আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে অস্থিরতা–বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি:এমনকি বানচালের চক্রান্ত চলছে। এর নেপথ্যে থেকে পরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্র করছে ইসলামের লেবাসধারী একটি রাজনৈতিক দল। নানামুখী ষড়যন্ত্র ও অপচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে নির্বাচন বানচালের শেষ কামড় দেয়ার অপচেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক সময়ে তাদের ঢাকার একটি আসনের প্রার্থী সেনাবাহিনীর সাথে অশোভন আচরণ করে ভাইরাল হয়েছে। বিভিন্ন স্থান থেকে অস্ত্র উদ্ধার এবং ১৪৪ ধারা জারির মধ্যেও প্রধান উপদেষ্টার রাষ্ট্রীয় বাসভবন যমুনা ঘেরাও দেশে অস্থীরতা সৃষ্টিরই ইঙ্গিত বহন করে। তাদের যমুনামুখী পূর্বঘোষিত কর্মসূচি ঠেকানো গেল না কেন সেটিও রহস্যজনক। অন্তর্বর্তী সরকার শহীদ শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড তদন্তে জাতিসংঘের মানবাধিকার–বিষয়ক হাইকমিশনারের দফতরের সহায়তা চাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার ঘোষণার পরও একই দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চের ব্যানারে যমুনায় জড়ো হয় কিছু আন্দোলনকারী। শুধু তাই নয়, হঠাৎ করেই নবম জাতীয় বেতন কমিশনের প্রতিবেদনের আলোকে গেজেট প্রকাশ ও বাস্তবায়নের এক দফা দাবিতে যমুনায় জড়ো হয় সরকারি কর্মচারীরা। নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক দিন আগে এ ধরনের দাবির অজুহাত তুলে দেশে বিশৃঙ্খলার অপচেষ্টাকে সাধারণ মানুষ মনে করছেন এটি নির্বাচন বানচালের পাঁয়তারার এক ধরনের অপতৎপরতা। সাধারণ মানুষ প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন ঘেরাওকে নাটক বলে অভিহিত করেছেন। জামায়াতে ইসলামী আসন্ন নির্বাচনে নিজেদের সম্ভাব্য ভরাডুবি আঁচ করতে পেরেই শেষ পর্যন্ত নির্বাচন বানচাল করার জন্য ‘বি’ টিম ইনকিলাব মঞ্চ, যমুনার মতো স্পর্শকাতর এলাকায় অবস্থান করে একটি বিতর্ক করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তাদের কর্মী বাহিনী যেন তৎপর হয়ে উঠেছে। গতকাল তারা দফায় দফায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষেও জড়িয়ে পড়েন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে যারা ইনকিলাব মঞ্চ ও সরকারি কর্মচারীদের যারা যমুনা ঘেরাও করে এবং রাস্তায় শুইয়ে পড়েন তাদের বেশির ভাগই জামায়াত ও শিবির অনুসারী হিসেবে চিহ্নিত মুখ।
এদের বিভিন্ন সময় জামায়াতের নানা কর্মসূচিতে দেখা গেছে। এদিকে নির্বাচন বানচাল, ভোটকেন্দ্র দখল, জাল ভোট দেয়ার উদ্দেশ্যে এ দলটির নেতাকর্মীরা আগ্নেয়াস্ত্রসহ দেশীয় অস্ত্র মজুত করছে। দেশব্যাপী ওই দলটির নেতাকর্মীদের বাসা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে অস্ত্র, সিল ও ব্যালট উদ্ধারের ঘটনা এসবের প্রমাণ। প্রায় প্রতিদিনই দলটির কোনো না কোনো নেতার আস্তানা থেকে অস্ত্র উদ্ধার করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গত বুধবার রাতে ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে রাজধানীর সূত্রাপুর থানাধীন কাঠেরপুল এলাকার তনুগঞ্জ লেনের ২৯ নম্বর বাড়িতে অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অভিযানে ওই ভবনের ছাত্র–শিবিরের অফিস ও নিচতলা থেকে ১৫২টি ক্রিকেট খেলার স্ট্যাম্প উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, ১০ তলা ওই বাড়ির মালিক মোহাম্মদ বাবুল জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। নির্বাচনে সহিংসতার উদ্দেশ্যেই তারা কসমোপলিটন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ভবনের একটি কক্ষে শিবিরের লোকজন লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র মজুত করে। ভবনটি ভোটকেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। গত ৩ ফেব্রুয়ারি লক্ষ্মীপুরে পৌর শহরের পুরাতন আদালত রোডের একটি দোকানে অভিযান চালিয়ে ৬টি নির্বাচনী সিলসহ জামায়াতের কর্মী সোহেল রানাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। অবৈধ সিল উদ্ধারের ঘটনায় মামলার বাদী লক্ষ্মীপুর সদর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) হুমায়ুন কবির বলেছেন, সিলগুলো বানাতে দিয়েছিলেন স্থানীয় পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি সৌরভ হোসেন ওরফে শরীফ।
তিনি আরো বলেন, নির্বাচনে কেন্দ্র দখল এবং জাল ভোট দেয়ার উদ্দেশ্যেই অবৈধ এসব সিল বানানো হয়ে থাকতে পারে। সিল উদ্ধারের ঘটনায় বিএনপির এক নেতা বলেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে জামায়াত–শিবির ভোট চুরির পরিকল্পনা করছে। তার দাবিÑ জামায়াত–শিবির বিগত দিনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিলেমিশে গুপ্ত রাজনীতি করেছে। পলাতক সরকারের সংস্পর্শে থেকেই শিবিরের সদস্যরা ভোট চুরির নানা কৌশল রপ্ত করেছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সারাদেশে তারা বড় ধরনের ভোট চুরির ছক আঁকছে। ইতোমধ্যে এক জামায়াত নেতা ভোটের সিলসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়েছেন। এই ঘটনাকে জামায়াতের ষড়যন্ত্রের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, তারা যেন অতিরিক্ত ব্যালট পেপার ও সিল নিয়ে কোনোভাবেই ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো সতর্ক থাকতে হবে।
নির্বাচনের
গুরুত্ব তুলে
ধরে তিনি
বলেন, এবারের লড়াই
গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও
সার্বভৌমত্ব রক্ষার
লড়াই। গত বুধবার
রাতে শরীয়তপুরে
সেনা অভিযানে
তিনটি আধুনিক
আগ্নেয়াস্ত্র, ১৪০ রাউন্ড
গুলি, ম্যাগাজিন, মাদক ও
বিভিন্ন সরঞ্জামসহ
ছাত্রী সংস্থার
সাবেক ও
বর্তমানে মহিলা
জামায়াতে ইসলামীর
নেত্রী ইসমত
জাহান ওরফে
ইলোরা হাওলাদারকে
গ্রেফতার করছে
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এদিকে
গত বৃহস্পতিবার
সন্ধ্যা থেকে
জাতিসংঘের অধীনে
শহীদ ওসমান
হাদি হত্যার
নিরপেক্ষ তদন্তের
দাবিতে প্রধান
উপদেষ্টার বাসভবন
যমুনার সামনে
ও হোটেল
ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে
ইনকিলাব মঞ্চের
ব্যানারে অবস্থান
নেয় কয়েকশ’
আন্দোলনকারী। একই
সঙ্গে জাতীয়
বেতন কমিশনের
প্রতিবেদনের আলোকে
৯ম পে–স্কেলের গেজেট
প্রকাশ ও
বাস্তবায়নের এক
দফা দাবিতে
একই স্থানে
অবস্থান নেন
সরকারি কর্মচারীরা।
সেখানের নিরাপত্তায়
বিপুল সংখ্যক
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর
সদস্য নিয়োজিত
করা হয়।
দেয়া হয়
কয়েক স্তরের
নিরাপত্তাবেষ্টনী। শুধু
তাই নয়,
গতকাল শুক্রবার
রাষ্ট্রীয় বাসভবন
যমুনার নিরাপত্তায়
কাকরাইল মসজিদ
ও হোটেল
ইন্টারকন্টিনেন্টাল এলাকায়
মোতায়েন করা
হয় ছয়
প্লাটুন বিজিবি।
কিন্তু জঙ্গী
স্টাইলে থাকা
সেখানের কিছু
আন্দোলনকারী আইনশৃঙ্খলা
বাহিনীর সঙ্গে
সংঘর্ষে জড়িয়ে
পড়ে। এ
সময় পুলিশকে
লাঠিপেটা, টিয়ারশেল ও
সাউন্ড গ্রেনেড
নিক্ষেপ করতে
হয়। বিশেষজ্ঞরা
বলছেন, এটি আসলে
কোনো দাবি
নয়, একটি চক্র
দাবি আদায়ের
নামে সরকারকে
