দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে জীবন্ত কিংবদন্তি রাজনীতিক হয়ে উঠেছেন বেগম খালেদা জিয়া। যুগে যুগে নির্যাতিত বঞ্ছিত, নিষ্পেষিত জাতিকে আলোর পথ দেখাতে দেশ–জাতির প্রতি একজন নেতা–নেত্রী প্রেরিত হন। কোনো কোনো দেশ–জাতিকে এ জন্য শতশত বছর অপেক্ষা করতে হয়। আবির্ভূত নেতা–নেত্রীর সুযোগ্য নেতৃত্বে মানুষ উদ্বেলিত হন। অবিসংবাদিত নেতা–নেত্রী হিসেবে তাকে গোটা জাতি মেনে নেন। নেতা–নেত্রীর প্রতি অনুগত জাতি তার মুখ থেকে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ বিশ্বাস করেন এবং প্রতিটি আদেশ–নির্দেশনা মেনে নেন। তেমনি একজন অবিসংবাদিত নেত্রী হলেন বেগম খালেদা জিয়া। আব্রাহাম লিংকন, নেলসন ম্যান্ডেলা, মহাত্মা গান্ধী, উইনস্টন চার্চিল, ইয়াসির আরাফাত, মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র, রজব তাইয়েব এরদোগান, শেখ তামিম বিন হামাদ আল–থানি, বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজ আল সউদ এবং বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহর যেমন তাদের দূরদর্শিতা, সাহস এবং ইতিহাসের উপর স্থায়ী প্রভাবের জন্য নিজ নিজ দেশে সর্বজন শ্রদ্ধেয় নেতার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন; তেমনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়া তার ত্যাগ, আপোষহীন নেতৃত্ব, মেধা, সংগ্রামের মাধ্যমে দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের কাছে কিংবদন্তি নেত্রীতে পরিণত হয়েছেন। তিনি হাসলে গোটা দেশ হাসে; তার ব্যথায় ব্যথিত হয় গোটা জাতি। বেগম খালেদা জিয়া এমন ব্যক্তিত্বের নেত্রী যিনি নেতৃত্ব দিয়ে চলমান গতির পরিবর্তন ঘটান, জাতির গতি সঞ্চার করেন, নতুন দিকনির্দেশনা দেন, জনতাকে উদ্বুদ্ধ করেন আত্ম–অনুসন্ধানে। তিনি আপোষহীন নেত্রী, দেশের স্বাধীনতা–সার্বভৌমত্বের ধারক হয়ে উঠেছেন একজন জীবন্ত কিংবদন্তি নেত্রী।
৪২ বছরেরও বেশি সময় ধরে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থেকে তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, সবচেয়ে বেশিসংখ্যক সংসদীয় আসনে বিজয়, আপোষহীন সংগ্রামে দুটি স্বৈরশাসনকে রাজপথে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে বিদায় দেয়ার অসামান্য কৃতিত্বের অধিকারী। পাশাপাশি দেশ ও জাতির জন্য গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়ায় তাকে সইতে হয়েছে অচিন্তনীয় অমানবিক নির্যাতন। হাজারো হুমকি এবং সুখের প্রলোভনেও দেশ ছেড়ে যাননি শুধু বাংলাদেশের মানুষের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে। কর্মগুণে ও সততায় হয়ে গেছেন তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভারতের নাচের পুতুল শেখ হাসিনার শাসনামলে তাকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়, যে বাড়িতে তার প্রাণপ্রিয় স্বামী শেষ দিন পর্যন্ত ছিলেন। এক কাপড়ে সেই বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হলেও তিনি রাজনৈতিক শিষ্টাচারের বাইরে যাননি। তার কান্নায় কেঁদেছিল গোটা জাতি। তারপরও নোংরা, কুৎসিত ভাষায় তিনি কথা বলেননি। এমনকি ফ্যাসিস্ট হাসিনার অশ্রাব্য কটূক্তি ও নজিরবিহীন অপপ্রচারে তিনি জবাব দেননি। তিনি এমন একজন ব্যক্তিত্ব, যিনি একজন আদর্শবান, জাতির অভিভাবক। সবার ঐক্য, দেশের স্বাধীনতা–সার্বভৌমত্ব রক্ষাই তার সমস্ত বক্তব্যের মধ্যে উৎসারিত। ফ্যাসিস্ট শাসন কারাগারে বন্দি করে চিকিৎসার সুযোগ দেয়নি। তারপরও তিনি অনৈক্যের কথা, ধ্বংসাত্মক কথাবার্তা বলেননি, উসকানিমূলক বক্তব্য দেননি। তিনি স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য গত ২৩ নভেম্বর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন।
