দেশের ভোজ্যতেল বাজারে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার মতো সিন্ডিকেট মাথাছাড়া দিয়ে উঠেছে। এদের কারসাজির কারণে আবারো অস্থির হয়ে উঠেছে ভোজ্যতেলের বাজার। সরকারি অনুমতি ছাড়াই বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম এক লাফে লিটারে ৯ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে উৎপাদন ও বিপণনকারী কোম্পানিগুলো। সিন্ডিকেটের এমন কাণ্ডে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তহীনতা এবং শিল্প গোষ্ঠীর একচেটিয়া ক্ষমতা নিয়ে। সরকারের অনুমতি ছাড়াই ভোজ্য তেলের দাম বাড়নোর কারণে ক্ষুদ্ধ হয়েছে সরকার। সরকারকে না জানিয়ে দাম বাড়েনোর কারণ জানতে চাওয়া হয়েছে ব্যবসায়ীদের কাছে। কাল রোববার এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রনালয়ে বৈঠক আহ্বান করা হয়েছে । সেখানে ভোজ্য তেলের দাম নিয়ে সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা রয়েছে। সূত্র জানায়, তেলের বাজারে ফের নৈরাজ্য চলছে। সরকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অনুমতি ছাড়াই উৎপাদক কোম্পানিগুলো ডিলার পর্যায়ে বেশি দামে সয়াবিন তেল সরবরাহ করছে। এমনকি বাজার শূন্য করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে। বাণিজ্য উপদেষ্টার হুঁশিয়ারিও কাজে আসেনি।
বরং তারা নিজের বাড়ানো সিদ্ধান্তে তেল বিক্রি করছে। খুচরা বাজারে লিটারপ্রতি দাম এখন ১৯৮ টাকা পর্যন্ত রাখা হচ্ছে। যেখানে আগের দাম ছিল ১৮৯ টাকা। পাঁচ লিটারের বোতল বিক্রি হচ্ছে ৯৬৫ টাকায়। জানা গেছে, ১০ নভেম্বর লিটারে ৯ টাকা বাড়ানোর অনুমতি চেয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয় বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। পাশাপাশি ২৪ নভেম্বর তারা আবারও দাম সমন্বয়ের সুপারিশ করে। অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে দুইবার অনুমতি চাওয়া হলেও মন্ত্রণালয় সাড়া দেয়নি। পরে ব্যবসায়ী সংগঠন সরকারের অনুমতি ছাড়াই লিটারপ্রতি ৯ টাকা বাড়িয়ে ১৯৮ টাকায় বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়। মোড়কে নতুন দাম লিখে বাজারে ছাড়া হয় তেল। এ কারণে বাড়তি দামেই তেল কিনতে হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ব্যবায়ীদের নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে বৈঠক হয়। বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমানের সভাপতিত্বে বৈঠকে লিটারে ৯ টাকার পরিবর্তে ৫ টাকা বাড়ানোর অনুমতিপত্র দিতে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে রোববার মন্ত্রণালয়ে ফের বৈঠকের সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেখানে নতুন মূল্য ঘোষণা ও চূড়ান্ত করা হবে। বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দীন বলেন, দাম বাড়ানোর বিষয়ে সরকারকে কেউ জানাননি। তারা একত্র হয়ে হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধি করেছে এটি কোনোভাবেই আইনসম্মত নয়। সরকার চাইলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে। তিনি আরো জানান টিসিবির জন্য সরকার যে তেল কিনেছে, সেটি বাজারদরের তুলনায় লিটারে প্রায় ২০ টাকা কম পেয়েছে। সে ক্ষেত্রে বাজারে হঠাৎ করে দাম বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই।
এ দিকে বাণিজ্য সচিবও সাংবাদিকদের বলেন, ব্যবসায়ীদের যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। অনুমতি ছাড়া তারা কিভাবে দাম বাড়িয়েছে তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিশ্ববাজারে পামঅয়েলের দাম আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত কয়েক দফায় কমেছে। আগস্টে প্রতি টনের দাম ছিল ১০১৬ ডলার। নভেম্বরে প্রতি টনের দাম ছিল ৯৫০ ডলার। এ দাম সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন বলে তথ্যে দেখা গেছে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার বাজার প্রতিবেদনে দেখা যায় অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত দাম অন্তত ৭ থেকে ৮ শতাংশ কমেছে। মালয়েশিয়ান পামঅয়েল বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, পামঅয়েলের উৎপাদন বেড়েছে ১১ দশমিক ০২ শতাংশ এবং মজুদ বেড়েছে ১৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ। এতে বাজারে সরবরাহ চাপ বাড়িয়েছে। মৌসুমি চাহিদা কমে যাওয়ায় বিশেষত চীনে আগাম শীতের কারণে ব্যবহার কমেছে, ফলে দাম আরো কমতে থাকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের বাজারে এর কোনো প্রতিফলন নেই। চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ দেশের সবচেয়ে বড় আমদানিকৃত ভোজ্যতেল পাইকারি বাজার। এখানে প্রতি মণ পামঅয়েলের দাম গত সেপ্টেম্বরের ৬,১০০ টাকা থেকে নেমে বর্তমানে ৫,৭৭০ টাকায় এসেছে। বাংলাদেশ হোলসেল এডিবল অয়েল ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো: গোলাম মাওলা বলেন, বিশ্ববাজারের দাম কমার সুফল ভোক্তাপর্যায়ে যেতেই পারে না, কারণ সরকারের মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা এখন প্রায় বন্ধ।
ব্যবসায়ীরাও একা একা দাম কমানোর ঝুঁকি নিতে চাইছে না। তিনি আরো বলেন সরকারি সংস্থাগুলোর মন্থরতা ও শিল্পগোষ্ঠীর লবিং বাজারকে ‘অদৃশ্যভাবে নিয়ন্ত্রিত’ অবস্থায় রেখে দিয়েছে। এ দিকে ভোজ্যতেলের অন্যতম প্রধান ভোক্তাচাপের মৌসুম রমজান সামনে রেখে বাজারে নতুন উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। সাধারণত বছরে ফেব্রুয়ারি থেকে তেলের আমদানি, সরবরাহ ও মজুদ বাড়ানো হয়। কিন্তু এখন পামঅয়েলের দাম কমলেও আমদানিকারকরা দাম কমাচ্ছেন না। ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাব বলছে, ঘোষণা ছাড়াই সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানো স্পষ্টতই অন্যায় এবং এটি উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর সমন্বিত বাজার নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত। কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে না জানিয়ে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানো ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর ব্যবস্থা দেখার অপেক্ষায় আছি। ২ ডিসেম্বর হঠাৎ ভোজ্যতেলের দাম ৯ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। রিফাইনারি অ্যাসোসিয়েশন যদি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পরামর্শ না করে তেলের দাম বাড়ায়, আমি বলব, সেটা আইনের ব্যত্যয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া যদি তেলের দাম বাড়ানো হয়, তবে সেটি হবে ভোক্তার অধিকারের প্রশ্ন। রিফাইনারি বন্ধ করে দেওয়ার মতো বিধান আইনে রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিযোগিতা আইন আছে, ভোক্তা অধিকার আইন, যদি কেউ মজুত করে দাম বাড়ায়, সেখানে বিশেষ বিধান আইন প্রয়োগের ব্যবস্থাও আছে। সেই আইনের প্রয়োগটা দেখতে চাই। কাওরান বাজারের মুদি ব্যবসায়ী মো. শাকিল বলেন, সকাল থেকেই কোম্পানির ডিলাররা বাড়তি দামের তেল সরবরাহ করছেন। তবে চাহিদা ২০ কার্টন দিলেও ৮ কার্টন দিয়ে গেছে।
মনে হচ্ছে, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সয়াবিনের বাড়তি দাম বৈধ করা হচ্ছে। রাজধানীর সেগুনবাগিচা কাচাবাজারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, খুচরা বিক্রেতারা দোকান থেকে তেল লুকিয়ে ফেলছেন। কারণ জানতে চাইলে বিক্রেতারা জানান, শুনেছি বাজারে অভিযান পরিচালনা করা হবে। তাই নতুন দামের সব তেল সরিয়ে ফেলছি। কারণ, অফিসাররা দোকানে নতুন দামের তেল পেলে জরিমানা করবেন। বাজারের মুদি বিক্রেতা মো. তুহিন বলেন, আমাদের কী দোষ। কোম্পানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। ডিলাররা বাড়তি দামের তেল সরবরাহ করছে। আমরাও বাড়তি দাম দিয়ে কিনেছি। বিক্রি করতে হবে বাড়তি দামেই। কিন্তু অফিসাররা কোম্পানিকে জরিমানা না করে আমাদের জরিমানা করে। ক্রেতারা তেল কিনতে পারুক আর না পারুক, আগের কেনা যে তেল আছে, তা বিক্রি করে নতুন বাড়তি দামের তেল আর নেব না। বিক্রিও করব না। শান্তিনগর বাজারের মুদি বিক্রেতা আশরাফ বলেন, ডিলাররা সকালে বাড়তি দামের তেল সরবরাহ করলেও এখন দিচ্ছেন না। বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছেন। পাশাপাশি বিক্রেতারাও বাড়তি দরের তেল নিতে ভয় পাচ্ছেন। কোম্পানিগুলো তেলের দাম বাড়ালে আমাদের বাড়তি দরে নিয়ে বাড়তি দামে বিক্রি করতে হয়। কিন্তু জরিমানা করা হয় আমাদের। সরকার কোম্পানিগুলোকে কিছু করে না। করতে পারেও না। তিনি জানান, এখন কোম্পানি যেহেতু দাম বাড়িয়েছি, সেহেতু তারা বাড়তি দামেই বিক্রির জন্য বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে।



