তথ্য গোপন করে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক স্থাপনা নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল– এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে লীজ দেয়ার প্রক্রিয়ার প্রতিবাদে এবং আত্মঘাতী এই প্রক্রিয়া বন্ধের দাবিতে শ্রমিক আন্দোলনের মুখে দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দরে অচলাবস্থার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। চুপিসারে শর্ত গোপন রেখে চুক্তির প্রতিবাদে আজ শনিবার ও আগামীকাল রোববার চট্টগ্রাম বন্দরে সর্বাত্মক ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল। ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী আজ সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত বন্দরে সব ধরনের অপারেশন্যাল কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। এরপর দিন সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত অপারেশন্যাল কার্যক্রম এবং সেইসঙ্গে বন্দরের দাপ্তরিক কার্যক্রম বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন শ্রমিক দলের নেতারা। শ্রমিক দলের এই কর্মসূচিতে সর্বাত্মক সমর্থন দিয়েছে শ্রমিক কর্মচারি ঐক্য পরিষদ–স্কপ, চট্টগ্রাম।
সেইসাথে স্কপ আগামীকাল বেলা ১১টায় চট্টগ্রাম বন্দর ভবন অভিমুখে কালো পতাকা মিছিলের কর্মসূচি দিয়েছে। বৃহস্পতিবার পৃথক সংবাদ সম্মেলন থেকে এসব কর্মসূচি দেয়া হয়। ওই দিন দুপুরে চট্টগ্রাম বন্দর ভবনের সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন শ্রমিকরা। এদিকে গতকাল শুক্রবার চট্টগ্রাম বন্দরে ধর্মঘট কর্মসূচির সমর্থনে ব্যাপক গণসংযোগ ও খন্ড মিছিল এবং পথসভা করেছে শ্রমিক দল। জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় নেতা শেখ নুরুল্লাহ বাহার ইনকিলাবকে বলেন, শনিবার সকাল থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে সর্বাত্মক ধর্মঘট সফলে আমাদের ব্যাপক প্রস্তুতি আছে। কঠোরভাবে এই কর্মসূচি পালন করা হবে। আমাদের এই যৌক্তিক দাবির প্রতি সবার সমর্থন রয়েছে। বন্দর জাতীয় সম্পদ, বন্দর নিয়ে কাউকে আত্মঘাতী কোন সিদ্ধান্ত নিতে দেয়া হবে না। তিনি বলেন, দুইদিনের ধর্মঘট কর্মসূচির মধ্যেও সরকার যদি গোপন চুক্তি থেকে ফিরে না আসে তা হলে আরো কঠোর কর্মসূচি দেয়া হবে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তরফে এই ধরনের কর্মসূচিকে বেআইনী উল্লেখ বন্দর সচল রাখতে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আজকের কর্মসূচিতে ঘিরে বন্দরের ভেতরে বাইরে উত্তেজনা বিরাজ করছে।
নগর পুলিশের পক্ষ থেকে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বন্দর এলাকায় পুলিশী টহল ও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন স্থাপনা বিশেষ করে লাভজনক এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার প্রতিবাদে দীর্ঘদিন থেকে শ্রমিক দলসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ও রাজনৈক দল আন্দোলন করে আসছে। এসব দলের নেতারা বলছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ডিপি ওয়ার্ল্ডকে লিজ চুক্তি করার যে উদ্যোগ নিয়েছে তা যদি বাতিল না করে তাহলে আরো কঠোর কর্মসূচি দেয়া হবে। আগামী ১৩ দিন পরে আমরা একটা নির্বাচিত সরকার পাচ্ছি। কেন তড়িঘড়ি করে ১৩ দিন আগে আমাদের বন্দর দিয়ে দিতে হবে। আমরা নির্বাচিত সরকারের হাতে ছেড়ে দিই। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসে যা করবে আমরা তখন দেখব। নিশ্চয় একটি গণতান্ত্রিক সরকার গণমানুষের পক্ষে সিদ্ধান্ত দিবে। দেশের স্বার্থ চিন্ত করবে। যার ফলে আমরা সরকারের কাছে আহ্বান জানাতে চাই, তড়িঘড়ি করে এটা করা আপনাদের কাজ না। আপনারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, রুটিন কাজ করে চলে যাবেন। আন্দোলনরত শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ সরকার গায়ের জোরে বিদেশি এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার জন্য চট্টগ্রাম বন্দরকে বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দিতে চায়। এতে করে অর্থনৈতিকভাবে যেমন আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হব, নিরাপত্তার দিক থেকেও আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হব। সার্বভৌমত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সমুদ্রপথে শক্তি প্রদর্শনের যে বিষয়টা।
চায়না, ইন্ডিয়া, আমেরিকার যে সামরিক একটা অবস্থান তৈরি করা ভৌগলিক কারণে বাংলাদেশের উপর তাদের যে প্রচেষ্টা সেটার কারণেই বন্দর বিদেশিদের দিতে চায়। তারা বলছেন, এটি একটি কৌশলগত ও ভূ–রাজনৈতিক বিষয়। চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রাণকেন্দ্র। পর্যাপ্ত দেশি সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বিদেশি কোম্পানির হাতে এই টার্মিনাল তুলে দেয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তাছাড়া ডিপি ওয়ার্ল্ডের আন্তর্জাতিক কার্যক্রম ও অতীত রেকর্ড প্রশ্নবিদ্ধ। প্রস্তাবিত ৪০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি ইজারা দেশের সামগ্রিক কার্গো ম্যানেজমেন্ট ও বন্দর উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। চুক্তি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে নন–কমপ্লায়েন্সের গুরুতর ঝুকি রয়েছে এবং রাষ্ট্রের হাতে কার্যকর প্রতিকারের নিশ্চয়তা নেই। একটি অনির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে নির্বাচিত সংসদের আলোচনা ছাড়া ৪০ বছরের জন্য জাতীয় সম্পদ হস্তান্তরের কোনো নৈতিক বা সাংবিধানিক বৈধতা নেই। বন্দর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য : চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তরফে গতকাল এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কতিপয় স্বার্থান্বেষী দল ও গোষ্ঠী দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত এবং বন্দরকে অস্থিতিশীল করা চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে। এনসিটি সংক্রান্ত সরকারের সিদ্ধান্ত উচ্চ আদালতের রায়ে বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়ে সভা, সমাবেশ বিক্ষোভ কর্মসূচির মাধ্যমে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। বন্দরের তরফে বলা হয়, দেশের সার্বিক আমদানি–রফতানি কার্যক্রম স্বাভাবিক এবং বন্দরের ক্রমবর্ধমান প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে বন্দরের কার্যক্রম সচল রাখার কোন বিকল্প নেই। এই অবস্থায় বন্দর সচল রাখতে সবার সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করা হয়।
আর যারা বেআইনিভাবে বন্দরে অস্থিরতা তৈরি করছে তাদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণেরও হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় নেতা শেখ নুরুল্লাহ বাহার বলেন, বন্দর কর্মচারীদের হুমকি–ধামকি দিয়ে আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না। কর্তৃপক্ষ আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত থেকে দুরে সরে আসলে আমরা আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিবো।



