দেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শুরু হয়েছে বছরের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত ও দীর্ঘ শীতকালীন ছুটি। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে শিক্ষক আন্দোলনের কারণে বার্ষিক পরীক্ষার সময়সূচি বদলে যাওয়ায় শিক্ষাঙ্গনে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, সেই চাপ কাটিয়ে পরীক্ষাগুলো সম্পন্ন হওয়ায় এখন সবার মুখেই স্বস্তির ছাপ। অভিভাবকরাও নতুন করে নিশ্বাস ফেলছেনÑ এবার কিছুদিন ঘরেও শান্তি থাকবেÑ আর শিক্ষার্থীদের চোখেমুখে টেনশনমুক্ত ছুটির উচ্ছ্বাস। বছরের শেষভাগে আন্দোলন, স্থগিত পরীক্ষা, অনিশ্চয়তার বোঝাÑ সব মিলিয়ে যে অস্বস্তিকর পরিবেশে স্কুল–কলেজগুলো চলছিল, তার মাঝেই ছুটির নির্দেশনা যেন প্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে এনেছে স্বাভাবিকতা ও উৎসবমুখরতা। দেশের সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অভিভাবকরা এ সময় সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় ছিলেন। আন্দোলনের কারণে বার্ষিক পরীক্ষা বারবার পিছিয়ে যাওয়ায় সন্তানের প্রস্তুতি, মানসিক চাপ, পড়ার সময়সূচিÑ সবকিছু এলোমেলো হয়ে পড়েছিল। প্রতিদিন আলোচনার বিষয় ছিল– ‘পরীক্ষা কবে হবে, আবার বন্ধ হবে কিনা, শেষ করা যাবে তো?’ পরীক্ষাগুলো শেষ হওয়ায় সেই উদ্বেগ থেকে মুক্তি পেয়েছেন তারা। একই সঙ্গে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্যও বছরের শেষপ্রান্তে মিলছে আনন্দের বিরতি। বড়দিন বৃহস্পতিবার পড়ায় শনিবার পর্যন্ত টানা তিন দিনের ছুটি পাচ্ছেন তারা।
এর আগে বিজয় দিবসের সরকারি ছুটি মিলিয়ে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকেই কর্মজীবীদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে আরামদায়ক পরিবেশ, যা সামগ্রিকভাবে পরিবারগুলোকে দিয়েছে বাড়তি স্বস্তি। এদিকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শীতকালীন ছুটি শুরু হয়েছে ১৬ ডিসেম্বর থেকে, চলবে ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এই সময়েই অনুষ্ঠিত হবে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা। অন্যদিকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ছুটি শুরু হয়েছে আরও আগেÑ ডিসেম্বর থেকেই। দুদিন আগের সাপ্তাহিক ছুটিসহ শিক্ষার্থীরা পাচ্ছে আরও দীর্ঘ বিরতি। ছুটি শেষেই ২৮–৩১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হবে অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা। একই সময়ে মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ছুটিও ১৪ থেকে ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঘোষণা করা হয়েছে এবং সরকারি–বেসরকারি কলেজেও একই সূচি অনুসরণ করা হবে। বিজয় দিবসে সর্বস্তরের প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক রাখা হয়েছে। এই দীর্ঘ ছুটিতে শিক্ষার্থীদের মুখে ফুটে উঠেছে উচ্ছ্বাসের আভা। ঢাকার একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী আফরাজ বলল, ‘এতদিন শুধু পরীক্ষা আর টেনশন।
এখন ছুটি, মনে হচ্ছে আবার নতুন করে নিশ্বাস নিতে পারছি। নিজের মতো কিছুদিন কাটাতে পারব।’ রামপুরার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক ছাত্রী রাফার কণ্ঠেও একই উত্তেজনা– ছুটি মানে খেলাধুলা, গল্পের বই আর দাদুর বাড়ি। পড়া–পরীক্ষা থেকে একটু আরাম পাব।’ শুধু শিক্ষার্থী নয়, অভিভাবকরাও স্বস্তিতে দিন কাটাচ্ছেন। রামপুরার অভিভাবক নিধী হক বলেন, শিক্ষক আন্দোলনের কারণে প্রতিদিনই চিন্তা বাড়ছিল। পরীক্ষা ঠিকমতো হবে তো? এখন সব শেষ, ছুটি শুরুÑ মনে হচ্ছে ঘরেও শান্তি ফিরেছে। চাঁদপুরের মোস্তফা মিয়াজী বলেন, বছরের শেষে বাচ্চারা খুব মানসিক চাপে ছিল। ছুটি তাদেরও বিশ্রাম দেবে, আমাদেরও। শিক্ষকরাও মনে করছেন, এই ছুটি শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে। রামপুরার স্কাইলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক শাহিন আক্তার বলেন, ‘অনিশ্চয়তা, আন্দোলন, পিছিয়ে যাওয়া পরীক্ষা– সব মিলিয়ে বাচ্চাদের ওপর অস্বাভাবিক চাপ পড়েছিল।
এই ছুটি তাদের মানসিক প্রশাস্তির সুযোগ দেবে। নতুন বছরে তারা আরও মনোযোগী হয়ে ফিরতে পারবে।’ বছরের শেষভাগের এই সময়টিতে ভ্রমণের পরিকল্পনা, আত্মীয়–স্বজনের বাড়িতে বেড়ানো, ঘরোয়া বিশ্রামÑ সব মিলিয়ে পরিবারগুলো যেন নতুন উদ্যমে সময় কাটাতে প্রস্তুত। স্কুল–কলেজের অস্থিরতা ও পরীক্ষার উদ্বেগ কাটিয়ে এখন শিক্ষাঙ্গনে নেমেছে স্থিতি ও স্বস্তির বাতাস। আর তার মাঝেই শিশুদের মুখে ফিরেছে সেই বহুল প্রতীক্ষিত উচ্ছ্বাসÑ শীতের ছুটি মানেই নতুন আনন্দ, মুক্ত সময় আর পরিবারের সঙ্গে কাটানো উষ্ণ মুহূর্তের স্মৃতি।



