আগামীকাল ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যালটে নৌকা প্রতীক নেই। আইনি বাধায় আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। কিন্তু কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মী–সমর্থকদের কদর বেড়েছে সব দলের কাছে। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দলের প্রার্থীরা তাদের পক্ষে ভোট দিলে নানা ছাড় দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন আওয়ামী লীগ সমর্থকদের। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত। দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান উত্তরাঞ্চলে এক নির্বাচনী সমাবেশে বলেছেন, ‘৫ আগস্টের পর কথা দিয়েছিলাম, আমরা মামলা বাণিজ্য করব না। আমরা হাজার হাজার মামলা করি নাই।’ বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মামলা–হামলা থেকে আওয়ামী লীগের চরম দুর্দশাগ্রস্ত নেতাকর্মীদের রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি তাঁর নির্বাচনী এলাকা ঠাকুরগাঁও–১ আসনে এক সমাবেশে বলেছেন, ‘এবার তো নৌকা নাই। নৌকা পালাইছে। হাসিনা ভারতবর্ষে চলে গেছে।
মাঝখানে তার যে সমর্থক আছে, তাদের বিপদে ফেলে গেছে। আমরা সেই বিপদে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছি। আওয়ামী লীগের নিরপরাধ সমর্থনকারীদের পাশে থাকবে বিএনপি।’ জুলাই অভ্যুত্থানের পর নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখেই সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করেছে। ফলে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ হারিয়েছে দলটি। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিকরাও নির্বাচন বর্জন করছে।
কদর বেড়েছে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের
আওয়ামী লীগের শক্ত প্রতিপক্ষ বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর কাছে দলটির দেশে থাকা নেতাকর্মীদের বেশ কদর বেড়েছে। পাশাপাশি ইসলামী আন্দোলন ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীরাও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট পাওয়ার চেষ্টা করছেন। ভোটের আশায় দলগুলোর শীর্ষ নেতারাও নির্বাচনী প্রচারে পারতপক্ষে আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা করেননি। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের রক্ষায় নানামুখী অঙ্গীকারও করেছেন তারা। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনী জনসভাগুলোতে শেখ হাসিনার সরকারের খুব একটা সমালোচনা না করায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও স্বস্তি পেয়েছেন। এর ধারাবাহিকতায় বিএনপির প্রার্থীরাও তাদের নির্বাচনী সভায় আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা করেননি। অবশ্য এ ব্যাপারে দলীয়ভাবে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল বলে বিএনপির সূত্র জানায়। আওয়ামী লীগের সমর্থকদের কাছে টানার চেষ্টা করেছে জামায়াতও। দলটির নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের তাঁর নির্বাচনী এলাকা কুমিল্লা–১১ আসনের চৌদ্দগ্রাম উপজেলার ছুফুয়া বাজারে জনসভায় কালিকাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সালাউদ্দিন আহমেদ মজুমদারকে নিয়ে মঞ্চে বক্তৃতা করেন। যদিও পরে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ–৩ আসনের সাবেক এমপি লতিফুর রহমান উঠান বৈঠকে বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ থেকে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিলে আমরা সব দায়দায়িত্ব নেব।’ জামায়াতের প্রার্থীরা সভা–সমাবেশে ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাড়িঘরে হামলা কারা করেছে, সেটা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। কারা মামলা দিয়ে হয়রানি করিয়েছে তাও বলছে।
জামায়াতের প্রার্থীদের অনেকেই বলেছেন, মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি, বাড়িঘরে আগুন ও দখলের ইতিহাস তাদের নেই। তারা অনেক জায়গায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নিরাপত্তা দিয়েছেন। সরকার গঠন করতে পারলে এই সুযোগ আরও বাড়বে। আর বিএনপি এলে মামলা, হামলা, হয়রানি, নির্যাতন, আগুন ও দখলের প্রতিযোগিতা শুরু হবে। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহনমূলক নির্বাচনের কথা বলছেন। এর পেছনেও আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ভোট পাওয়ার আশা কাজ করেছে বলে মনে করেন রাজনীতিসংশ্লিষ্টরা। ‘না’ ভোটের পক্ষে তাঁর অবস্থানও প্রকারান্তরে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের সমর্থন পাওয়ার কথা। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মন পেতে গোপালগঞ্জ–৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা হাবিবুর রহমান টুঙ্গিপাড়ায় স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কবর জিয়ারতের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছিলেন।
অবিশ্বাস্য প্রতিশ্রুতি
আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ভোট পেতে রাজনৈতিক দলগুলোর চেষ্টা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার সমকালকে বলেন, যে কেউ নৌকা প্রতীকের সমর্থকদের ভোট চাইতেই পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতারা যে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, তা রীতিমতো অবিশ্বাস্য। জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনার সঙ্গে এটা যায় না।
ভিন্ন কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ মোহাম্মদ সাহান। তিনি সমকালকে বলেন, আওয়ামী লীগের সমর্থকরা তো ভোটার। সুতরাং রাজনৈতিক দলের নেতারা তাদের ভোট চাইতেই পারেন। এতে দোষ বা অন্যায়ের কিছু নেই। এটা একেবারেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া।
আ.লীগের সমর্থকরা কি ভোট দেবেন?
