রোদের ওমটা বেশ লাগছে। তার ওপর ঝিলের জলে তিরতির করে কাঁপা ঢেউ, একপাল সাদা রাজহাঁসের সাঁতার, স্বচ্ছ নীল আকাশ, ঝিলের কোলে বেড়ে ওঠা জলপাই বন ও কেয়াগাছের ঝোপ– গাজীপুরের শ্রীপুরের সিসিডিবিতে সব মিলিয়ে এক অপূর্ব সকাল উপভোগ করছি তরুপল্লবের এক দল প্রকৃতি বন্ধু। মোকারম হোসেন বললেন, ‘জানেন, সব কেয়াগাছে ফুল ফোটে না। এক রকমের কেয়াগাছ আছে, যেটি শুধুই আলংকারিক।’ তাই নাকি? কোন কেয়াগাছে ফুল ফোটে আর কোনটায় ফোটে না, দুটি গাছের তফাৎ কী, তা খুঁজেতে শুরু করলাম। দেখলাম, সেখানে দুই রকমেরই কেয়াঝোপ আছে। একটির পাতা সরু ও দুই কিনারায় করাতের মতো তীক্ষ্ণ কাঁটা, অন্যটির পাতা কিছুটা চওড়া ও বড়, কিনারা প্রায় কাঁটাহীন। এসব পর্যবেক্ষণ করতে করতেই কেয়াঝোপের মধ্যে একটা তক্ষকের দেখা পেলাম, কেয়াগাছগুলোর ওপর লতিয়ে চলা একটা গাছও চোখে পড়ল। পাতাগুলো অনেকটা তেলাকুচা পাতার মতো, ওপরের পিঠ সবুজ, নীচের পিঠ রোমশ ও হালকা সবুজ। পাতার কোলে দুই থেকে তিনটি মটরবুটের মতো সুগোল ফল ধরেছে। কাঁচা ফলের রং সবুজ, লম্বালম্বি ডোরা দাগগুলো গাঢ় সবুজ। তবে পাকা ফলগুলো দেখতে খুবই সুন্দর, লাল টুকটুকে। কিউকারবিটেসি অর্থাৎ কুমড়াগোত্রীয় গাছ, ফল দেখতে মটরশুঁটির গোটার মতো, এ জন্যই বোধহয় এ গাছের ইংরেজি নাম রাখা হয়েছে Madras Pea Pumpkin, বাংলা নাম আগমুখী, আগামুখী বা বিলারি।
সঙ্গে ছিলেন প্রখ্যাত উদ্ভিদ ট্যাক্সোনমিস্ট চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক মোস্তফা কামাল পাশা। বললেন, এ লতার উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Madras Pea Pumpkin, এটি ছিল এর আগের নাম। বর্তমান নাম Madras Pea Pumpkin. আগমুখী বহুবর্ষজীবী আরোহী লতানো বীরুৎ প্রকৃতির উদ্ভিদ। কাণ্ড বা লতা বহু শাখায়িত, আকর্ষী সরু ও প্রসারিত। পাতা ডিম্বাকার, পানের পাতার মতো দেখতে, কিনারা কৌণিক আগা সরু ও সুচালো। একই গাছে গুচ্ছাকারে ছোট ছোট হলুদ রঙের পুরুষ ও স্ত্রী ফুল ফোটে, পাপড়ি পাঁচটি। ফল গোলাকার, মসৃণ, রসালো ও সাদা রোমযুক্ত। বীজ দ্বারা বংশবিস্তার ঘটে। ফুল ফোটা ও ফল ধারণের সময় জুন থেকে ডিসেম্বর। সাধারণত নদী বা জলাশয়ের তীরে ও তৃণভূমিতে এ গাছ জন্মে। অরণ্যেও দেখা যায়। আগমুখী বাংলাদেশের একটি ঔষধি গাছ যা হাঁপানি, কাশি, হজমের সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ, শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যাসহ বিভিন্ন রোগের লোকচিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। অর্শ রোগের চিকিৎসায় এর ফল, হাঁপানি, কাশি ও ব্রঙ্কাইটিস, বুক জ্বালাপোড়া করা ইত্যাদি রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয় এর পাতা। শ্বাসজনিত সমস্যায় এর শিকড়ও কাজে লাগে। উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসায় আগমুখী পাতার ক্বাথ ব্যবহার করা হয়। ভারতের ছোট নাগপুরের মুন্ডা আদিবাসীরা এর বিচূর্ণ বীজ দেহের দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা সারাতে ব্যবহার করে। এ গাছ ডায়াবেটিস, বাতজনিত গিঁটব্যথা এমনকি নির্দিষ্ট ধরনের ক্যান্সার চিকিৎসায়ও ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে।
এ উদ্ভিদে রয়েছে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এ কারণে এ গাছ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, রক্তনালি প্রশস্তকরণ, রক্তে শর্করা ও চর্বি কমানো, যকৃৎ সুরক্ষা, দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ, আলসার প্রতিরেধী, উদ্বেগ হ্রাসকারী, অণুজীববিনাশী ও অ্যান্টিপ্লেটলেট সংযোজন করার মতো বৈশিষ্ট্য রয়েছে বলে গবেষকদের গবেষণা থেকে জানা গেছে। দক্ষিণ ভারতে আয়ুর্বেদ চিকিৎসায় এ গাছ বেশ ব্যবহৃত হয়, সেখানে এ গাছ থেকে প্রস্তুতকৃত ঔষধ ‘মুসুমুসুক্কি’ নামে পরিচিত। এ দেশে আগমুখীর ঔষধি গুণ ও ব্যবহার নিয়ে আরও গভীরভাবে গবেষণা হতে পারে। বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা, ভারত, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, নিউজিল্যান্ড, ফিলিপাইন প্রভৃতি দেশে এ গাছ আছে। বাংলাদেশে এ গাছের কোনো অভাব নেই। তাই বিপন্নতা মূল্যায়নের প্রয়োজন পড়েনি।



