োগ করেছে। বিএনপির অদূরদর্শিতা, অভ্যন্তরীণ কোন্দল আর জাতীয় পার্টির প্রতি ক্ষোভ থেকে রংপুরের ভোটাররা এবার জামায়াতকেই বেছে নিয়েছেন।



