আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোটের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে এমন ‘বিপজ্জনক ব্যক্তি’ চিহ্নিত করে তাদের গ্রেপ্তার ও নজরদারিতে রাখার নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। নির্বাচনকালে সহিংসতা, ভোটকেন্দ্র দখল, ভোটকেন্দ্রে ভাঙচুর–অগ্নিসংযোগ, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে এমন ব্যক্তিদের বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করছে পুলিশ। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ ৩২৯ ব্যক্তিকে ‘দুষ্কৃতকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদেরকে নগরীতে প্রবেশ ও অবস্থানে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও শান্তিপূর্ণ ভোট অনুষ্ঠান নিশ্চিত করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অতীতের বিভিন্ন নির্বাচন এবং সহিংসতার অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে বিপজ্জনক বা ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হচ্ছে। এতে কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নয়, বরং তার আগের কার্যক্রম, মামলা সংক্রান্ত তথ্য, গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই চিহ্নিত করা হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি–ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোট অনুষ্ঠানে আমরা বদ্ধপরিকর।
এজন্য যা যা করা দরকার পুলিশ সদর দপ্তর তা করতে সর্বোচ্চ সচেষ্ট আছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও যারা নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করতে চায় তাদের গ্রেপ্তার ও নজরদারিতে রাখতে মাঠ পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে এ ব্যাপারে নিয়মিত ফলোআপ করা হচ্ছে। সারাদেশে চলমান আছে অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ ২। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ‘বিপজ্জনক’ ব্যক্তি হিসেবে ধরা হচ্ছে। এ ছাড়া অবৈধ অস্ত্রধারী, চিহ্নিত চাঁদাবাজ, শীর্ষ সন্ত্রাসী, অস্ত্র ব্যবসায়ী, চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী এবং বিগত সময়ে যেসব ব্যক্তি মব সহিংসতায় নেতৃত্ব দিয়েছে তাদেরও ভোটের জন্য ‘বিপজ্জনক’ ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। ভোট অনুষ্ঠানের আগেই তাদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যদের করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়সমূহ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত দিকনির্দেশনা প্রদান করতে একটি বুকলেট তৈরি করছে পুলিশ সদর দপ্তর। যেখানে ভোটের মাঠে পুলিশের কার কী ভূমিকা পালন করতে হবে এবং কোন কোন দিক দায়িত্ব পালনকালে কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে ওই বুকলেটে তা লিখিত নির্দেশনা থাকছে।
এই বুকলেটটি নির্বাচনী দায়িত্ব পালনরত প্রত্যেক পুলিশ সদস্যের পকেটে থাকবে। এই বুকলেটে ভোট গ্রহণের কমপক্ষে ৭২ ঘণ্টা আগে নির্বাচনী এলাকায় সন্দেহভাজন ও বহিরাগতদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পুলিশ প্যাট্রল পরিচালনা এবং ভোটারদের নিরাপত্তা প্রদান নিশ্চিত করা; গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্র ও আশপাশের সরকারি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও সহিংসতাসহ যে কোনো অপ্রীতিকর কার্যক্রম প্রতিরোধ ও সার্বিক নিরাপত্তার কাজে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে সম্পৃক্ত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। ইতোমধ্যে থানা পুলিশ ও গোয়েন্দারা ভোটকেন্দ্রের আশপাশে অস্ত্র মহড়া, ভাঙচুর বা ভয়ভীতি সৃষ্টিকারী কার্যকলাপ করতে পারেন এমন ব্যক্তিদের তালিকা তৈরি করে তাদের গ্রেপ্তার ও নজরদারিতে রাখতে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, প্রশাসন এবং স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা কমিটির সমন্বয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। যাদের বিরুদ্ধে অতীতে ভোটকেন্দ্রে হামলা, ব্যালট ছিনতাই, প্রার্থীর কর্মীদের ওপর হামলা, অস্ত্র প্রদর্শন বা সহিংস মিছিলের অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিষয়ে বিশেষভাবে তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।
অপরাধের ধরন, পুনরাবৃত্তি এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে এমন ‘বিপজ্জনক’ ব্যক্তিদের গোপনে চিহ্নিত করছে সংশ্লিষ্ট থানা, জেলা ও মহানগর পুলিশ। ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র এলাকায় ভোটের ৭২ ঘণ্টা আগে থেকেই পুলিশ ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়বে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সূত্র বলেছে, কারাগার থেকে যেসব চিহ্নিত অস্ত্রধারী ও সন্ত্রাসী জামিনে কারামুক্ত হচ্ছেন তাদের ওপরও নজরদারি চলছে। এর মধ্যে যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট মামলা নেই, কিন্তু সুষ্ঠু ভোটের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে তাদের আটকের পর আটকাদেশ দেওয়ার উদ্যোগ চলমান রয়েছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভোটকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ও অনিয়ম ঠেকাতে প্রশাসনের এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের নিরপেক্ষতা ও আইনের যথাযথ প্রয়োগের ওপর। ভোটারদের প্রত্যাশা নির্বাচনের দিন যেন ভয় নয়, আস্থাই প্রাধান্য পায়।



