শহরের তুলনায় তামাক বা তামাকজাত দ্রব্য সেবনে আসক্তি বাড়ছে মফস্সলে। শহরাঞ্চলে তামাক সেবনের হার ২৪ দশমিক ১ শতাংশ। মফস্সলের এটি প্রায় ২৭ দশমিক ৭ শতাংশ। আর আট বিভাগে সবচেয়ে বেশি তামাক সেবন হচ্ছে সিলেট ও ময়মনসিংহে। দেশে তামাক ব্যবহারে পুরুষের সংখ্যা ৩৭ দশমিক ৯ শতাংশ এবং নারীদের এই হার ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ। সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান উন্নয়ন ব্যুরোর হেলথ অ্যান্ড মরবিডিটি স্ট্যাটাস সার্ভে–২০২৫–এর এসব তথ্য উঠে এসেছে। তথ্যমতে, দেশে তামাক ব্যবহারে স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও উত্পাদনশীলতার যে আর্থিক ক্ষতি হয়, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ৮৭ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা। জরিপে দেখা যায়, ১৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সিদের মধ্যে তামাক বা তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের হার ছিল ২৬ দশমিক ৭ শতাংশ। লিঙ্গভেদে প্রতিটি অঞ্চলে পুরুষদের মধ্যে তামাক ব্যবহারের হার নারীদের তুলনায় দ্বিগুণ বা তারও বেশি। বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, ময়মনসিংহ তামাক ব্যবহার হচ্ছে ৩৮ দশমিক ৭ শতাংশ; সিলেটে ৩৮ দশমিক ৭ শতাংশ; বরিশালে ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ; রংপুরে ২৮ দশমিক ৮ শতাংশ; চট্টগ্রামে ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ; রাজশাহীতে ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ; খুলনায় ২৩ দশমিক ৮ শতাংশ আর ঢাকায় ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ। জরিপে আরো দেখা যায়, বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তামাক ব্যবহারের প্রবণতাও বৃদ্ধি পায়। ১৫–১৯ বছর বয়সিদের মধ্যে তামাক ব্যবহারের হার ৪ শতাংশ।
৫০–৫৪ বছর বয়সিদের এই হার ৪২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ৬০ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সে সর্বোচ্চ হার ৪৮ দশমিক ৪ শতাংশ। এছাড়া ৩০–৩৪ বছর বয়সি পুরুষদের হার ৩৯ দশমিক ২ শতাংশ, যেখানে নারীদের হার ১০ দশমিক ৯ শতাংশ। ৪৫–৪৯ বছর বয়সিদের মধ্যে পুরুষদের হার ৪১ দশমিক ৩ শতাংশ। জরিপের তথ্যমতে, জর্দা ও গুলে তামাক ব্যবহার হচ্ছে ৪১ দশমিক ৬ শতাংশ, ধূমপানে ব্যবহূত তামাক ৪০ দশমিক ৭ শতাংশ। সরাসরি তামাক পাতা সেবনের হার ১৪ দশমিক ২ শতাংশ এবং হুক্কা ব্যবহারের হার ১ শতাংশ। ধূমপানের সূচনা সবচেয়ে বেশি ঘটে ২০–২৪ বছর বয়সে। এরপরে রয়েছে ১৫–১৯ বছর বয়সিরা। নারীরা তুলনামূলকভাবে পরে ধূমপান শুরু করে ২৫–২৯ বছর বয়সে। আবার ৩০ বছরের পর নতুনভাবে ধূমপান শুরু করার নিম্নমুখী প্রবণতাও দেখা গেছে। এদিকে, তামাক ব্যবহারের কারণে দেশে স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও উত্পাদনশীলতার যে অর্থনৈতিক ক্ষতি ঘটে, তার পরিমাণের ওপর গবেষণা চালায় ইকোনমিকস ফর হেলথ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিকস। তাদের গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারের কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতি প্রায় ৮৭ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা। আর সরকার তামাকজাত পণ্য থেকে রাজস্ব পেয়েছে ৪১ হাজার কোটি টাকা। গবেষণায় তথ্যমতে, স্বাস্থ্যক্ষেত্রে তামাকের কারণে হওয়া ক্ষতি সবচেয়ে বেশি। এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকা।
তামাকের কারণে পরিবেশ সম্পর্কিত ক্ষতিও কম নয়। বন উজাড়, ভূমিক্ষয়, অগ্নিকা্ল, সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতিসহ বিভিন্ন পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে আর্থিক ক্ষতি মোট ক্ষতির প্রায় ১৬ শতাংশ। জানা যায়, দেশে এক–তৃতীয়াংশের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি তামাক ব্যবহার করেন। তামাকের প্রভাব শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে না, বরং সামগ্রিক অর্থনীতি ও সমাজের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, ‘সম্প্রতি আমরা একটি গবেষণা পরিচালনা করেছি যেখানে দেখা যায়, বেশির ভাগ বিদ্যালয়ের আশপাশের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাকজাত পণ্যের বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে। চায়ের দোকান, মুদি দোকান, ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা। দোকানগুলোতে তামাক বিক্রেতারা শিশুদের মনোযোগ আকর্ষণে বিক্রয়কেন্দ্রে তামাকজাত পণ্য এমনভাবে রাখা হয়, যেন তা শিশুদের চোখের উচ্চতা বা সীমার মধ্যে থাকে। যেগুলো নিয়ে কাজ করা জরুরি।’ তিনি আরো বলেন, ‘তামাক সমস্যা দীর্ঘমেয়াদি। এটি মোকাবিলায় ধারাবাহিক, প্রমাণভিত্তিক ও কৌশলগত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। যুব প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখা একটি জাতীয় দায়িত্ব। এ জন্য আইন সংস্কার এবং কার্যকর তামাক কর কাঠামো অপরিহার্য।’