আওয়ামী লীগের সমর্থকরা কেন্দ্রে গেলে কোন প্রতীকে ভোট দেবেন– তা নিয়েও নানা আলোচনা চলছে। দল নির্বাচনে না থাকায় প্রায় ৫০ শতাংশ নেতাকর্মী ভোটকেন্দ্রে যাবেন না বলে মনে করছেন দলের শীর্ষ নেতারা। তাদের দৃষ্টিতে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি–জামায়াতের লোকেরা ভোট দিতে পারেনি। তাতে ভোটার উপস্থিতি কম ছিল এবং এর দায় পড়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর। আগামীকালের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি কম হলে এর দায় পড়বে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর। এই যুক্তিতে আওয়ামী লীগ সমর্থকরা ভোট বর্জন করবেন বলে মনে করেন দেশের বাইরে থাকা একাধিক নেতা। তবে কোনো কোনো নেতা বলছেন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে অনেকেই গুম–খুনসহ অত্যাচার–নির্যাতনের ঘটনা মেনে নেননি। তাদের অনেকে হয়তো ভোট দিতে যাবেন। অবশ্য তারা গণভোটে ‘না’ ভোট দিতে পারেন। কারণ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে সংবিধান আমূল বদলে যাবে বলে মনে করে আওয়ামী লীগ।
আ.লীগের ভোট কারা পাবে?
বেসরকারি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইনোভিশন কনসাল্টিংয়ের জরিপে বলা হয়েছে, ভোট দিতে আগ্রহী আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ভোট ভাগাভাগি হবে। অবশ্য আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ধারণা, তাদের সমর্থকদের বেশির ভাগ ভোট বিএনপির পক্ষে যাবে। প্রান্তিক পর্যায়ে স্থানীয় নানা কারণে কোথাও কোথাও কিছু ভোট জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন ও জাতীয় পার্টির পক্ষে যেতে পারে। আত্মগোপনে থাকা রাজশাহীর সাবেক মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন মনে করছেন, সমর্থকদের বড় অংশ ভোট দিতে যাবে না। আওয়ামী লীগের সাবেক কয়েকজন এমপির দৃষ্টিতে, দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে যারা কেন্দ্রে যাবেন, তাদের ভোট বিভক্ত হয়ে যাবে। এর মধ্যে স্বল্পসংখ্যক নেতাকর্মী বিএনপি প্রার্থীকে ভোট দেবে। কেউ কেউ বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীকেও ভোট দিতে পারেন। একেবারেই ক্ষুদ্র রক্ষণশীল একটি অংশের ভোট জামায়াতের পক্ষে যেতে পারে। কিছু ভোট পাবে জাতীয় পার্টিও। অবশ্য নৌকা প্রতীকের বেশ কয়েকজন সাবেক এমপি বিএনপি প্রার্থীদের পরোক্ষভাবে সমর্থন দিচ্ছেন বলে স্থানীয় পর্যায় থেকে তথ্য পাওয়া গেছে।
নির্বাচন বর্জন
দলের সভাপতি শেখ হাসিনা সামাজিক মাধ্যমে নির্বাচন বর্জনের জন্য নেতাকর্মী ও সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এর বাইরে দলের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কেউ কোনো কথা বলেননি। চব্বিশের ছাত্র আন্দোলনের সময় দলের ভেতরে যে বিশৃঙ্খল প্রকাশ্য হয়েছিল, তা আরও প্রকট হয়েছে। দলের মুখপাত্র কে, সেটাও কেউ বলতে পারছেন না। দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও চুপ। এই অবস্থায় সামাজিক মাধ্যমে বিক্ষিপ্তভাবে বলা হচ্ছে, ‘নো বোট, নো ভোট।’ কেন্দ্রে না গিয়ে বিক্ষোভ দেখানোর মাধ্যমে নির্বাচন বর্জনের জন্য নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন আত্মগোপনে থাকা দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক।
আত্মগোপনে থাকা দলের তিন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ, মাহবুবউল আলম হানিফ এবং আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেছেন, আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে নির্বাচন আয়োজন করায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমালোচনা হচ্ছে। সেই ক্ষেত্রে নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি কম হলে এই সমালোচনা আরও বাড়বে। তাই নেতাকর্মীরা কেন্দ্রে না গিয়ে ভোট বর্জন করবে।
নির্বাচন কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক?
