কয়লার মূল্য না কমানোয় বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি কোম্পানির চলতি বছরের সাধারণ সভা (এজিএম) আয়োজন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কোম্পানির বোর্ড সভায় এজিএমের বিষয়টি উপস্থাপিত হলেও অনুমোদন মেলেনি। এ ছাড়া কয়লার বর্তমান দাম প্রতি টন ১৭৬ ডলার ধরে আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করায় বোর্ড সভা তা অনুমোদন করেনি। বলা হচ্ছে, দাম কমানোর বিষয়ে। প্রতিবছর ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে কোম্পানির এজিএম আয়োজনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানির (বিসিএমসিএল) শ্রমিক ও কর্মচারী ইউনিয়ন পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান, জ্বালানি উপদেষ্টাসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, বড়পুকুরিয়ার কয়লার একমাত্র ক্রেতা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। কিন্তু বড়পুকুরিয়ার বোর্ড চেয়ারম্যান বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব। এ ছাড়া বিদ্যুৎ বিভাগ ও পিডিবির আরও দুজন কর্মকর্তা বড়পুকুরিয়ার বোর্ডে রয়েছেন। এ নিয়ে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব, পিডিবির একজন সদস্য এবং বিদ্যুৎ বিভাগের একজন উপসচিব– তিনজনই বিদ্যুৎ বিভাগের স্বার্থ দেখছেন।
তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের কয়লার দাম কম, তাই কয়লার দাম কম ধরতে হবে। এদিকে বড়পুকুরিয়ার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, কয়লার দাম কমাতে হলে সরকারের নির্দেশনা প্রয়োজন। অফিস আদেশ ছাড়াই মৌখিক নির্দেশনায় ১৭৬ ডলার থেকে কমিয়ে আন্তর্জাতিক রেট ধরে অডিট করে সাধারণ সভা করতে বলা হয়েছে। এটা সম্পূর্ণ বেআইনি। গত বোর্ড সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। সে সময় বোর্ড চেয়ারম্যান কয়লার মূল্য দ্রুত পুনর্নির্ধারণ করে আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুত করে বোর্ড সভায় উপস্থাপনের নির্দেশ দেন। এ বিষয়ে জ্বালানি উপদেষ্টা মোহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘কোম্পানির নিয়ম অনুযায়ী সঠিক সময়েই সাধারণ সভা করতে হবে। কেন সঠিক সময়ে সাধারণ সভা করা যাবে না, সেটা খতিয়ে দেখছি।’
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ফারজানা মমতাজের কাছে জানতে টেলিফোন করা হলে সাড়া পাওয়া যায়নি। ২০০১ সালে একনেক সভায় বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রর কয়লার বিক্রয়মূল্য ৬০ মার্কিন ডলার নির্ধারিত হয়। পরে বিক্রয়মূল্য পর্যায়ক্রমে ৭০, ৮৪, ১০৫, ১৩০ এবং সর্বশেষ ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি ১৭৬ ডলার নির্ধারণ করা হয়। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়ায় কয়লার দাম কম– এমন যুক্তিতে বড়পুকুরিয়ার কয়লার দাম ৯০ ডলার করতে চায় পিডিবি। বড়পুকুরিয়া কর্তৃপক্ষ বলছে, ২০২২ সালে যখন তাদের কয়লার দাম ছিল ১৭৬ ডলার, তখন আন্তর্জাতিক বাজারে সমমানের কয়লার মূল্য ৪০০ ডলারের উপরে ছিল। বিসিএমসিএলকে ওই সময় পিডিবি কয়লার মূল্য ৪০০ ডলারের পরিবর্তে সরকার নির্ধারিত মূল্য পরিশোধ করে। এ ছাড়া এক্সএমসি–সিএমসি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে সম্পাদিত চতুর্থ চুক্তি ২০২১ থেকে ২০২৭ সাল পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। এ চুক্তি অনুসারে ২০২২ সালে কয়লার বিক্রয়মূল্য ১৭৬ ডলার পুনর্নির্ধারণ করা হয়। সূত্র জানায়, বর্তমানে বড়পুকুরিয়ার কয়লার মূল্য ১৭৬ ডলার নির্ধারিত থাকা সত্ত্বেও সরকারি সিদ্ধান্ত ছাড়াই পিডিবি জোরপূর্বক কম মূল্য পরিশোধ করছে। ফলে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত পিডিবির কাছে বিসিএমসিএলের এক হাজার ১৭৮ কোটি টাকা বকেয়া জমেছে। উন্মুক্ত বাজারে বড়পুকুরিয়ার কয়লার প্রচুর চাহিদা থাকা সত্ত্বেও তা বাইরে বিক্রয় করতে দেওয়া হয় না।
এ ছাড়া খনি হতে উত্তোলিত কয়লা সংরক্ষণের জন্য বিসিএমসিএলের তিনটি ইয়ার্ড (পুকুর) রয়েছে, যার মোট আয়তন প্রায় ১৫ একর। এগুলোতে নিরাপদ মজুত ক্ষমতা প্রায় ২.২২ লাখ টন। বর্তমানে এই তিন ইয়ার্ডে মজুত আছে প্রায় ৪.৪৫ লাখ টন। স্বাভাবিকভাবে কয়লার মজুত ৫–৭ ফুট উচ্চতায় রাখা হয়। কিন্তু বর্তমানে প্রায় ৩০–৩৫ ফুট উচ্চতায় কয়লা সংরক্ষণ করা হচ্ছে। কারণ বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের তিনটি ইউনিটের দুটি বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। এতে তারা সক্ষমতার পুরো কয়লা ব্যবহার করতে পারছে না। বেশি কয়লা মজুতের ফলে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করে পিডিবির কাছে একাধিক পত্র পাঠানো হয়েছে। কিন্তু পিডিবি এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না। ইতোমধ্যে কয়লার চাপে ইয়ার্ডের সীমানা দেয়াল ভেঙে গেছে। প্রায়ই আগুন লাগার ঘটনা ঘটছে।



