খালেদা জিয়ার কবরে ফাতেহা পাঠ ও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন নাতনি জাইমা রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা। গতকাল শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টায় কবর প্রাঙ্গণে আসেন জাইমা ও প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শর্মিলা রহমান। তাদের সঙ্গে ছিলেন প্রয়াত সাঈদ এস্কান্দারের স্ত্রী নাসরিন এস্কান্দারসহ পরিবারের ২০ সদস্য। শুরুতে নাতনি জাইমা রহমান দাদির কবরে ফুলের তোড়া দেন। নীরবে দাঁড়িয়ে ফাতেহা পাঠ করেন। পরিবারের সদস্যরা মোনাজাতে অংশ নেন। জিয়ারত শেষে সকাল ১০টা ৪০ মিনিটের দিকে তারা সেখান থেকে ফিরে যান। পরিবারের সদস্যরা যখন কবরের পাশে ছিলেন, তখন ওলামা দলের সদস্যরা কোরআন তেলাওয়াত করছিলেন। খালেদা জিয়া গত মঙ্গলবার রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে মারা যান। গত বুধবার জানাজা শেষে জিয়া উদ্যানে স্বামী সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়। নেত্রীর মৃত্যুতে বিএনপি সাত দিনের শোক পালন করছে। গতকাল ছিল তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোকের শেষ দিন। এ উপলক্ষে দেশের সব মসজিদ ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ দোয়া ও প্রার্থনার আয়োজন করা হয়। পরিবারের সদস্যরা জিয়ারতে আসায় ওই এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছিল। তারা ফিরে যাওয়ার পর সাধারণ মানুষের জন্য কবর প্রাঙ্গণ খুলে দেওয়া হয়।
এরপর সেখানে নেতাকর্মীর ঢল নামে। অনেকের বুকে ছিল কালো ব্যাজ। জাইমা রহমানের সঙ্গে আরও এসেছিলেন খালেদা জিয়ার মেজো বোন সেলিনা ইসলাম ও তাঁর স্বামী অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম। ছোট ভাই শামীম এস্কান্দারের ছেলে অভিক এস্কান্দার ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা শ্রদ্ধা জানাতে আসেন। এ ছাড়া দীর্ঘদিনের গৃহকর্মী ফাতেমা বেগমকেও শোকগ্রস্ত মনে কবরের পাশে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানাতে দেখা যায়।
শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় নেত্রীকে সম্মান
নেত্রীর চলে যাওয়ার শোক এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেননি বিএনপির নেতাকর্মীরা। তৃতীয় দিনেও গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজের আগে ও পরে শেরেবাংলা নগরে তাঁর কবরে হাজারো নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ হাজির হন। অশ্রুসিক্ত নয়নে তারা নেত্রীর কবর জিয়ারত করেন এবং মোনাজাত করেন।
শুক্রবার সকাল থেকে দেখা যায়, নেতাকর্মীরা কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ফাতেহা পাঠ করছেন ও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। পাশাপাশি সাধারণ মানুষও সেখানে দোয়া করতে আসেন।
উল্লেখ্য, খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বিএনপি সাত দিনের শোক পালন করছে। এ উপলক্ষে কার্যালয়গুলোতে দলীয় পতাকা অবনমিত রাখা হয়েছে। কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
সকালে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সহস্রাধিক নেতাকর্মী কবরস্থানে আসেন। সেখানে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস মোনাজাত করেন। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার ত্যাগ ও আন্দোলনের জন্যই আজ দেশে গণতন্ত্রের পথ সুগম হয়েছে।
দুপুর ১২টায় নব্বইয়ের ডাকসু ও সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের নেতারা আমান উল্লাহ আমানের নেতৃত্বে খালেদা জিয়ার কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
উপস্থিত নেতাদের মধ্যে ছিলেন হাবিবুর রহমান হাবিব, জহির উদ্দিন স্বপন, খায়রুল কবীর খোকন, নাজিম উদ্দিন আলম প্রমুখ। আমান উল্লাহ আমান বলেন, খালেদা জিয়ার জানাজায় কোটি মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে, তিনি ছিলেন গণতন্ত্র ও ঐক্যের প্রতীক। বেলা ১১টার পর শ্রদ্ধা জানান ঢাকা–১৪ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী সানজিদা ইসলাম তুলি। এ ছাড়া জাতীয়তাবাদী টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (জেটেব), অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (অ্যাব) ও ভাসানী জনশক্তি পার্টির নেতাকর্মীরাও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ থেকে আসা শাফিউর রহমান বলেন, ‘অফিস থাকায় দাফনের দিন আসতে পারিনি। শুক্রবার বন্ধ থাকায় ভোরে পৌঁছে নেত্রীর কবর জিয়ারত করলাম।’ সাভার থেকে আসা মাঈনুল আসলাম জানান, জানাজায় থাকলেও ভিড়ে কবর জিয়ারত করতে পারেননি। তাই আবার এসেছেন।
মিলাদ ও দোয়া মাহফিল
খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফেরাত কামনায় বিকেলে গুলশানের আজাদ মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান (অনলাইনে) এবং খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম এস্কান্দারসহ পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন। মাহফিলে উপস্থিত ছিলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ কেন্দ্রীয় ও অঙ্গসংগঠনের কয়েক হাজার নেতাকর্মী। এ ছাড়া বায়তুল মোকাররম মসজিদে জুমার নামাজ শেষেও তাঁর জন্য বিশেষ দোয়া করা হয়।
ঢাকেশ্বরী মন্দিরে বিশেষ প্রার্থনা
খালেদা জিয়ার আত্মার শান্তি কামনায় বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ও মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির যৌথ উদ্যোগে বিশেষ প্রার্থনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সকালে শ্রীশ্রী ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির প্রাঙ্গণে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়।
মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সহসভাপতি তাপস কুমার পালের সভাপতিত্বে এবং মন্দিরের পুরোহিত তপন ভট্টাচার্য্যের পরিচালনায় সভায় বক্তব্য দেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর, গণফোরামের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী ও বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ। আরও বক্তব্য দেন বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক জয়ন্ত কুণ্ডু, মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ড. তাপস চন্দ্র পাল, শুভাশীষ বিশ্বাস সাধন এবং বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক সমীর কুমার বসু।
কানাডায় দোয়া মাহফিল
কানাডার ক্যালগেরির বায়তুল মুকাররম মসজিদে (বিএমআইসিসি) খালেদা জিয়ার জন্য দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। কানাডার স্থানীয় সময় গত বৃহস্পতিবার বাদ মাগরিব এই মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে দলমত নির্বিশেষে মুসল্লিরা অংশ নেন।
খালেদা জিয়া ছিলেন আপসহীন: হাসনাত আবদুল্লাহ
এনসিপির কেন্দ্রীয় মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ছিলেন একজন আপসহীন নেত্রী। তিনি কখনও স্বৈরাচারের কাছে আপস করেননি। অত্যাচার ও নির্যাতনের মধ্যেও তিনি নেতাকর্মীদের পাশে ছিলেন। দীর্ঘ কারাবরণ করেছেন। তাঁর জন্য পুরো বাংলাদেশের মানুষ কেঁদেছে। আমাদেরও এমন আদর্শ জীবন গঠন করতে হবে।
শুক্রবার সকালে দেবিদ্বার পৌর মিলনায়তনে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফেরাত কামনায় আয়োজিত দোয়া অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।