নির্বাচন কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হচ্ছে, এ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে আগেই। অতীতে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের কথা বললেও বিদেশি পর্যবেক্ষকরা এবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা বলছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান ইয়র ইয়াবস তো সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনে তাদের ব্যবহার করা আগের সংজ্ঞাই বদলে ফেলেছেন।
অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের ধারণা প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান গতকাল মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, আওয়ামী লীগ যদি স্বেচ্ছায় নির্বাচন বর্জন করে, তাহলে তাদের কীভাবে নির্বাচনে অন্তর্ভুক্ত করা যায়? আওয়ামী লীগ ভুল স্বীকার ও অনুশোচনা প্রকাশ না করে অর্থবহ রাজনৈতিক অংশগ্রহণে ফিরে আসার আশা করতে পারে না। কারণ দলটি নিজেই চলমান নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে একটি স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে।
দল ছাড়ছেন কেউ কেউ
সংখ্যায় নগণ্য হলেও আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী কেউ কেউ ইতোমধ্যে দল ছেড়েছেন। তারা যোগ দিয়েছেন বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন দলে। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সালাউদ্দিন আহমেদ মজুমদারের যোগদানের বিষয়টি ছিল বেশ হাস্যস্পদ। প্রথমে তিনি স্থানীয় ছুফুয়া বাজারে কুমিল্লা–১১ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরের সমর্থনে নির্বাচনী সমাবেশে দাঁড়িপাল্লায় ভোট চেয়েছেন। পরে মিয়া বাজার লতিফুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে একই আসনে বিএনপির প্রার্থী কামরুল হুদার নির্বাচনী জনসভায় গিয়ে বিএনপিতে যোগ দেন। রাজবাড়ী–১ আসনে বিএনপির প্রার্থী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ামের পক্ষে নির্বাচনী কাজে সম্পৃক্ত হয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী। তাদের মধ্যে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন গোয়ালন্দ উপজেলার সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান নার্গিস পারভীন, রেজাউল করিম নিলু মণ্ডল, বাদল বিশ্বাস, আবুল কাশেম প্রমুখ। এ ছাড়া নীলফামারীর সৈয়দপুর, বাগেরহাট, গাজীপুরের কাপাসিয়া, লালমনিরহাটের আদিতমারীসহ বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিভিন্ন দলে যোগদানের খবর পাওয়া গেছে। জানতে চাইলে দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম বলেন, সরকার পতনের পর অনেকে মামলায় জড়িয়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন। যারা জামিন পেয়েছেন, তারা আবার গ্রেপ্তার আতঙ্কে বাড়ি–ঘর ছেড়ে পালিয়ে থাকছেন। এ ধরনের নেতাকর্মীর বেশির ভাগেরই ঘর–বাড়ি, ব্যবসা–প্রতিষ্ঠানে হামলা–ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট হয়েছে। ফলে বিরূপ পরিস্থিতিতে বিপর্যস্ত নেতাকর্মী কেউ কেউ কোনো মতে টিকে থাকার প্রয়োজনে ভিন্ন দলে যোগ দিচ্ছেন।
মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়াও আত্মগোপনে আছেন।
আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রাখতে যত আয়োজন
আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রাখতে তিনটি আইনে বড় পরিবর্তন এনেছে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এর মধ্যে সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) (দ্বিতীয় সংশোধনী) অর্ডিন্যান্স এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন অধ্যাদেশ। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনটি পরিবর্তন হয় চারবার। যার মধ্যে একবার সংশোধন এনে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি আরপিও সংশোধন করে আইনের চোখে পলাতকদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ বন্ধ এবং অনলাইনে মনোনয়ন জমা দেওয়ার সুযোগ বন্ধ করা হয়েছে। এবারের আরপিও সংশোধনীর অন্তত তিনটি ধারায় বড় পরিবর্তন আওয়ামী লীগ ও তাদের নেতাদের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ আটকে দিয়েছে। এ ছাড়াও ২০২৫ সালের ১০ মে উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ বৈঠকে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডাবলিউ) পক্ষ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রয়োজনীয় সংস্কার নিয়ে ‘আফ্টার দ্য মনসুন রেভল্যুশন: এ রোডম্যাপ টু লাস্টিং সিকিউরিটি সেক্টর রিফর্ম ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদন তৈরিতে অংশ নিয়েছিলেন সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ গবেষক জুলিয়া ব্লেকনার। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে জুলিয়া ব্লেকনার বলেন, ‘আওয়ামী লীগকে নির্বাচন থেকে বাইরে রাখার বিষয়টি বেশ উদ্বেগের। এর কারণে বাংলাদেশিরা হয়তো আরেকটি নির্বাচন পেতে যাচ্ছে, যেখানে তারা পছন্দের প্রার্থীদের ভোট দিতে পারবে না।’
আবার সাংবিধানিক সংস্থা হয়েও সরকারকে অনুসরণ করে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন। কোন আইনের অধীনে এই পদক্ষেপ নেওয়া হলো তার ব্যাখ্যা দেয়নি কমিশন। ২০২৫ সালের ১২ মে রাতে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিতের কথা জানায় ইসি সচিবালয়। এর কয়েক ঘণ্টা আগে বিকেলে সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশের আলোকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, তার অঙ্গ সংগঠন এবং ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো’র কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়।



