ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে শিল্পনগরী গাজীপুরের পাঁচটি আসনে প্রার্থীদের প্রচার–প্রচারণায় জমে উঠেছে নির্বাচনি মাঠ। তবে পোস্টারবিহীন নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রচারের প্রধান ভরসা এখন সামাজিকমাধ্যম ফেসবুক। প্রচারণার অংশ হিসেবে প্রার্থী ও তাদের কর্মী–সমর্থকরা ফেসবুক, টিকটক ও ইউটিউবে প্রার্থীদের ভিডিও বার্তা, গান, গ্রাফিক্স ও লাইভ ভিডিও প্রকাশ করছেন। পাশাপাশি প্রার্থীরা মাঠপর্যায়ে সীমিত আকারে উঠান বৈঠক, ঘরে ঘরে লিফলেট বিতরণ ও সরাসরি ভোটার সংযোগের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের লক্ষ্য করেই সাজানো হয়েছে এ ভার্চুয়াল কৌশল। এবার জাতীয় নির্বাচন ঘিরে জেলার পাঁচটি আসনেই বিএনপি, জামায়াত–সমর্থিত জোট, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থীরা ডিজিটাল কৌশলের পাশাপাশি মাঠে উপস্থিতি বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। ভোটের মাঠ বিশ্লেষণে দেখে গেছে– গাজীপুর শহর, টঙ্গী, কালিয়াকৈর, কালীগঞ্জ, কাপাসিয়া ও শ্রীপুরের বিভিন্ন এলাকায় তরুণ ভোটারদের বড় একটি অংশ অনলাইন কনটেন্টের মাধ্যমে প্রার্থীদের সম্পর্কে ভোটারদের জানান দিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। ভোট প্রচারণার কৌশল বিষয়ে টঙ্গীর কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী রায়হান কবির বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক আর টিকটকে প্রার্থীদের বক্তব্য, প্রতিশ্রুতি আর সমালোচনা সবই পাওয়া যাচ্ছে। এবার ভোটে প্রার্থীদের পোস্টার না থাকলেও তাদের সম্পর্কে তথ্য পেতে সমস্যা হচ্ছে না।
তরুণ ভোটাররা ডিজিটাল প্রচারণার মাধ্যমকেই সময়োপযোগী মনে করছেন। গাজীপুর শহর এলাকার বাসিন্দা ও ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম ইসলামও মনে করছেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং তরুণদের কাছে সহজেই পৌঁছায়। এতে পোস্টার না থাকাই পরিবেশের জন্য ভালো। বরং ফেসবুক–টিকটকেই সব পাই। তবে এক্ষেত্রে তথ্যের অপপ্রচারের দিকে বিশেষ নজরদারি রাখার প্রয়োজন রয়েছে। এসব আসনের ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ছাত্র–জনতার আন্দোলনে সক্রিয় তরুণদের লক্ষ্য করে এনসিপি ও অন্যান্য নতুন রাজনৈতিক শক্তি ভিডিও ও আবেগঘন কনটেন্ট প্রকাশ করছে। জুলাই আন্দোলনের ছবি, ভিডিও ও প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্য ব্যবহার করে তরুণ ভোটারদের সঙ্গে সংযোগ তৈরির চেষ্টা চোখে পড়ছে। গাজীপুরের বিভিন্ন আসনে বিএনপি অনলাইন প্রচারণায় বেশ সক্রিয়। সংক্ষিপ্ত ভিডিও, গ্রাফিক্স ও স্লোগানভিত্তিক কনটেন্টে দলটির প্রস্তাবিত নীতিমালা তুলে ধরা হচ্ছে। পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নিয়ে ভিডিও কনটেন্ট তৈরি করে শেয়ার করা হচ্ছে স্থানীয় ফেসবুক গ্রুপ ও পেজে।
গাজীপুর–১ আসনের বিএনপির দলীয় প্রার্থী মো. মজিবুর রহমান জানান, নির্বাচন কমিশনের নিয়মনীতি মেনেই প্রচার প্রচারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে তরুণ প্রজন্মসহ বেশিরভাগ মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্গে যুক্ত তাই এই প্লাটফর্মেই আমরা প্রচারণা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। পাশাপাশি আমাদের কর্মীরা মানুষের বাড়িতে বাড়িতে গিয়েও ভোট চাইছে। জামায়াত–নেতৃত্বাধীন জোট এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রচারণা জোরদার করেছে। ধর্মীয় ও নৈতিক বার্তাভিত্তিক ভিডিও, প্রচারণামূলক গান এবং প্রতীকী স্লোগান দিয়ে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রার্থীদের ভোট প্রচারণায় নির্মিত কনটেন্ট গাজীপুরের বিভিন্ন ওয়ার্ড ও ইউনিয়নভিত্তিক ফেসবুক গ্রুপে ছড়িয়ে পড়ছে।
