শীতকালটা রাঙিয়ে দিল লিলিয়াম। খুব কম ফুলেরই এমন মনমাতানো রূপ দেখা যায়। খাটো গাছ, সরু সরু গাঢ় সবুজ পাতার ঝোপে রক্তরাঙা ঢাউস আকারের ফুল। সম্প্রতি রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এক নার্সারিতে গিয়ে দেখা হলো এই রূপবতী লিলিয়ামের সঙ্গে। যে ফুল একসময় এ দেশে আসত নেদারল্যান্ডস ও থাইল্যান্ডের মতো দেশ থেকে, সেই ফুল এখন আমাদের চাষিরাই ফোটাচ্ছেন। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, ময়মনসিংহ, যশোর, বাগেরহাট, গাজীপুরে এখন লিলিয়াম ফুলের চাষ হচ্ছে। ইংরেজিতে অনেক ফুলকেই লিলি নামে ডাকা হয়। আমাদের জাতীয় ফুল শাপলাকে ইংরেজিতে বলে ওয়াটার লিলি। তাই বলে এটি লিলি ফুল নয়। আসল লিলি হলো লিলিয়াম (Lilium) গণের ফুলগুলো। এ গণে বিশ্বে ১১৯টি প্রজাতি রয়েছে। লিলিয়াম লিলিয়েসি পরিবারের কন্দজ বিরুৎজাতীয় উদ্ভিদ। গুরুত্বপূর্ণ লিলি ফুলগুলো হলো– লিলিয়াম, অ্যামারিলিস, ফুটবল লিলি, গ্লোরি লিলি, স্পাইডার লিলি, টর্চ লিলি, রেইন লিলি বা ডে লিলি, অরেঞ্জ লিলি ইত্যাদি। তবে লিলিয়াম গণের ফুলকেই প্রকৃত লিলি ফুল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সারাবিশ্বে ফুলটি লিলিয়াম নামেই বেশি পরিচিত। সাদা, হলুদ, সোনালি, কমলা, লাল, খয়েরি, গোলাপি, বেগুনি ইত্যাদি বিভিন্ন রঙের লিলিয়াম ফুল রয়েছে। বিভিন্ন রঙের লিলিয়াম বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। যেমন সাদা লিলিয়াম ফুল শুদ্ধতা ও পবিত্রতার প্রতীক। শুধু সাদা লিলিয়াম ও টাইগার লিলি ফুলের ঘ্রাণ আছে, অন্য রঙের লিলিয়াম ফুলগুলো গন্ধহীন। লিলিয়াম গাছের উচ্চতা ৬০ থেকে ১৮০ সেন্টিমিটার, কাণ্ড শাখাহীন। পাতাগুলো কাণ্ডের গিঁট থেকে সর্পিলাকারে একটির পর একটি জন্মে, স্টক থেকে আড়াআড়িভাবে বের হয়। পাতা সরু থেকে ডিম্বাকার। লিলিয়ামের কন্দ কয়েকটি শল্ক বা স্কেলের সমন্বয়ে গঠিত। ফুলের ভেতরের দিকে তিনটি ও বাইরের দিকে তিনটি করে মোট ছয়টি পাপড়ি থাকে। ফুলের পাপড়ির বিস্তার ১০ থেকে ২০ সেন্টিমিটার। মাইকের চোঙ বা ফানেল আকৃতির ফ্লোরেট বা পুষ্পিকাগুলো একটি ডাঁটি বা স্টিকের সঙ্গে লাগানো থাকে। ফল তিন প্রকোষ্ঠবিশিষ্ট ক্যাপসুল ধরনের।
পাকা ফলে অসংখ্য চ্যাপটা বীজ হয়, কোনো কোনো জাতের বীজ থেকে চারা তৈরি করা যায়। কন্দ থেকে নতুন গাছ জন্মে। অনেক ভেদের মধ্যেও প্রধানত দুই ধরনের লিলিয়াম ফুল আছে– এশিয়াটিক লিলিয়াম ও ওরিয়েন্টাল লিলিয়াম। এশিয়াটিক লিলিয়াম বাংলাদেশে চাষের উপযোগী। এশিয়াটিক লিলিয়াম ফুলে গন্ধ নেই ঠিকই; কিন্তু এর রূপ ও রঙের বৈচিত্র্য অনেক বেশি এবং চাষ পদ্ধতিও সহজ। এ ফুল চাষের সম্ভাবনা দেখে ২০১৫ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের ফুল বিভাগের বিজ্ঞানীরা এশিয়াটিক লিলিয়ামের ওপর সীমিত আকারে গবেষণা শুরু করেন। পরে ২০১৭ সালে এনএটিপি প্রকল্পের আওতায় লিলিয়াম ফুলের জাত সংগ্রহ, মূল্যায়ন, বৈশিষ্ট্যকরণ, কন্দ সংরক্ষণ ও বংশ বিস্তারের ওপর বিস্তারিতভাবে গবেষণা শুরু হয় এবং আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়। বর্তমানে বাংলাদেশে অনেক ফুল চাষি বাণিজ্যিকভাবে লিলিয়াম ফুলের চাষ করে সাফল্য পেয়েছেন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের ফুল বিভাগ বাংলাদেশে চাষ উপযোগী লিলিয়ামের ১৪টি জেনোটাইপ খুঁজে পেয়েছে। এসব মূল্যায়নের পর ‘বারি লিলিয়াম–১’ ও ‘বারি লিলিয়াম–২’ নামে দুটি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। বারি লিলিয়াম–১ জাতের ফুলের রং বাদামি সাদা, পাপড়ির ভেতরের দিকের রং হলুদাভ সবুজ এবং বিক্ষিপ্তভাবে কিছু খয়েরি ছিটা দেখা যায়। বারি লিলিয়াম–২ জাতের ফুলের রং আকর্ষণীয় হলুদ। কাটা ফুলের সজীবতা থাকে ১০ থেকে ১৪ দিন। ফুল না তুলে গাছে রেখে দিলেও বেশ কয়েক দিন পর্যন্ত তাজা থাকে।



