মাত্র দুই মাস বয়সে বাবাকে হারিয়েছে শিশু সাফা। সে বাবা ডাকার সুযোগই কখনো পায়নি। নেই বাবার সঙ্গে কোনো স্মৃতিও। কাঁদতে কাঁদতে সাফা বলে, এক যুগ ধরে বাবার জন্য অপেক্ষা করছি। অনেক জায়গায় গিয়েছি, কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো খোঁজ পাইনি। তিন বছর বয়সে বাবাকে হারানো মিমের গল্পও একই রকম বেদনাদায়ক। সে জানায়, তার সমবয়সীদের যখন বাবারা হাঁটা শেখান, তখন সে নিজের বাবাকে খুঁজে বেড়িয়েছে। হৃদির প্রশ্ন– বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার যে স্বপ্ন সে লালন করে আসছে, সেই স্বপ্ন কি কোনোদিন পূরণ হবে? সে বলে, আমার বয়স যখন আড়াই বছর, তখন থেকেই আম্মুর কোলে চড়ে এখানে (এমন অনুষ্ঠানে) আসি। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল, বাবার সঙ্গে স্কুলে যাব। কিন্তু আজও সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। হৃদি আরো বলেন, ‘বছর যায়, বছর আসে, কিন্তু আমাদের বাবা আর আসে না। ৫ আগস্টের পর এক বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেলো, কিন্তু আমরা কাউকে ফিরে পেলাম না।’ মিম, সাফা ও হৃদির মতো অনেকের প্রিয়জন বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের আমলে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের শিকার হয়েছেন। কেউ হারিয়েছেন বাবা, কেউ সন্তান, কেউ ভাই, আবার কেউ স্বামীকে। আজ তাদের একমাত্র দাবি– সুষ্ঠু বিচার। ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের সময়ে গুম–খুনের শিকার ব্যক্তিরা গতকাল শনিবার রাজধানীর শেরে বাংলা নগরে চীন–মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে মায়ের ডাক ও আমরা বিএনপি পরিবার আয়োজিত অনুষ্ঠানে জড়ো হয়েছিলেন। সেখানে প্রিয়জনদের গুম–খুনের বর্ণনা, তাদের জন্য দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কারো মা–বাবা, কারো স্ত্রী–সন্তান, ভাই–বোনের অপেক্ষার বর্ণনা দিচ্ছিলেন।
অনেকেই প্রিয়জন হারানোর বেদনা তুলে ধরতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাদের কান্না ও আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানস্থলের পরিবেশ। বিশেষ করে গুম–খুনের শিকার ব্যক্তির মা ও মেয়েরা যখন কথা বলছিলেন তখন উপস্থিত সকলের চোখ ছলছল করছিল, অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন, অনেকে কান্না লুকিয়ে চোখ মুছতে থাকেন। তাদের হৃদয়বিদারক বক্তব্যে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গুম হওয়া ব্যক্তি পারভেজের ছেলে রাতুল এসে বলেন, আমার বাবার সঙ্গে বাবার চাচাকে একসঙ্গে র্যাব তুলে নিয়ে যায়। আজ ১২ বছর পার হয়ে ১৩ বছরে পড়ল, আজ পর্যন্ত আমরা কোনো সন্ধান পাইনি। ১৩ বছর ধরে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াই। এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে যাইনি। আমরা কি কেউ এমন বাংলাদেশ চেয়েছিলাম? তারেক রহমানের কাছে আমি অনুরোধ করব, আগামীতে যদি জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসতে পারেন, গুম–খুনের জন্য এমন একটা আইন করবেন, পরবর্তীতে কেউ যেন এই গুমের মতো জঘন্য কাজ করার সাহস পায় না। গুমের শিকার আরেকজনের কন্যা লামিয়া বলেন, ২০১৩ সালে ৪ ডিসেম্বর আমার বাবাকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। ১৩ বছর হয়ে গেছে আমি আমার বাবাকে দেখি না, বাবা কী জিনিস বুঝি না। আমার বাবাকে যখন নিয়ে যায়, তখন আমার ৩ বছর বয়স ছিল, আমি তখন বাবা মানেটাও বুঝতাম না। আমি যদি বুঝতাম আমার বাবাকে হারিয়ে ফেলব, তাহলে আমি আমার বাবাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতাম। আমি আমার বাবাকে আর কখনো পাব কি না, জানি না। আমি আমার বাবাকে পেতে চাই। নিহত ওলীর স্ত্রী এসে জানান, তার স্বামীকে মেরে ফেলার আগে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়।
