সরেজমিনে পরিদর্শনে গেলে স্থানীয়রা এবং দর্শনার্থীরা জানান, উদ্বোধনের পর সারা দেশে স্কুল–কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং প্রাণিপ্রেমীরা আসতেন সাফারি পার্কে। হতো ব্যাপক সমাগম। প্রাণীর মৃত্যু, প্রাণী পাচার এবং ভগ্নদশার কারণে ক্রমেই দর্শনার্থীর সংখ্যা কমেছে। এ জন্য অব্যবস্থাপনা, প্রাণীদের প্রতি অবহেলা আর সঠিক তদারকির অভাবকে দায়ী করেছেন দর্শনার্থীরা। এছাড়া বর্তমানে দালালদের দৌরাত্ম্যে পার্কে আসা দর্শনার্থীরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। জানা গেছে, গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার মাওনা ইউনিয়নে ইন্দ্রপুর অবস্থিত ৪ হাজার ৯০৯ একর জমির মধ্যে ৩ হাজার ৮১৯ একর জায়গা জুড়ে গড়ে ওঠে গাজীপুর সাফারি পার্ক। থাইল্যান্ডের সাফারি ওয়ার্ল্ডের অনুকরণে তৈরি সাফারি পার্কটি ২০১৩ সালে চালু হয়। পার্কটি কোর সাফারি, বায়োডাইভার্সিটি সাফারি, সাফারি কিংডম, এক্সটেনসিভ এশিয়ান সাফারি ও স্কায়ার সাফারি এই পাঁচটি অংশে বিভক্ত। এর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ কোর সাফারি। রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকা থেকে পরিবার–পরিজন নিয়ে ঘুরে বেড়াবার জন্য সাফারি পার্ক একটি আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ ও অব্যবস্থাপনার অভাবে বহু স্থাপনা নষ্ট ও বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর মৃত্যু হচ্ছে।
মানহীন খাবার খেয়ে রুগ্ণ হয়ে পড়ছে অনেক প্রাণী। ঘটছে রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা। একের পর এক প্রাণির মৃত্যু, ভেতরে নোংরা, ঘাস বড়সহ গজারি গাছে লতা পেঁচিয়ে রাস্তা এবং বিভিন্ন স্থাপনা অন্ধকারে ঢেকে গেছে। চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি পার্কের দেওয়াল টপকে পালিয়ে যায় একটি নীলগাই। এর আগে ২০২১ সালেও একটি নীলগাই পালিয়ে গিয়েছিল। ২০২১ সালের ২৭ ডিসেম্বর পার্কে একটি সিংহ ও একটি ওয়াইল্ডবিস্ট মারা যায়। ২০২২ সালের জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারিতে ১১টি জেব্রা, একটি বাঘ ও একটি সিংহের মৃত্যু হয়। ২০২৩ সালের ২০ অক্টোবর মারা যায় একটি জিরাফ। ২০২১ সালে পার্কে তিনটি ক্যাঙারু মারা যাওয়ার পর থেকে খালি পড়ে আছে ক্যাঙারুর বেষ্টনী। এছাড়া লেকগুলো একসময় ব্ল্যাক ও হোয়াইট সোয়ানে পরিপূর্ণ থাকলেও বর্তমানে একটিও নেই। এতে দিনদিন কমছে দর্শনার্থী। বর্তমানে পার্কে বেহাল অবস্থা দেখা দিয়েছে। এসব বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন দর্শনার্থী ও স্থানীয়রা। পার্ক সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের সময় পার্কটিতে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। মূল ফটক, মুর্যাল, প্রাণী জাদুঘর, পাখিশালাসহ, পার্ক অফিস ভাঙচুর করা হয়। লুটপাট করা হয় খাদ্য বিক্রির দোকানের মালামাল, বৈদ্যুতিক মোটর, ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা, চেয়ার, টেবিল, রেস্ট হাউজের জানালার কাঁচ ও পর্যবেক্ষণে ব্যবহৃত দুটি জিপ গাড়িসহ নানা সরঞ্জাম। ভাঙচুরের কারণে সাময়িক বন্ধ রাখা হয় পার্ক।
তিন মাস ৯ দিন পর দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয় সাফারি পার্ক। পার্ক ঘুরে দেখা গেছে, পার্কে বর্তমানে সাতটি বাঘ, দুইটি সিংহ, ২১টি ভালুক, ২ শতাধিক হরিণ, গয়াল, নীলগাই, সাম্বার হরিণ, মায়া হরিণসহ ১০টি হাতি, চারটি জলহস্তি, ঘোড়া, মেকাউ, ময়ূর, ময়না, শকুন, ধনেশ, মদনটাক, প্যালিকেনসহ কয়েক প্রজাতির প্রাণি, পাখি, সরীশূপ রয়েছে। এছাড়া দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে শিশুপার্কসহ অনেকগুলো স্থান একেবারেই বন্ধ রাখা হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুরতে আসা গাজীপুর মহানগরীর ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইসলামপুরের বাসিন্দা আব্দুল মালেক মিয়া বলেন, পার্কের অনেক প্রাণীর বেষ্টনীতে প্রাণী নেই। বেষ্টনীগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। হরিণে বেষ্টনীতে খাবার নেই, ঘোড়াটা শুকিয়ে গেছে। বোঝাই যাচ্ছে দায়িত্বে থাকারা পশু প্রাণীগুলোর স্বাস্থ্যে বিষয়ে অবহেলা করছেন। এছাড়া দর্শনীর্থীদের বসার কোনো যায়গা নেই বা ওয়াক ওয়েগুলো ভালো না। এটাকে পরিচর্যা ও প্লানিং করা যায়, আরো সুন্দর করে বনায়ন করা যায় তাহলে হয়তো দর্শনার্থী বাড়বে। সন্তানদের নিয়ে ঘুরতে এসে হতাশ হয়েছেন তিনি। টঙ্গী পূর্ব থানা এলাকা থেকে আসা দর্শনার্থী ছামাদ মোল্লা বলেন, সুন্দর একটা পরিবেশ উপভোগ করার জন্য দর্শনার্থীরা সাফারি পার্কে বেড়াতে আসে। প্রাণীদের দেখে মুগ্ধ হয়। কিন্তু এখানে পরিবার নিয়ে বেড়াতে এসে অগোছালো অবস্থা দেখে চরম বিরক্ত।
বেষ্টনীতে একটি মাত্র বাঘ দেখা গেছে, তাও রোগাক্রান্ত। আগে পাখির বেষ্টনীতে প্রচুর পাখি ছিল, এখন এসে দেখি অল্প কিছু। সাফারি পার্কের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) তারেক রহমান বলেন, প্রতিনিয়ত পার্কের সংস্কারকাজ চলমান রয়েছে। কিছু প্রাণীর মৃত্যু হলেও অনুকূল পরিবেশের কারণে বিভিন্ন পশুপাখি প্রজনন ঘটিয়েছে। পার্কের স্বকীয়তা ধরে রাখতে বনবিভাগ প্রাণান্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পার্কের সমস্যাগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অবগত রয়েছেন।



