আজকাল গৃহকর্মী ছাড়া অনেক পরিবারের জীবন কল্পনাই করা যায় না। কিন্তু ঢাকা মহানগরীসহ সারা দেশে এক শ্রেণির গৃহকর্মীর ভয়ংকর হয়ে উঠছে। তারা সরাসরি অপরাধচক্রের সদস্য হিসেবে কাজ করছে। নিরীহ বেশভূষা ধারণ করে কোনো বাসায় কাজ নিয়ে অনেক গৃহকর্মী পরিকল্পিতভাবে চুরি, ডাকাতি থেকে শুরু করে নির্যাতন, মারধর এমনকি হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাও ঘটাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দুশ্চিন্তা বাড়ছে গৃহকর্তা ও গৃহকর্ত্রীদের। বিশেষ করে যারা বাসায় শিশু ও বয়জ্যেষ্ঠদের রেখে যান তাদের দুশ্চিন্তা আরো বেশি। পুলিশ সূত্র জানায়, সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খুন, চুরি–ডাকাতি ও পরিকল্পিত প্রতারণার মতো অন্তত পাঁচটি গুরুতর অপরাধের ঘটনা ঘটেছে যেগুলোর সঙ্গে গৃহকর্মীরা সংশ্লিষ্ট ছিলেন। পুলিশ ও সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, গৃহকর্মীর ছদ্মবেশে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বাসাবাড়ির তথ্য সংগ্রহ করছে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র। তাদের সহায়তা করার অভিযোগ রয়েছে বেশকিছু বাসার নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত দারোয়ান ও কেয়ারটেকারের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থা বিষয়টি সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায়ে জানানোর পর নড়েচড়ে বসেছেন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতনরা। ঐ সংস্থার পক্ষ থেকে বেশকিছু সুপারিশও করা হয়েছে। সেখানেও সঠিক নাম–ঠিকানা যাচাই–বাছাই করেই তারপর গৃহকর্মী নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া বাড়ির মালিক–ভাড়াটিয়াদের পাশাপাশি গৃহকর্মীদের তথ্যও ক্রিমিনাল ইন্টারন্যাশনাল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে (সিআইএমএস) ইনপুট করতে হবে।
গৃহকর্মীর হাতেই পুরো বাসার দায়িত্ব : গত বছর ১০ ডিসেম্বর রাজধানীর মোহাম্মদপুরে চাঞ্চল্যকর মা–মেয়ে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর সারা দেশের মানুষের মধ্যেই গৃহকর্মী নিয়ে নতুন করে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। পুলিশ বলছে, ব্যস্ত ঢাকার বাসিন্দাদের বড় একটি অংশ ঘর ধোয়ামোছা, রান্নাবান্না থেকে শুরু করে সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত নানা কাজে গৃহকর্মীর ওপর নির্ভরশীল। অনেক পরিবারেই দিনের বড় একটি সময় গৃহকর্মীর হাতেই থাকে পুরো বাসার দায়িত্ব। অথচ অতি গুরুত্বপূর্ণ এই দায়িত্বে নিয়োগ দেওয়ার আগে গৃহকর্মীর পরিচয়, ঠিকানা বা আগের কাজের বিবরণ যাচাইয়ের ক্ষেত্রে নেই ন্যূনতম সতর্কতা। এই বিষয়ে পুলিশের কঠোর নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে তা মানছেন না নগরবাসী। ফলে গৃহকর্মীর ছদ্মবেশে অপরাধীরা সহজেই প্রবেশ করছে ঘরের অন্দরমহলে। মোহাম্মদপুরে মা–মেয়ে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, জাতীয় পরিচয়পত্র বা স্থায়ী ঠিকানা যাচাই ছাড়াই তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
