ইতোমধ্যে আমরা হারিয়েছি অগণিত মহতিপ্রাণ। যদিও জন্ম–মৃত্যুর বন্ধনীতে সীএিতো থাকে মানুষের জীবনকর্ম, আশাআলো; তবুও প্রিয়জনের বিয়োগ–ব্যাথা আপনজনকে কাঁদায়। দেশপ্রেমিক, জনদরদি মাদার তেরেসা আর্ত–পিড়ীত–দুস্থ জনতার পাশে দুহাত বাড়িয়ে আর দাঁড়াবেন না; কিন্তু তাঁর আদর্শে উদ্বুদ্ধ বহু মহৎ প্রাণ সমাজে বিরাজ করছেন জেনে আমরা আশান্বিত। আমাদের প্রিয় সহকর্মী মি. মকবুল হোসেন আমাদের ছেড়ে গেছে। সেই সদালাপী, মিষ্টভাষী, বিচিত্র প্রতিভার মানুষটির অকাল বিয়োগে সৃষ্ট শোক আমরা শক্তিতে পরিণত করতে চাই; আর তখনই মকবুলের বিদেহী আত্মা লাভ করবে অনাবিল তৃপ্তি।
দেশকে মায়ের সাথে তুলনা করা হলে দেশের মাটি হবে মায়ের বক্ষস্থল, আর তার পরেই আমরা ঠেকাই মাথা।
এমন কেউ আছে কী যে, মায়ের বক্ষস্থল অর্থাৎ সনআতনের জন্য পরম শান্তিস্থল চৌচিড় করা হীনমানসে জঘন্য আত্মঘাতী ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে? ইতিহাসে এমন খলনায়কের আবির্ভাব যুগে যুগে বহুবার ঘটেছে।
ভারতবর্ষের দিকে তাকালে মনে জাগে, মহীয়সী এক মা আপন সন্তানদের বুকে জুড়িয়ে শুয়ে আছেন। শিয়রে হিমালয় আর পাদমূলে মহাসমুদ্র; ঐতিহ্যবাহী আতিথেয়তা, সংশ্লেষ ও প্রেম বিস্তারকল্পে পূর্ব–পশ্চিমে বাড়িয়ে রেখেছেন তাঁর দুটি কোমল বাহু। তবুও যুগ যুগ ধরে ভারতবর্ষ শোষিত হয়েছে, লুণ্ঠিত হয়েছে, ধর্ষিত হয়েছে মানবরূপী অমানুষদের হাতে, যা স্মরণীয় হয়ে থাকবে ইতিহাসের এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে।
ভারতবাসী মুক্তির আন্দোলন করে আসছে সারাজীবন ধরে; জীবন দিয়েছে, সম্ভ্রম দিয়েছে, ধনরত্ন দিয়েছে দেশমাতৃকাকে যশস্বী হিসেবে বাঁচিয়ে রাখার জন্যÑ এর বিনিময়ে আজ আমরা কী পেলাম।
একটি চলমান সমুদ্রগামী জাহাজের মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন বা বিতর্ক থাকা স্বাভাবিক, আর তেমনক্ষেত্রে জাহাজের দ্বারা যে আয়–উপার্জন হবে তা যথাযথ ভাগ করে বিতর্কের সমাধান পেতে হবে। কিন্তু সমাধানকল্পে যদি জাহাজটিকে টুকরা টুকরা করে খণ্ডিতাংশ শরিকদের মধ্যে ভাগ–বিতরণ করে দেয়া হয়, তবে তেমন বিচার কি বিজ্ঞজনোচিত বিচার বলে মেনে নেয়া চলে? বৃটিশ বেনিয়াদল দু’শো বছর ধরে দেশকে বিভাজন ও দমননীতির মাধ্যমে শোষণ করেছে। বিদায়বেলা উপমহাদেশটিকে সুকৌশলে খণ্ডবিখণ্ড করে পরস্পরকে দুর্বল ও বৈরিভাবাপন্ন করে গেল। ফলে দেশবাসী পরস্পর ভ্রাতৃঘাতি যুদ্ধে লিপ্ত এবং বিনাশের শৃঙ্খলে বন্দি হয়ে রইল। দীর্ঘকালধরে পারস্পরিক যুদ্ধ–বিগ্রহে যে বিপুল পরিমাণ সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে তা যদি দেশকে গড়ে তোলার কাজে ব্যয় করা হতো তবে এতেঠদিনে গোটা উপমহাদেশটি নিঃসন্দেহে ইউরোপ–আমেরিকার মতো প্রথম বিশ্বের কাতারে দাঁড়াতে পারত।
অভিশপ্ত শয়তানকে যখন আমরা চরমভাবে ঘৃণা করি তখন তার সৃষ্ট ষড়যন্ত্রমূলক কুফলসমূহকে পরম পাওয়া ভেবে মহানন্দে কেন লুফে নেব; কেন মেতে থাকব অশুভ সৃষ্টির পোষকতা ও শ্রীবৃদ্ধি কল্পে?
আসুন, পারস্পরিক বিভেদ ভুলে গিয়ে প্রকৃত সুসভ্য শান্তিকামী মানুষ হিসেবে পরস্পরকে গড়ে তুলি; বয়ে আনি দেশ ও দশের জীবনে অনাবিল শান্তি, প্রেম ও ভ্রাতৃত্ববোধ।



