ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিন রাজধানীতে প্রকাশ্য দিবালোকে একজন সম্ভাব্য প্রার্থীকে গুলির ঘটনায় এবং একই দিন লক্ষ্মীপুর ও পিরোজপুরে নির্বাচন অফিসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। এ নিয়ে যথারীতি উদ্বিগ্ন রাজনৈতিক দলগুলো। সংশ্লিষ্টরাও বলছেন, বাংলাদেশে নির্বাচনের আগে কিছু বিশৃঙ্খলা হয়। তবে এবারের পরিস্থিতি অনেক বেশি নাজুক। জুলাই অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে অবনতি ঘটেছিল, প্রায় দেড় বছরেও সেই অবস্থান থেকে দৃশ্যমান কোনো উন্নতি ঘটাতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। কাজেই আসন্ন জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক দশা। এ ছাড়া যথাসময়ে ভোটগ্রহণ, ভোট গণনা, ফল প্রকাশ; প্রত্যাশিত সংখ্যক ভোটার উপস্থিতি, নির্বাচন প্রতিহত করতে আওয়ামী লীগের ঘোষণাকে মোকাবিলা করা, সহিংসতা ও প্রতিহিংসার রাজনীতি ঠেকানো, প্রার্থীদের আচরণবিধি মেনে চলার বিষয়টি নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার মতো আরও কিছু চ্যালেঞ্জ তো রয়েছেই। ঢাকা–৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে দিনের বেলা প্রকাশ্যে যেভাবে গুলি করা হয়েছে তা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য একটি অশনিসংকেত। দেশজুড়ে আলোড়ন তোলা এ ঘটনা পুরো নির্বাচনী পরিবেশ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সুষ্ঠু ভোট নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বসে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সুষ্ঠু ভোটানুষ্ঠানে নানামুখী চ্যালেঞ্জে পড়বে নির্বাচন কমিশন (ইসি) তথা সরকার। এবার যেহেতু প্রথমবারের মতো সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে হচ্ছে, তাই দুটি পৃথক ভোটে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন ভোটাররা। এক্ষেত্রে ১০ কোটি ভোটার হলে ব্যালট হবে ২০ কোটি। এই বিপুল সংখ্যক ভোট গণনার যে সময় নির্বাচন কমিশন পাবে, সে সময়কালের মধ্যে ফল প্রকাশ করা সম্ভব হবে কিনা, এ নিয়েও সংশয় রয়েছে। ভোটের ফল প্রকাশে বেশি দেরি হলে প্রার্থীরা ধৈর্যহারা হয়ে পড়তে পারেন; পরিস্থিতি হয়ে উঠতে পারে সংঘাতময়। এ ছাড়া প্রতিটি বুথে নারী, পুরুষ ভোটারের যে সংখ্যা প্রত্যাশা করা হচ্ছে, সেটা পূরণ করা সম্ভব হবে কিনা– এ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ইসির পক্ষ থেকে সরকারকে আরও বেশি সতর্ক ও কঠোর হওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। হাদির ঘটনায় অভিযুক্ত অপরাধীকে অতি দ্রুত গ্রেপ্তার করে শাস্তির ব্যবস্থা করার জন্য সরকারকে বলেছে ইসি। এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্টদের তৎপরতা বাড়ানোর নির্দেশনা দিয়েছে ইসি। যেহেতু আইনগতভাবে ইসি ঘটনার জন্য দায়বদ্ধ না, তাই সহযোগিতা চাওয়া ছাড়া তাদের হাতে বিকল্প ব্যবস্থা নেই। শুরু থেকেই বলা হচ্ছিল, এবারের নির্বাচন হবে অনেক জটিল ও কঠিন। জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে না।
তাই তাদের চেষ্টা থাকবে নির্বাচন প্রতিহত করার। এমন ঘোষণা ইতোমধ্যেই দেওয়া হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের ওপর দেশি, বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা, সংগঠন ও গোষ্ঠীর নজর রয়েছে। তফসিল ঘোষণার পর ওসমান হাদিকে গুলি করার চাঞ্চল্যকর কাণ্ডে ভোটের পরিবেশ বিঘ্নিত হবে কিনা জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার আমাদের সময়কে বলেন, যে ঘটনা ঘটেছে তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অনুরোধ করা হয়েছে যত দ্রুত সম্ভব অভিযুক্ত ব্যক্তিকে খুঁজে বের করে তড়িৎ ব্যবস্থা নেওয়ার। আমরা বিশ^াস করি, সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত ব্যবস্থা নেবে এবং নিচ্ছে। আমরা নির্বাহী বিভাগকে অনুরোধ করেছিথ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যা যা করা দরকার, তা করতে। আমরা আশাবাদী, এ পরিস্থিতি থাকবে না, কেটে যাবে। তফসিল ঘোষণার আগ থেকেই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক ছিল না। এর আগে চট্টগ্রামে বিএনপি সমর্থিত সম্ভাব্য প্রার্থীর প্রচারে গুলির ঘটনা ঘটে। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে একজনের মৃত্যুও হয়। পাবনায়ও বিএনপি–জামায়াতের প্রার্থীদের মধ্যে গুলির ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া একজন প্রার্থীর গণসংযোগে বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। প্রার্থীরা যখন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করবেন, দাখিল করবেন তখনও সংঘাতময় পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে। কারণ মনোনয়নপত্র চূড়ান্ত হওয়ার পর প্রার্থীদের মূল লড়াই শুরু হয়। তাই সামনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। এ বিষয়ে নির্বাচন বিশ্লেষক ও সাবেক নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. আব্দুল আলীম আমাদের সময়কে বলেন, আগামী নির্বাচনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। তাই নির্বাচন কেন্দ্র করে সরকার–নির্বাচন কমিশন মিলে সমন্বিত নির্বাচনী নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। চ্যালেঞ্জগুলোর একটা তালিকা থাকা দরকার।