স্বামী ছাড়া কীভাবে তিনি সন্তানদের নিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন সেসব বর্ণনা দিতে অঝোরে কাঁদতে থাকেন এই ভুক্তভোগী। গুমের শিকার পারভেজ হোসেনের কন্যা হৃদি গুম কমিশনের উদ্দেশে বলেন, “গুম কমিশন বলে– ধরে নিন ওরা গুম, ওরা মৃত। কেন এটা কি হাতের অঙ্ক যে আমরা ধরে নেব আমাদের বাবারা আর নেই? একটা দল করা কোনো অপরাধ না। দল সবাই করে। এর জন্য এটা কেমন বিচার এই বাংলাদেশে? আমি তারেক রহমান চাচ্চুর কাছে আশা করি যে, আমাদের বাবাদের খুঁজে দেবেন। এই বাংলাদেশের মাটিতে বিচার করবেন এই গুমের। এসব ভুক্তভোগীরা বিগত সরকারের আমলে গুমের শিকার তাদের পরিবারের সদস্যদের ফিরে পাওয়ার আকুতি জানান, পাশাপাশি সরকারের কাছে সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানান তারা। এ সময় তাদের সকলেরই আকাক্সক্ষা ছিল একবার তারেক রহমানকে কাছ থেকে দেখে তাদের কষ্টের কথাগুলো ব্যক্তিগতভাবে জানানো। কাউকে কাউকে মঞ্চে বসা তারেক রহমানের কাছে নিয়ে যাওয়া হলে তিনি তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কিছু সময় কথা বলেন। তিনি গুমের শিকার পরিবারের এই সদস্যদের বক্তব্যের এসব কান্নাজড়িত আকুতি শুনে একপর্যায়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান মঞ্চে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকেন। গুম হওয়া বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর স্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা তাহসিনা রুশদীর লুনা বলেন, গুম ও খুনের শিকার পরিবারগুলো অভিভাবকহীন পরিবারে পরিণত হয়েছে।
এসব
পরিবার সামাজিক
ও রাষ্ট্রীয়
হয়রানির শিকার
হচ্ছে। তিনি
পরিবারগুলোর জন্য
আর্থিক সহায়তার
উদ্যোগ নিতে
তারেক রহমানের
প্রতি অনুরোধ
জানান। গুমের শিকার
বিএনপির স্থায়ী
কমিটির সদস্য
সালাহউদ্দিন আহমদ
বলেন, সরকারি হিসাব
অনুযায়ী এক
হাজার ৪৮
জন কারাগারে
মারা গেছেন।
মানবাধিকার কমিশনের
তালিকায় ৯০৭
জন গুমের
শিকার হলেও
গুম কমিশনের
তথ্য অনুযায়ী
২০২৪ সাল
পর্যন্ত এক
হাজার ৮৫০
জন গুম
হয়েছেন।
অনুষ্ঠানে তারেক
রহমান এসব
পরিবারের প্রতি
গভীর সহমর্মিতা
জানান। গুম
ও খুনের
সেই বিভীষিকাময়
দিন ও
রাতের অবসান
ঘটেছে উল্লেখ
করে তিনি
বলেন, দেশের মানুষ
গণতন্ত্রের পথে
হাঁটতে শুরু
করেছে। আমরা
একটি ভয়াবহ
দুঃসময় অতিক্রম
করেছি। অনেক
সন্তান এখনো
অপেক্ষায় আছে–
তাদের বাবা
হয়তো হঠাৎ
দরজায় কড়া
নাড়বে। অনেক
মা এখনো
আশা করে
বসে আছেন–
তার সন্তান
একদিন ফিরে
আসবেন। এসময় ভুক্তভোগী
পরিবারের এক
সদস্য দাবি
করেন, গুম প্রতিরোধে
এমন আইন
প্রণয়ন করতে
হবে, যেন ভবিষ্যতে
এ ধরনের
অপরাধ করার
সাহস আর
কেউ না
পায়। আমরা বিএনপি
পরিবারের আহ্বায়ক
আতিকুর রহমান
রুমনের সভাপতিত্বে
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা
করেন মায়ের
ডাকের সভানেত্রী
সানজিদা ইসলাম
তুলি, আমরা বিএনপি
পরিবারের সদস্য
জাহিদুল ইসলাম
রনি ও
মোকসেদুল মোমিন
মিথুন। বক্তব্য
দেন হুম্মাম
কাদের চৌধুরী,
আনিসুর রহমান
তালুকদার খোকন,
রুহুল কবির
রিজভী, রশিদুজ্জামান মিল্লাত
প্রমুখ।



