জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে সংগঠিত রাজনৈতিক প্রতিরোধমূলক কর্মকা–ে অংশগ্রহণকারীদের ফৌজদারি দায়মুক্তির বিধান রেখে অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছে উপদেষ্টা পরিষদ। এ অধ্যাদেশ আগামী পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়ে আইনে পরিণত হবে। এ অধ্যাদেশে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী যোদ্ধাদের আইনি সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদে জুলাই গণ–অভ্যুত্থান সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ অধ্যাদেশ অনুমোদন দেওয়া হয়।বৈঠক শেষে বিকালে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংবাদ সম্মেলনে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, আগামী পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে এ বিষয়ে গেজেট জারি হবে। উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানকালে রাজনৈতিক প্রতিরোধের উদ্দেশে সংঘটিত কার্যাবলি থেকে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানকারীদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিরোধ বলতে বোঝানো হয়েছে। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে সংঘটিত কার্যাবলির দায়দায়িত্ব থেকে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানকারীদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
জুলাই ও আগস্টের সময়কালে সংঘটিত কার্যাবলি থেকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। আসিফ নজরুল বলেন, ইতিমধ্যে জুলাই অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা থাকলে সে মামলা প্রত্যাহারের পদক্ষেপ নেবে সরকার। এ ছাড়া এখন থেকে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে নতুন কোনো মামলা করা যাবে না। তবে জুলাই ও আগস্টে রাজনৈতিক প্রতিরোধের নামে ব্যক্তি ও সংকীর্ণ স্বার্থে কোনো হত্যাকা– ঘটে থাকলে সে ফৌজদারি মামলা থেকে রেহাই পাবে না। আইন উপদেষ্টা বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় যদি কোনো হত্যাকা– ঘটে থাকে, যেটার সঙ্গে জুলাই অভ্যুত্থান সম্পৃক্ত নয়, লোভের বশবর্তী হয়ে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ও সংকীর্ণ স্বার্থে হত্যাকা– ঘটায়, এ আইনের মাধ্যমে তাঁকে দায়মুক্তি দেওয়া হবে না। আইনটি তাদের জন্য করা হয়নি। আইনটি করা হচ্ছে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য সংঘটিত কার্যাবলির ক্ষেত্রে। সে কার্যাবলিতে যারা সমন্বিতভাবে জড়িত ছিল, তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। আসিফ নজরুল বলেন, আমরা আগেই ঘোষণা করেছিলাম জুলাই অভ্যুত্থানকারীদের দায়মুক্তি দেওয়া হবে। জুলাই অভ্যুত্থানকারীদের প্রতি আমাদের প্রতিশ্রুতি ছিল, সে প্রতিশ্রুতি রক্ষায় এই অধ্যাদেশ করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন আসতে পারে কোন হত্যাকা– রাজনৈতিক প্রতিরোধের প্রক্রিয়ায় হয়েছে আর কোন হত্যাকা– ব্যক্তিগত সংকীর্ণতার স্বার্থে হয়েছে এ কথা উল্লেখ করে আইন উপদেষ্টা বলেন, এটা নির্ধারণের দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে দেওয়া হয়েছে। আসিফ নজরুল বলেন, ‘কোনো ভিকটিমের (ভুক্তভোগী) পরিবার মনে করে তার পিতা বা তার ভাই হত্যাকা–ের শিকার হয়েছে, সে হত্যাকা–ের সঙ্গে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের কোনো সম্পর্ক ছিল না, তাহলে তাঁরা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে যাবেন। মানবাধিকার কমিশন তদন্ত করে যা দেখবে, তারা সে প্রতিবেদন আদালতে জমা দেবে।
পুলিশের মতো মানবাধিকার কমিশনের প্রতিবেদন সমান বলে গণ্য হবে। তদন্তে যদি উঠে আসে রাজনৈতিক প্রতিরোধের কারণে এই হত্যাকা-, তাহলে তাঁকে দায়মুক্তি দেওয়া হবে। আর যদি ব্যক্তিগত কোনো সংকীর্ণ স্বার্থে হত্যাকা– ঘটে থাকে, তাহলে সেই অপরাধ থেকে কেউ রেহাই পাবে না। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বর্তমানে নেই। তাহলে ভুক্তভোগীরা কার কাছে যাবে? সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আইন উপদেষ্টা বলেন, আগামী ৩১ জানুয়ারির মধ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠন করা হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান সুরক্ষা ও দায়মুক্তি নির্ধারণ আইন অনুমোদন করা হয়েছে। জুলাই–আগস্টে রাজনৈতিক প্রতিরোধে ফৌজদারি মামলা থাকলে সরকার প্রত্যাহার করবে। নতুন করে মামলা করা হবে না। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে কোথাও কোনো মামলা হয়েছে কি না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে ।এর আগে ৮ জানুয়ারি এক ফেসবুক পোস্টে আইন উপদেষ্টা জানান ‘দায়মুক্তি অধ্যাদেশ’-এর খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। জুলাই বিপ্লবের বীরদের ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসরদের হাত থেকে নিরাপদ রাখতে এবং তাদের প্রতিরোধমূলক কর্মকা–ের স্বীকৃতি দিতেই এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ড. আসিফ নজরুল তার পোস্টে উল্লেখ করেন, জুলাই যোদ্ধারা জীবনবাজি রেখে দেশকে ফ্যাসিস্ট শাসন থেকে মুক্ত করেছেন। আন্দোলনের সময় ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার খুনিদের বিরুদ্ধে তারা যে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম চালিয়েছিলেন, তার জন্য তাদের দায়মুক্তি পাওয়ার অধিকার রয়েছে। এ ধরনের আইন প্রণয়ন সম্পূর্ণ বৈধ এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। উদাহরণ হিসেবে তিনি আরব বসন্তসহ সমসাময়িক কালের বিভিন্ন বিপ্লবের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে গণ–অভ্যুত্থানের পর বিপ্লবীদের সুরক্ষায় এ ধরনের আইন করা হয়েছিল। সংবিধান ও মুক্তিযোদ্ধাদের নজির অধ্যাদেশটির যৌক্তিকতা তুলে ধরে আইন উপদেষ্টা আরও বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদে এ ধরনের দায়মুক্তি আইনের স্পষ্ট বৈধতা রয়েছে।
তিনি মনে করিয়ে দেন, ১৯৭৩ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধাদের সুরক্ষার জন্যও অনুরূপ দায়মুক্তি আইন করা হয়েছিল। সেই একই ধারায় এবার জুলাই অভ্যুত্থানের বীরদের সুরক্ষা দেবে রাষ্ট্র। তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রতিরোধ বলতে আমরা বুঝিয়েছি—ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে সংগঠিত সে সমস্ত কার্যাবলীর ফৌজদারি দায়–দায়িত্ব থেকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকারীদের দায়মুক্তি। এটা হচ্ছে ২০২৪ সালের জুলাই এবং আগস্টে সংগঠিত কার্যাবলী। আইন উপদেষ্টা বলেন, যদি কোনো মামলা হয়ে থাকে জুলাই গণভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা, রাজনৈতিক প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে সংগঠিত কার্যাবলীর কারণে যদি কোনো ফৌজদারি মামলা হয়ে থাকে তাহলে সেই মামলাগুলা প্রত্যাহার করার পদক্ষেপ সরকার নেবে এবং এখন থেকে নতুন কোনো মামলা করা যাবে না। আসিফ নজরুল ব্যাখ্যা করে বলেন, এখন প্রশ্ন আসবে বা আসতে পারে—কোন হত্যাকা– আপনার রাজনৈতিক প্রতিরোধের প্রক্রিয়ায় হয়েছে আর কোন হত্যাকা– ব্যক্তি এবং সংকীর্ণ স্বার্থে করা হয়েছে বা এটার সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিরোধের সম্পর্ক নেই।এটা নির্ধারণের দায়িত্ব আমরা দিয়েছি মানবাধিকার কমিশনকে। কোনো ভিকটিমের পরিবার যদি মনে করে, তার বাবা বা তার ভাই বা কোনো স্বজন হত্যাকা–ের শিকার হয়েছে অন্য কারও ব্যক্তিগত সংকীর্ণ স্বার্থ থেকে, এটার সঙ্গে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের সম্পর্ক ছিল না, তাহলে তিনি মানবাধিকার কমিশনে যাবেন। মানবাধিকার কমিশন যদি দেখে, সত্যি এটা ব্যক্তিগত সংকীর্ণ স্বার্থে করা হয়েছে তাহলে মানবাধিকার কমিশন তদন্ত করবে। তদন্ত রিপোর্ট দেবে। তিনি বলেন, আদালতে সেই তদন্ত রিপোর্টই পুলিশের তদন্ত রিপোর্টের মত করে গণ্য করা হবে। যদি দেখেন যে—না, এটা রাজনৈতিক প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে সংগঠিত কার্যাবলীর ধারাবাহিকতায় হয়েছে। তাহলে অবশ্যই এই সংগঠিত কার্যক্রমের জন্য কোনো দায়–দায়িত্ব থাকবে না। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুসারে, ওই অভ্যুত্থানকালে নিরাপত্তা বাহিনী ও আওয়ামী লীগের ক্যাডারদের গুলিসহ বিভিন্ন সংঘাতে ১৪০০ জন হত্যাকা–ের শিকার হয়েছেন। সেসময় অভ্যুত্থানকারীদের প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমেও কিছু মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। সম্প্রতি হবিগঞ্জে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা মাহদী হাসানসহ একাধিক জুলাইযোদ্ধা গ্রেপ্তার হওয়ার প্রেক্ষাপটে তাদের অভ্যুত্থানকালীন প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমের দায়মুক্তির দাবি ওঠে। তিনি জানান, গত ১৫ বছরে রাজনৈতিক হয়রানিমূলকভাবে দায়ের করা প্রায় ২০ হাজার মামলা ইতিমধ্যে প্রত্যাহার করা হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি আলাদা সেল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ সময় প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এবং উপ–প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার উপস্থিত ছিলেন।



