গতকাল বুধবার রাজধানীর রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘নিপাহ ভাইরাসের বিস্তার ও ঝুঁকি’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় তারা এসব তথ্য জানান এবং পরামর্শ দেন। সভায় খেজুরের কাঁচা রস ঘিরে আয়োজন করা ‘রস উৎসব’ বন্ধ রেখে পিঠা উৎসব করার বিষয়ে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অনলাইন থেকেও খেজুরের রস কেনা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। দেশের ৩৫ জেলায় নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এর বিস্তার ও সংক্রমণের ধরন উদ্বেগজনক হারে পরিবর্তন হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের তথ্য হলো, গত দুই বছরে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত প্রত্যেক রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এর আগে সর্বোচ্চ ৯২ শতাংশ মৃত্যু হয়েছিল ২০০৫ সালে। বর্তমানে দেশে নিপাহ ভাইরাসে গড় মৃত্যুর হার ৭২ শতাংশ। এমন পরিস্থিতিতে খেজুরের কাঁচা রস পান এবং বাদুড় বা পাখির আধখাওয়া ফল না খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বেশি আক্রান্ত যেসব জেলা
আইইডিসিআরের তথ্য অনুযায়ী, নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত জেলার মধ্যে ফরিদপুর, রাজবাড়ী, নওগাঁ ও লালমনিরহাটে রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। এতে আক্রান্ত হলে জ্বর, মাথাব্যথা, শ্বাসকষ্ট, বমি, কাশি, ঘাড় ও পেশিতে ব্যথা, অসংলগ্ন আচরণ, প্রলাপ বকা, খিঁচুনি এবং অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
মতবিনিময় সভায় আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক তাহমিনা শিরীন বলেন, সাধারণত ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত নিপাহ ভাইরাসের মৌসুম হয়। তবে গত বছর মৌসুমের বাইরেও আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া প্রথমবারের মতো দ্বীপজেলা ভোলায় এই ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এর ফলে ৩৫ জেলায় নিপাহ ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হলো।
তিনি আরও বলেন, নিপাহ ভাইরাস একটি প্রাণীবাহিত রোগ, যা মূলত বাদুড় থেকে মানুষের শরীরে সংক্রমিত হয়। ১৯৯৮–৯৯ সালে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে প্রথম এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। সে সময় ওই দুই দেশে ২৭৬ জন আক্রান্ত হলেও পরবর্তী সময়ে সেখানে আর নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত হয়নি।
একইভাবে ২০১৪ সালে ফিলিপাইনে ১৭ জন আক্রান্ত হওয়ার তথ্য মিললেও এরপর আর কোনো সংক্রমণের খবর পাওয়া যায়নি। তবে ভারত ও বাংলাদেশের পরিস্থিতি ভিন্ন। অধ্যাপক তাহমিনা জানান, বাংলাদেশে ২০০১ সাল থেকে প্রতি বছরই নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। এ পর্যন্ত দেশে মোট ৩৪৭ জনের শরীরে ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ২৪৯ জনের। সর্বশেষ ২০২৪ ও ২০২৫ সালে যথাক্রমে পাঁচ ও চারজন আক্রান্ত হন। তাদের সবাই মারা গেছেন। ভারতে ২০০১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১০৮ জন নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
ওষুধ নেই, সতর্কতাই ভরসা
আইইডিসিআরের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শারমিন সুলতানা বলেন, নিপাহ ভাইরাসের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো অনুমোদিত ওষুধ বা টিকা নেই। তাই খেজুরের কাঁচা রস পান এবং বাদুড় বা পাখির আধাখাওয়া ফল না খাওয়াই সংক্রমণ এড়ানোর একমাত্র কার্যকর উপায়।
তিনি জানান, আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে সুস্থ মানুষের শরীরেও নিপাহ ভাইরাস ছড়াতে পারে। খেজুরের রস খাওয়ার পর ভাইরাস প্রকাশের ইনকিউবেশন পিরিয়ড (জীবাণুর সংস্পর্শে আসা এবং অসুস্থতার লক্ষণ শুরুর মধ্যবর্তী সময়) দুই থেকে ২৮ দিন। আর মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের ক্ষেত্রে এই সময়কাল ৯ থেকে ১১ দিন। তাই কেউ খেজুরের কাঁচা রস পান করার পর উপসর্গ দেখা দিলে তাকে অন্তত ২৮ দিন আইসোলেশনে রাখার পরামর্শ দেন শারমিন সুলতানা।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) সহযোগী বিজ্ঞানী ডা. সৈয়দ মইনুদ্দিন সাত্তার বলেন, প্রতি বছর নিয়মিতভাবে কেবল বাংলাদেশেই নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এটি শনাক্তের জন্য ঢাকাসহ দেশের প্রায় ৭৫০টি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এসব নমুনা ঢাকার আইসিডিডিআর,বি ও আইইডিসিআরে পরীক্ষা করা হয়, যার ফল পেতে সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগে।
চলছে সচেতনতা কার্যক্রম
নিপাহ ভাইরাসের বিষয়ে ফরিদপুর জেলার প্রান্তিক পর্যায়ে সচেতনতা কার্যক্রম চালানো হয়েছে। প্রত্যেক ইউনিয়নের ওয়ার্ডে লিফলেট বিতরণ করে ও মৌখিকভাবে বলা হচ্ছে– কেউ খেজুরের কাঁচা রস খাবেন না, বাদুড়ের আংশিক খাওয়া ফল খাবেন না। খেজুরের রস বিক্রেতাদের প্রতি অনুরোধ– কেউ কাঁচা রস খেতে চাইলে বিক্রি করবেন না।
ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডাক্তার মাহমুদুল হাসান বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে জেলার ৯ উপজেলার সব হাসপাতাল, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ওয়ার্ডভিত্তিক কমিউনিটি ক্লিনিকে নিপাহ ভাইরাসের ভয়াবহতা এবং সচেতনতায় করণীয় বিষয়ে জনসাধারণকে নিয়মিত জানানো হচ্ছে।
রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. রাজীব দে সরকার জানান, রাজবাড়ীতে বাদুড়ের আনাগোনা বেশি। কারণ গ্রামাঞ্চলের বেশির ভাগ বাড়িতে একটি, দুটি বা তারও বেশি খেজুর গাছ রয়েছে। এই গাছ বেশি থাকায় নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণও বেশি। এ বিষয়ে সবাইকে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
লালমনিরহাটের সিভিল সার্জন ডা. আব্দুল হাকিম বলেন, লালমনিরহাটে এ বছর নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত কোনো রোগীর সন্ধান পাওয়া যায়নি। তাই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। স্বাস্থ্য বিভাগ নিপাহ ভাইরাস নিয়ে সচেতন রয়েছে।
চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. হাদি জিয়া উদ্দিন আহমেদ বলেন, জেলায় এখন পর্যন্ত কেউ নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়নি। এ ভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। জেলা কৃষি বিভাগের উপপরিচালক মাসুদুর রহমান সরকার জানান, গাছিদের খেজুর গাছে পাত্র বা ভাঁড় ঢেকে রেখে রস সংগ্রহের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।