তার বহু বছর ধরে আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, কিডনি, ফুসফুস, চোখের সমস্যাসহ নানা জটিলতায় ভুগছেন। তার স্বাস্থ্যের অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় গোটা জাতি উদ্বিগ্ন। দেশের ২০ হাজার খানকা–দরবার শরীফে তার রোগমুক্তি কামনায় দোয়া হয়েছে। গত শুক্রবার চার লাখ মসজিদে জুম্মার নামাজের পর মিলাদ ও দোয়া মাহফিল হয়েছে। শুধু তাই নয়, দেশের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রবাসী বাংলাদেশি ও বিদেশিরা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রোগমুক্তির জন্য দোয়া করছেন এবং নেত্রীর সুস্থতার খবর শোনার জন্য মুখিয়ে রয়েছেন। বেগম খালেদা জিয়া বিএনপি চেয়ারপারসন। জনগণের সরাসরি ভোটে তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, স্বাধীনতার ঘোষক সাবেক সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের স্ত্রী ও সাবেক ফার্স্ট লেডি। একটি দলের নেত্রী হয়েও এসব পরিচয় ছাপিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন দলমত নির্বিশেষে সবার নেত্রী। দেশে প্রায় দেড় শতাধিক রাজনৈতিক দল রয়েছে; অথচ একটি দলের চেয়ারপার্সন হয়েও তিনি কর্মগুণে সবার নেত্রী হয়ে উঠেছেন। গত বছরের ৫ আগস্ট গণ–অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট হাসিনা পালানোর পরবর্তীতে তিনি হয়ে উঠেন জাতির রাজনৈতিক অভিভাবক। দলমত নির্বিশেষে সব শ্রেণিপেশার মানুষের কাছে তিনি পরম শ্রদ্ধার পাত্র। দীর্ঘ ৪২ বছর রাজনৈতিক জীবনে গণতন্ত্রের জন্য রাজপথে সংগ্রাম করে আপসহীন দেশনেত্রীর খেতাব পাওয়া ৭৯ বছর বয়সী খালেদা জিয়া এখন হাসপাতালে শয্যাশায়ী। ভুগছেন বার্ধক্যজনিত নানা ব্যাধিতে। হাসপাতালের সিসিইউতে চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সঙ্কটাপন্ন। সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে তাকে চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা। তার চিকিৎসার খোঁজখবর নিতে দলমত নির্বিশেষে হাজারো নেতাকর্মী হাসপাতাল প্রাঙ্গণে ভিড় করছেন। নেত্রীর স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নিচ্ছেন।
কেউ নেত্রীর সুস্থতার জন্য রোজা রাখছেন, কেউ মানত করছেন। প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতায় উদ্বেগ প্রকাশ করে রোগমুক্তি কামনায় দেশেবাসীর কাছে দোয়া প্রার্থনা করেছেন। প্রধান উপদেষ্টা বেগম জিয়াকে দেশের গণতন্ত্রের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দিনও একই ভাবে দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন। শুক্রবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে বেগম খালেদা জিয়ার রোগমুক্তির কামনা করা হয়েছে। উপদেষ্টারাও হাসপাতালে গিয়ে তার শরীরের খোঁজখবর নিয়েছেন। গতকাল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছেন, ‘অসুস্থ খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার সব ব্যবস্থা করে রাখলেও তার শারীরিক অবস্থা সেই ধকল সামলানোর মতো নেই। শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল হলে চিন্তা করে দেখা হবে, বিদেশে নেওয়া সম্ভব কি না? তবে দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, আমেরিকার জনস হপকিনস হাসপাতালের চিকিৎসক এবং লন্ডন ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে মেডিকেল বোর্ড গঠন করে চিকিৎসা চলছে’। গত শুক্রবার রাতে প্রায় আড়াই ঘণ্টা বৈঠক করে মেডিকেল বোর্ড জানায় যে খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়া প্রয়োজন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানিয়েছিলেন, খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডন নেওয়ার পরিকল্পনা করছে তার পরিবার। এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে তাঁকে বিদেশে নেওয়া হবে। এর আগে ল–নে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ ও সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যায় রয়েছেন। তার রোগমুক্তির জন্য দলমত নির্বিশেষে দেশের সকল স্তরের নাগরিক আন্তরিকভাবে দোয়া অব্যাহত রেখেছেন।
মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা তার রোগমুক্তির জন্য দোয়ার সাথে সাথে চিকিৎসার সর্বোচ্চ সহায়তার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন। এমন সংকটকালে মায়ের স্নেহ–স্পর্শ পাবার তীব্র আকাক্সক্ষা যেকোনো সন্তানের মতো আমারও রয়েছে। কিন্তু অন্য আর সবার মতো এটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমার একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়।’ বাধা কোত্থেকে, পোস্টে তা স্পষ্ট না করে তিনি লেখেন, ‘স্পর্শকাতর বিষয়টির বিস্তারিত বর্ণনার অবকাশও সীমিত। রাজনৈতিক বাস্তবতার এ পরিস্থিতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে উপনীত হওয়ামাত্রই স্বদেশপ্রত্যাবর্তনে আমার সুদীর্ঘ উদ্বিগ্ন প্রতীক্ষার অবসান ঘটবে বলেই আমাদের পরিবার আশাবাদী।’ কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষ তারেক রহমানের জন্য মুখিয়ে রয়েছেন। বিএনপির নেতাকর্মী থেকে শুরু করে দেশের সব রাজনৈতিক দল, আলেম–ওলামা, পীর মাশায়েখ এবং সর্বস্তরের মানুষ চাচ্ছেন তারেক রহমান দেশে ফিরে এসে অসুস্থ মায়ের পাশে থাকুক। প্রয়োজনে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিয়ে যাক। দেশের আমজনতার এমন প্রত্যাশা অনুভব করে দেশে ফেরার ক্ষেত্রে বাধার ইঙ্গিত তারেক রহমান দেওয়ার পর প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম গতকাল শনিবার এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘তারেক রহমানের দেশে ফেরার ব্যাপারে সরকারের তরফ থেকে কোন বিধিনিষেধ অথবা কোনো ধরনের আপত্তি নেই।’ ফেসবুক পোস্টে শফিকুল আলম লিখেছেন, ‘বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস ইতিমধ্যে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং তার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন।’
ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টো দিকে উল্টালে দেখা যায়, গৃহবধূ থেকে বেগম খালেদা জিয়া দেশনেত্রী হয়েছেন। তিনি বিএনপির নেতাকর্মীদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে তিনি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন। ওই বছরের ১ এপ্রিল বিএনপির বর্ধিত সভায় তিনি প্রথম বক্তৃতা করেন। বিচারপতি সাত্তার অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে দলের চেয়ারপার্সন নির্বাচনে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। তার নেতৃত্বেই মূলত বিএনপির পূর্ণ বিকাশ হয়; দেশে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। দেশের গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় তার অবদান অবিস্মরণীয়। বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করেই তিনি ১৯৮৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ৭ দলীয় ঐক্যজোটের নেতৃত্ব দিয়ে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সূচনা করেন। একই সময় শেখ হাসিনার দল (বর্তমান ভারতে পলাতক মৃত্যুদ–প্রাপ্ত) আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পনেরো দলীয় জোট গঠন করে। ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত ৫ দলীয় ও ১৫ দলীয় জোট যৌথভাবে এরশাদ বিরোধী পাঁচ দফা আন্দোলন করে। কিন্তু ১৯৮৬ সালের ২১ মার্চ রাতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা জামায়াতের সঙ্গে গাটছাড়া বেঁধে এরশাদের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে বাধার সৃষ্টি হয়। ১৫ দল ভেঙে ৮ দল ও বাম ধারার ৫ দলীয় জোট হয়। হাসিনার নেতৃত্বে ৮ দল নির্বাচনে যায়। এরপর বেগম জিয়ার নেতৃত্বে ৭ দল, বাম ধারার পাঁচ দলীয় ঐক্যজোট রাজপথের আন্দোলন চালায় এবং এরশাদের পাতানো নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে। ১৯৮৭ সাল থেকে খালেদা জিয়া ‘এরশাদ হটাও’ এক দফার আন্দোলনের সূত্রপাত করেন। অবশেষে দীর্ঘ ৮ বছর অবিরাম, নিরলস ও আপোষহীন সংগ্রামের মাধ্যমে ১৯৯০ সালে এরশাদের পতন ঘটে। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বিএনপি। খালেদা জিয়া বাংলাদেশে প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। সেই নির্বাচনে খালেদা জিয়া মোট পাঁচটি আসনে প্রার্থী হয়ে পাঁচটিতেই জয়লাভ করেন। এরপর যতবার নির্বাচন করেছেন সবগুলো আসনে বিজয়ী হয়েছেন। প্রতিটি আসনে নির্বাচিত হওয়া তিনিই একমাত্র নেত্রী।
বেগম জিয়ার অসুস্থতায় গোটা জাতি উদ্বিগ্ন। তার সুস্থতা কামনা করে রাজধানীতে দোয়া মাহফিল করেছে বর্তমানে বিএনপির মূল প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল জামায়াত। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর জন্য গতকাল ফজরের নামাজের পর মসজিদে মসজিদে দোয়া করেছে দলটির নেতারা। বিএনপির পক্ষ থেকেও দেশেব্যাপী বিভিন্ন জেলা উপজেলার মসজিদে মসজিদে দোয়া মাহফিলের কর্মসূচি পালন অব্যাহত রয়েছে।
