দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে বাণিজ্যের আশা আকাক্সক্ষার প্রতীক মোংলা বন্দরের গতি ক্রমেই চাঙ্গা হচ্ছে। পদ্মা সেতুর সুফলে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলা বন্দর হয়ে গার্মেন্টস শিল্প যাচ্ছে ইউরোপ ও পোল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে। এতে আমদানি–রফতানি বাণিজ্যে নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে। গেল বছর বন্দরের নীট মুনাফার লক্ষ্যমাত্রা ২০ কোটি ৪৬ লাখ ২০ হাজার টাকা টার্গেট থাকলেও ৬২ কোটি ১০ লাখ টাকা নীট মুনাফা অর্জিত হয়। ভারত, নেপাল এবং ভুটানের সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রসারে মোংলা বন্দর একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ হিসেবে কাজ করছে। দেশি–বিদেশি পণ্যবাহী জাহাজের আগমন ও আমদানি–রফতানিতে প্রাণ চাঞ্চল্য ফিরেছে অবহেলিত মোংলায়। একই সঙ্গে বেড়েছে কার্গো হ্যান্ডলিং, রাজস্ব আয় ও নীট মুনাফা। এ ছাড়া বন্দরের আধুনিকায়নে প্রতিবেশী দেশসমূহে ট্রানজিট পণ্য মোংলা বন্দরের মাধ্যমে আমদানি–রফতানির সুদূরপ্রসারী সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সূত্রমতে, পদ্মা সেতু চালুর পর থেকে নতুন করে মোংলা বন্দরসহ আশপাশ এলাকাজুড়ে শুরু হয়েছে উন্নয়নের মহাযজ্ঞ। বন্দরের আশপাশে এরই মধ্যে গড়ে উঠেছে নতুন নতুন শিল্প–কলকারখানা। এতে সেতুর ওপর যেমন বেড়েছে যান চলাচল, তেমনি বেড়েছে এ বন্দরের কর্মব্যস্ততাও। মোংলা বন্দরে কন্টেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিং এর জন্য অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি, যেমন– স্ট্রাডেল ক্যারিয়ার, ফর্কলিফট, রিচ স্ট্র্যাকার, মোবাইল ক্রেন এবং টার্মিনাল ট্রাক্টর সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে পণ্য খালাস ও পরিবহনের গতি বহুগুণে বেড়েছে। কার ইয়ার্ড, ওয়্যার হাউজ, কন্টেইনার ইয়ার্ড এবং বিশেষায়িত জেটি নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে, যা বন্দরের ধারণক্ষমতা আরো বাড়িয়ে তুলবে।
আইএসপিএস কোড বাস্তবায়নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে, যা বিদেশি জাহাজ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াচ্ছে। মোংলা সমুদ্র বন্দর শুধু দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের আমদানি রফতানির প্রবেশদ্বার নয়, এটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এক সময় নিভু নিভু প্রদীপের মতো জ্বলে থাকা মোংলা বন্দর এখন উন্নয়নের রোডম্যাপে বিকশিত হচ্ছে। পশুর নদীর তীরে অবস্থিত এই বন্দরটি গত কয়েক বছরে যুগান্তকারী উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতা ও গুরুত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। মোংলা সমুদ্র বন্দরের সূত্রমতে, বিগত অর্থবছরে (২০২৪–২৫) এ বন্দরে কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৮৮ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন থাকলেও অর্থবছর শেষে বন্দরে এক কোটি চার লাখ ১২ হাজার মেট্রিক টন কার্গো হ্যান্ডলিং হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হওয়ার পাশাপাশি ১৫ লাখ ৩২ হাজার মেট্রিক টন বেশি কার্গো হ্যান্ডলিং করা হয়েছে। এ ছাড়া কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা ২০ হাজার টিইইউজ থাকলেও এক হাজার ৪৫৬ টিইইউজ বেশি কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়। অপর দিকে বছর শেষে বন্দরে ৩৪৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা রাজস্ব হয়েছে। বন্দরের নীট মুনাফার লক্ষ্যমাত্রা ২০ কোটি ৪৬ লাখ ২০ হাজার টাকা টার্গেট থাকলেও ৬২ কোটি ১০ লাখ টাকা নীট মুনাফা অর্জিত হয়। এছাড়া চলতি অর্থ বছরের প্রথম পাঁচ মাসে জাহাজ এসেছে ৩৫৬টি, কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে ১৩ হাজার ৮৫৪ টিইইউজ, রিকন্ডিশন গাড়ি আমদানি হয়েছে চার হাজার ১৩৯টি, পণ্য আমদানি–রফতানি ৪৪ লাখ টন। এছাড়া আধুনিক যন্ত্রপাতি সংগ্রহের ফলে প্রথমবারের মতো প্রতি ঘণ্টায় ২৪টিরও বেশি কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হচ্ছে। বন্দর জেটির সম্মুখে নিয়মিত ড্রেজিং নাব্যতা ঠিক থাকায় পাঁচটি জেটিতে একই জাহাজে পণ্য হ্যান্ডলিং করা যাচ্ছে।
এতে প্রতিবেশী দেশসমূহে ট্রানজিট পণ্য মোংলা বন্দরের মাধ্যমে আমদানি–রফতানির সুদূরপ্রসারী সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বন্দরকে কেন্দ্র করে আশেপাশের এলাকায় শিল্পকারখানা, ইপিজেড এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) গড়ে উঠেছে, যা হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। ভারত, নেপাল এবং ভুটানের সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রসারে মোংলা বন্দর একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ হিসেবে কাজ করছে। বর্তমানে চলমান এবং ভবিষ্যতের জন্য গৃহীত উন্নয়ন পরিকল্পনা মোংলা বন্দরের জন্য এক অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। অপরদিকে, দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের প্রাণপ্রবাহ এ বন্দরটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি বর্তমানে খাদ্যশস্য, সিমেন্ট ক্লিংকার, সার, মোটর গাড়ী, মেশিনারিজ, চাল, গম, কয়লা, তেল, পাথর, ভুট্টা, তেলবীজ, এলপিজি গ্যাস আমদানি এবং সাদামাছ, চিংড়ি, পাট ও পাটজাত দ্রব্য, হিমায়িত খাদ্য, কাকড়া, ক্লে, টাইলস, রেশমী কাপড় ও জেনারেল কার্গো রফতানির মাধ্যমে দেশের চলমান অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা রেখে আসছে। মোংলা বন্দর ব্যবহার করে স্থল, নৌ এবং রেলপথের মাধ্যমে রাজশাহী, রংপুর ও বরিশাল বিভাগের পণ্য পরিবহন আরো সহজ এবং দ্রুত হচ্ছে। মোংলা বন্দরকে আরো আধুনিক ও বিশ্বমানের করে গড়ে তোলার জন্য বেশ কিছু প্রকল্প চলামান রয়েছে ও কিছু প্রকল্প ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য হাতে নেয়া হয়েছে বলেও জানান চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল শাহীন রহমান।