বিতর্ক করতে
চায়। যাতে
করে একটি
সুষ্ঠু নির্বাচন
বাধাগ্রস্ত হয়।
ঢাকা মহানগর
পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার শেখ
মো. সাজ্জাত আলী
বলেন, ইনকিলাব মঞ্চের
বিক্ষুব্ধ লোকজন
পুলিশের ব্যারিকেড
ভেঙে যমুনা
ঘেরাওয়ের চেষ্টা
করে। এ
সময় বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ
জলকামানের উপরে
উঠে সেটার
ক্ষতি করার
চেষ্টা করে।
এ অবস্থায়
জনস্বার্থে পুলিশ
অ্যাকশনে যেতে
বাধ্য হয়।
পুলিশ প্রথমে
বিক্ষোভকারীদের ওপর
জলকামান থেকে
পানি ছোড়ে।
পরে সাউন্ড
গ্রেনেড ও
টিয়ারশেল নিক্ষেপ
এবং লাঠিপেটা
করে। এ
সময় বেশ
কয়েকজন আহত
হন। এর
আগে বেলা
১১টা ৪৫
মিনিটের দিকে
নবম জাতীয়
বেতন কমিশনের
প্রতিবেদনের আলোকে
গেজেট প্রকাশ
ও বাস্তবায়নের
এক দফা
দাবিতে যমুনা
অভিমুখে মিছিল
করছিলেন সরকারি
কর্মচারীরা। এ
সময় পুলিশ
তাদের বাধা
দেয়।
একপর্যায়ে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ জলকামানের পানি ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। যদিও গত বৃহস্পতিবার রাতেই নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টেও প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানিয়েছিলেন, ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জাতিসংঘকে তদন্তের প্রস্তাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। তিনি আরো লিখেন, অন্তর্বর্তী সরকার এরই মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যত দ্রুত সম্ভব এ মামলার তদন্তের জন্য জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাই কমিশনারের দফতরকে প্রস্তাব দেওয়া হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এ মামলায় পূর্ণ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিতে অটল রয়েছে। এ ধরনের তদন্তে সম্ভাব্য সব সহযোগিতা দেওয়া হবে। রাতে সরকারের পক্ষ থেকে যখন এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়, তখন হাদি হত্যার বিচার দাবিতে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার সামনে ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরা অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলেন। কিন্তু গতকাল তারা আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এদিকে সম্প্রতি অস্ত্র নিয়ে ক্যান্টনমেন্টে ঢুকতে গিয়েছিল ঢাকাণ্ড১৭ আসনের জামায়াতের প্রার্থী ডা. এস এম খালেদুজ্জামান।
নিয়ম অনুযায়ী সেনাবাহিনী ভদ্রভাবে নিষেধ করলেও সেনাবাহিনীর সাথে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেন জামায়াতের এই এমপি প্রার্থী। যদিও তাকে কেউ না চেনায় তিনি তারেক রহমানের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরিচয় দেন। রাজনীতিবিদরা বলছেন, জুলাই অভ্যুত্থানে সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। যে সেনাবাহিনী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে; সেই সেনাবাহিনীকে কখনোই অসম্মান করা চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ। সব সমালোচনার বাইরে রাখা হয়েছে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে। সেই সেনাবাহিনীর সাথে একজন প্রার্থীর এমন আচরণ ফ্যাসিবাদী ও হিংস্র আচরণের বহিঃপ্রকাশ। ষড়যন্ত্রকারীদের সাথে মিশে জামায়াতে ইসলামী নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতের এহেন কর্মকাণ্ড ঘিরে এমনই অভিযোগ করছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।