গাজীপুর–২ আসনের এনসিপির প্রার্থী আলী নাছের খান বলেন, তরুণ ভোটারদের লক্ষ্য করেই আমরা ফেসবুকে বেশি প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছি। সেখানে বেশ সাড়াও পাচ্ছি। এছাড়া প্রবীণ ভোটারদের কাছে টানতে আমরা ভোটারদের বাড়িতে বাড়িতে যাওয়ার চেষ্টা করছি। জানা গেছে, ২২ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনি প্রচারণা শুরু হলেও সামাজিকমাধ্যমে ডামাডোল শুরু হয়েছে আরও আগেই। ফেসবুক, টিকটক ও ইউটিউবে একের পর এক প্রচারণামূলক ভিডিও, গান ও গ্রাফিক্স ছড়িয়ে দিচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। ২০২৪ সালের ছাত্র–জনতার আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণ প্রজন্মকে লক্ষ্য করেই এবার ডিজিটাল প্রচারণায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই তরুণ ভোটাররাই নির্বাচনের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন তারা। তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ অনলাইন প্রচারণাকে সময়োপযোগী ও কার্যকর মনে করছেন।
বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গাজীপুরের কাপাসিয়া, কালীগঞ্জ ও শ্রীপুরের গ্রামাঞ্চলে এখনো সরাসরি যোগাযোগই ভরসা। পোস্টার না থাকায় প্রার্থীরা উঠান বৈঠক, চা–স্টলে মতবিনিময় এবং ঘরে ঘরে লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। কালীগঞ্জ উপজেলার আমতলি গ্রামের বাসিন্দা ও স্থানীয় ভোটার আবদুল মান্নান বলেন, আমার ফোনে ফেসবুক তেমন একটা দেখি না। যে কারণে কে প্রার্থী, কী প্রতীক এসব বুঝতে কষ্ট হচ্ছে। আগের পোস্টার থাকলে তাদের বিষয়ে চিনতে ও জানতে সহজ হতো। একই ধরনের মন্তব্য করেন কাপাসিয়ার ষাটোর্ধ্ব ভোটার রহিম উদ্দিন। তিনি বলেন, মোবাইল ফোন চালাই না। এখন কারা দাঁড়াইছে, ঠিকমতো জানা যায় না। এলাকায় এসে কথা বললে তখনই বুঝি।
এ প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) গাজীপুর শাখার সাধারণ সম্পাদক ইফতেখার শিশির বলেন, ব্যানার–পোস্টারহীন ডিজিটাল প্রচারণা একটি আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব বিবর্তন। এটি শহরের পরিচ্ছন্নতা রক্ষা ও অপচয় রোধে কার্যকর। তবে প্রযুক্তিহীন ভোটারদের তথ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা এবং অনলাইনে অপপ্রচার বা ‘ডিপফেক’ কন্টেন্ট মোকাবিলাটা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। কোনাবাড়ী মেট্রো স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও সভাপতি মো. আখতার উজ জামান বলেন, পোস্টারবিহীন এই নির্বাচনে গাজীপুরের পাঁচ আসনে ডিজিটাল ও সরাসরি দুই ধারার প্রচারণাই চলছে সমান্তরালে। তরুণ ভোটারদের কাছে অনলাইন কৌশল কার্যকর হলেও বয়স্ক ও প্রযুক্তিবঞ্চিত ভোটারদের জন্য মাঠের উপস্থিতিই এখনো সবচেয়ে বড় ভরসা। ফলে শেষপর্যন্ত কোন কৌশল কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ধারণ করবে গাজীপুরের পাঁচ আসনের নির্বাচনি ফলাফল। গাজীপুর জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলম হোসেন বলেন, ব্যানার পোস্টার ছাড়া নির্বাচন এটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। প্রার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার–প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে নির্বাচনের আচরণ বিধি কেউ লঙ্ঘন করছে কিনা সেটিও তদারকি করার জন্য ১২ জন ম্যাজিস্ট্রেট সর্বক্ষণ কাজ করছেন।