অসুস্থ খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনা করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেসবুকে নানা মন্তব্য লিখেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। অনেকে স্বৈরাচার আমলের খালেদা জিয়ার আপসহীন নানা বক্তব্য ফেসবুক শেয়ার করে তার সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করছেন। গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকী নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লিখেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি। দেশবাসীর কাছে তার সুস্থতার জন্য দোয়ার আহ্বান জানাই’। বিশিষ্ট টকশো আলোচক ডা. জাহেদ উর রহমান ফেসবুকে লিখেন, ‘বেগম খালেদা জিয়ার জন্য প্রার্থনা। ভয়ংকর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি সুস্থ হয়ে উঠুন’। এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনীম জারা নিজের ফেসবুক পেজে লিখেন, বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। রাজনীতি, দলমত, মতাদর্শ, সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে তার জন্য সবার দোয়া কামনা করি। এক সপ্তাহ আগে এক অনুষ্ঠানে তার সঙ্গে খুব অল্প সময়ের দেখা হয়েছিল। দীর্ঘ স্ট্যাটাসে তিনি আরো লেখেন, ‘বেদনা, অপমান ও সীমাহীন প্রতিকূলতার মধ্যেও খালেদা জিয়া নিজের অবস্থান এবং বিশ্বাস থেকে আপস করেননি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি যে ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন, তা আমাদের জন্য অনুকরণীয়। মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া করি, তিনি যেন বেগম খালেদা জিয়াকে রহমত, আরোগ্য ও শান্তি দান করেন’। বিএনপি চেয়ারপারসনকে নিয়ে একটি দীর্ঘ মন্তব্য ফেসবুকে শেয়ার করেন এনসিপি’র দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি লিখেছেন, ‘দেশের মানুষকে হাসিনার জেলে রেখে বেগম জিয়া নিজে বিদেশ ট্যুরে রাজি হননি। খালেদা জানতেন, এটা জেল না। এটা কবর। এখানে ঢুকলে আর বের হতে না পারার সম্ভাবনাই বেশি। জেনেও কবরে ঢুকেছিলেন। যেখানে তাকে ভালো খেতে দেওয়া হয়নি, চিকিৎসার সুযোগ চাইলে হাসিনা বলেছিলেন, অনেক বছরই তো বাঁচল, আর কত? খালেদা জিয়া তখন হাসিনার জেলে ছিলেন। খাবারে বিষ মেশানোর ১০০ ভাগ সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও খালেদা সেই খাবার খেয়েছেন। নিজের জন্য খাননি। খেয়েছিলেন মানুষের জন্য। আমার আপনার জন্য। খালেদার আর পাওয়ার কী ই বা বাকি ছিল? তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, সেনাপ্রধানের স্ত্রী, ফার্স্ট লেডি। পাওয়ার তো কিছু বাকি ছিল না। তবুও জেলে গিয়েছিলেন, জানতেন, হাসিনার সাথে পারবেন না। তবুও তিনি বিদেশ না গিয়ে দেশের মানুষের সাথে কষ্ট ভাগ করে নিয়েছিলেন। খালেদা জিয়া অসুস্থ। ভয়ংকর রকমের অসুস্থ। আল্লাহ যেন আইসিইউতে শুয়ে থাকা এই নারীকে আমাদের কাছে সুস্থ করে ফেরত দেন। কারণ, আজ থেকে ৮ বছর আগে একদা এই নারী নিজের জীবন, পরিবার, স্বজন সবকিছু বাদ দিয়ে বাংলাদেশের জনগণ আর গণতন্ত্রকে বেছে নিয়েছিলেন!!’
দীর্ঘ ৪২ বছরের রাজনৈতিক জীবনে বেগম খালেদা জিয়া প্রতিশোধ পরায়ণতা করেননি। দেশের রাজনীতিতে তিনি পরিচ্ছন্ন নেতৃত্বের মাধ্যমে এক উদার গণতান্ত্রিক চেতনার ধারক–বাহকের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এ কারণেই খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে হাসিনা গংরা যে অন্যায়–অবিচারগুলো করেছে, সেই অন্যায়–অবিচারগুলোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার ভার তিনি দিয়েছেন দেশের আপামর জনগণকে। তিনি কারাগার থেকে বেরিয়ে এ পর্যন্ত যাকিছু কথা বলেছেন সবগুলোই জনগণের মঙ্গলের উদ্দেশে; কিন্তু একটিবারও নিজের কথা বলেননি। তিনি জনগণের কথা, বাংলাদেশের স্বপ্নের কথা, দেশ বিনির্মাণের কথা বলেছেন। এটি তার নেতৃত্বের মহত্ত্ব। এই রাজনৈতিক শিষ্টাচার তাকে জনগণ শ্রদ্ধা ও সম্মানের অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।