স্বর্ণালংকার চুরি :গত বছর ১২ অক্টোবর রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেন এলাকার একটি বাসা থেকে ৫৫ ভরি স্বর্ণালংকার চুরি করে তিন গৃহকর্মী। পার্টটাইম দুই গৃহকর্মীর নির্দেশনায় ঐ বাসা থেকে দফায় দফায় স্বর্ণালংকার চুরি করে ঐ বাসার স্থায়ী গৃহকর্মী। ঐ ঘটনায় তিন জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তার আগে ২০১৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে নিজ বাসায় খুন হন ইডেন মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মাহফুজা চৌধুরী পারভীন। ঐ হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই গৃহকর্মী নিয়োগে সতর্কতার বিষয়টি আলোচনায় আসে।
অচেতন করে চুরি :গত বছর ৮ অক্টোবর রাজধানীর পল্লবী এলাকার একটি বাসা থেকে গৃহকর্মীর ছদ্মবেশে ৯ ভরি স্বর্ণালংকার এবং নগদ ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা চুরি করা হয়। থানায় মামলা হয়। পুলিশগত ৩ জানুয়ারি অভিযুক্ত গৃহকর্মী শিউলী বেগম ওরফে লাকীকে গ্রেফতার করে। এ ব্যাপারে পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম আলমগীর জাহান জানান, সাবিহা মাহবুবা ঘটনার এক দিন আগে ৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় শিউলীর সঙ্গে কথা বলে তাকে বাসায় কাজের জন্য নিয়োগ দেন। ৮ অক্টোবর সকাল ৭টায় কাজে যোগ দেয় শিউলী। সকাল ৯টায় সাবিহা কর্মস্থলে যাওয়ার পর বাসায় তার স্বামী–ছেলে এবং মা ছিলেন। রাত ৮টায় সাবিহা বাসায় ফিরে দেখেন তার মা অচেতন অবস্থায় শুয়ে আছেন এবং ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার খোলা। ড্রয়ার থেকে স্বর্ণালংকার এবং নগদ টাকা চুরি হয়েছে। সাবিহার মা জানান, শিউলী তাকে পেঁপে ভাজি খাইয়েছিল। তারপর তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে কণ্ঠশিল্পী নাজমুন মুনিরা ন্যান্সির দুটি সোনার চেন, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ডায়মন্ডের লকেটসহ মূল্যমান অলংকার চুরি করে নিয়ে যান বাসার দুই গৃহকর্মীসহ তিন জন।
বিশ্বস্ততা যাচাই :মুগদা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ ইমদাদুল ইসলাম তৈয়ব বলেন, বাসাবাড়িতে গৃহকর্মী একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি বলেন, আমার অনুরোধ, নিয়োগের আগে পরিচয় যাচাই, কর্মীর সঠিক নাম, ঠিকানা ও ফোন নম্বর সংগ্রহ করুন এবং তাদের দেওয়া তথ্য যাচাই করুন। পরিচিত কারো সুপারিশ থাকলে ভালো। পূর্ববর্তী কাজের রেফারেন্স, তিনি আগে কোথায় কাজ করেছেন এবং কেন ছেড়েছেন, তা জেনে নিন। কোনো এজেন্সির মাধ্যমে নিয়োগ করলে, সেই এজেন্সির বিশ্বস্ততা যাচাই করুন এবং তাদের দেওয়া তথ্য নিশ্চিত করুন। পাশাপাশি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) নির্ধারিত ফরম পূরণ করে নিকটস্থ থানায় জমা দিন। এটি আইনি বাধ্যবাধকতা ও নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
আদালতের ছয় নির্দেশনা :২০২০ সালে মাহফুজা চৌধুরী পারভীন হত্যা মামলার রায়ে আদালত গৃহকর্মী নিয়োগে ছয় দফা নির্দেশনা দেন। এর মধ্যে রয়েছে নিয়োগের প্রথম ৯০ দিন সতর্ক পর্যবেক্ষণ, গৃহকর্মীর জীবনবৃত্তান্ত ও ছবি থানায় জমা, বাসার মূল প্রবেশপথে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, গৃহকর্মী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্সের আওতায় আনা এবং নিবন্ধিত গৃহকর্মীদের তথ্য থানায় সংরক্ষণ। অথচ এসব নির্দেশনার বাস্তব প্রয়োগ প্রায় অনুপস্থিত।