কোথা থেকে চ্যালেঞ্জগুলো আসতে পারে তা চিহ্নিত করা এবং সেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটা পরিকল্পনা থাকা দরকার। আমার জানা নেই, এ রকম কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা। আমি দেখিনি। এই বিশ্লেষক আরও বলেন, আগামী নির্বাচনে আরও কয়েকটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে এবার ভোটগ্রহণের সময় ৯ ঘণ্টা। প্রত্যাশা করা হয়েছে প্রতিটি বুথে ৫০০ নারী ৬০০ পুরুষ ভোটার ভোট দেবেন। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে বুথগুলোতে এসব ভোটার কাভার করতে পারবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আর এবার ভোট গণনা করা আরও একটা চ্যালেঞ্জ। যদি ১০ কোটি ভোটার ভোট দেয় তাহলে ব্যালট হবে ২০ কোটি। এই ২০ কোটি ব্যালট গণনা করে ইসি দ্রুত ফলাফল দিতে পারবে কিনা? ফল দিতে বেশি দেরি হলে প্রার্থীরা অসহিষ্ণু হয়ে পড়বেন। আর আইশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যত অবণতি হবে, রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পরের প্রতি সন্দেহ ও অবিশ^াস তত বাড়বে। তাতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। বিশ্লেষকদের মতে, পুরো ভোট প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত পরিস্থিতির একটা ছক করে গুরুত্ব অনুযায়ী ধাপে ধাপে পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা না থাকলে হুমকিতে পড়তে পারে সুষ্ঠু ভোট। আর ভোটের পরিবেশ সংঘাতময় ও অস্থিতিশীল হলে প্রার্থী ও ভোটাররা কেন্দ্রে যেতে ভয় পাবেন। তাতে করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা তুলে ধরতে ব্যর্থ হবে সরকার। এ জন্য অতিদ্রুত পরিস্থিতি বুঝে কর্মপরিকল্পনা সাজানো দরকার বলে মনে করেন তারা।
সব নির্বাচনী অফিসের নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ
প্রধান নির্বাচন কমিশনার, নির্বাচন কমিশনার, নির্বাচন কমিশন সচিব ও রিটার্নিং অফিসারসহ দেশের সব নির্বাচন অফিসে নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ দিয়েছে ইসি। নির্বাচন পরিচালনা শাখা থেকে গতকাল শনিবার আইজিপিসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে এ সংক্রান্ত চিঠি পাঠানো হয়েছে। ইসির এক কর্মকর্তা জানান, চার নির্বাচন কমিশনার ও ইসি সচিবের ‘পুলিশ এসকর্ট’ বাড়ানো; ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনা রিটার্নিং অফিসারদের জন্য ‘গানম্যান’ নিয়োগ ও অন্য রিটার্নিং অফিসারদের নিরাপত্তা বাড়ানো এবং সারাদেশের নির্বাচন অফিসের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশনার আগে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী, স্বরাষ্ট্র সচিব, মহাপুলিশ পরিদর্শক, ডিএমপি পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে শুক্র ও শনিবার আলোচনা করেন ইসি সচিব আখতার আহমেদ। তিনি জানান, হাদির ওপর গুলি, লক্ষ্মীপুর ও মঠবাড়িয়ায় দুটি নির্বাচন অফিসে অগ্নিকাণ্ড এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ইসির নানা পদক্ষেপের পাশাপাশি রাজনৈতিক দল ও সম্ভাব্য প্রার্থীসহ সবার সহযোগিতা চান তিনি। নির্বাচনে আচরণবিধি প্রতিপালনে রাজনৈতিক দলসহ সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিজ নিজ উদ্যোগে আগাম পোস্টার অপসারণের অনুরোধ জানান ইসি সচিব। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ৬৯ জন রিটার্নিং কর্মকর্তা থাকছেন। সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা থাকছেন পাঁচ শতাধিক। রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করবেন ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার, ঢাকা–চট্টগ্রাম–খুলনার আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা এবং ৬৪ জেলা প্রশাসক। ইসি সচিব বলেন, জেলা প্রশাসকদের স্থানীয়ভাবে নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে এবং রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নিচ্ছেন। পাশাপাশি আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা রয়েছেন তিনজন। তাদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য বলা হয়েছে।’ ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারকে পাঠানো ইসির চিঠিতে বলা হয়েছে, রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তায় ‘গানম্যান’ নিয়োগের সিদ্ধান্ত দিয়েছে ইসি। এ ছাড়া আগারগাঁওয়ের ইসি সচিবালয়, সারাদেশে ১০ আঞ্চলিক নির্বাচন অফিস, ৬৪ জেলা নির্বাচন অফিস ও ৫২২ উপজেলা/থানা নির্বাচন অফিস রয়েছে। আইজিপিকে ইসির লেখা চিঠিতে বলা হয়েছে, তফসিল ঘোষণার পর লক্ষ্মীপুর জেলা নির্বাচন অফিস ও পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া নির্বাচন অফিসে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। সব আঞ্চলিক নির্বাচন অফিস, জেলা নির্বাচন অফিস, উপজেলা/থানা নির্বাচন অফিসে গুরুত্বপূর্ণ নথি, নির্বাচনী সরঞ্জাম সংরক্ষিত আছে। ফলে সরঞ্জামসহ আঞ্চলিক, জেলা, উপজেলা নির্বাচন অফিসের কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয়সংখ্যক পুলিশ মোতায়েনের ব্যবস্থা নিতে হবে।



