‘গ্রাম হইল খারামোড়া, যাইটে (যেতে) আইটে (আসতে) আধামরা। মনে করেন, পুয়াতিগর (অন্তঃসত্ত্বা) ব্যথা উঠলে ভ্যানও পাওয়া যায় না। মোবাইলে হ্যালো হ্যালো করলেও কেউ আবার পায় না। এই আমাদের দশা। বাজারে ৩০ টাকার সদাই (পণ্য) আনতে গেলে যাইটে ১০ টাকা আইটে ১০ টাকা সাঁকো ভাড়া দিতে হয়। গরিব মানুষ হামরা। নুন আনতে পানতা ফুরায়। অনেক কষ্ট আমাদের।’ আধো বাংলা আধো গারো ভাষায় এভাবেই নিজেদের দুর্ভোগের কথা বলছিলেন বৃদ্ধা পারসিলা মারাক। দিনমজুর এই নারী পূর্ব খারামোড়া গ্রামের বাসিন্দা। শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার সীমান্তবর্তী রানিশিমূল ইউনিয়নের বালিঝুরি এলাকায় সোমেশ্বরী নদীতে একটি সেতুর জন্য আকুতি পারসিলার মতো হাজারো মানুষের। কিন্তু জনপ্রতিনিধিরা ভোট নিলেও মানুষের দুর্ভোগ নিরসনে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। প্রশাসন নির্বিকার। তাই চারটি গ্রামের মানুষ মুখবুঝে কষ্ট সহ্য করছেন। এক সময় সেতুর দাবি নিয়ে নানা আবেদন–নিবেদেন করেও কোনো ফল না পেয়ে এখন নিশ্চুপ তারা। সরেজমিন দেখা গেছে, ভারত থেকে আসা খরস্রোতা সোমেশ্বরী নদীটি বয়ে গেছে বালিঝুরি নামে একটি এলাকা দিয়ে। কিন্তু নদীর কারণে উত্তর দিকের চারটি গ্রামের ১০–১২ হাজার মানুষের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে– পূর্ব খারামোড়া, পশ্চিম খারামোড়া, কোচপাড়া ও রাঙাজান। বালিঝুরি বাজারের প্রায় এক কিলোমিটার দক্ষিণে সীমান্ত সড়ক। সেখান থেকে প্রায় ২০–২২ কিলোমিটার দূরে শ্রীবরদী উপজেলা সদর। ঝিনাইগাতীর দূরত্ব আরও বেশি। লেখাপড়া, চিকিৎসা, হাট–বাজার থেকে শুরু করে ওই চার গ্রামের মানুষকে দৈনন্দিন সব কাজ নদী পার হয়ে এসে করতে হয়। শুকনো মৌসুমেও জোয়ারের পানি নদী উপচে পড়ে। বর্ষা মৌসুমে তো ভীষণ খরস্রোতা থাকে সোমেশ্বরী। কূলকিনারা খুঁজে পাওয়া যায় না। গ্রামগুলোর জীবন ও জীবিকা চলে কৃষিকাজ করে। এখানে প্রচুর শাকসবজি ও ধান হয়। সব মৌসুমে আগাম সবজি চাষ করেন কৃষক। কিন্তু নদীর দুই পাশে কাঁচা সড়ক ও নদী পারাপার হয়ে সময়মতো হাটে পৌঁছাতে পারেন না তারা। এ কারণে ফসলের ন্যায্য দাম পান না। এই নদী পারাপারের জন্য স্থানীয় কয়েকজন মিলে প্লাস্টিকের ড্রাম ও কাঠ দিয়ে একটি সাঁকো তৈরি করেছেন। জনপ্রতি ভাড়া ১০ টাকা। বর্ষাকালে তারা একটি নৌকা দিয়ে পারাপারের ব্যবস্থা করেন। এই পথেই প্রতিদিন গ্রামের মানুষকে যাতায়াত করতে হয়। কারণ অন্য কোনো পথ নেই। স্থানীয়রা জানান, ১৯৪৭ সালের আগে এই এলাকায় উপজাতি লোকজন বসবাস করতেন। দেশ বিভাগের পর ভারতের আসাম থেকে প্রচুর লোকজন এসে এখানে বসবাস শুরু করেন। এর পর আস্তে আস্তে জনবসতি বাড়তে থাকে।
গ্রাম চারটির প্রায় এক হাজার শিশু স্থানীয় বালিঝুরি উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসায় লেখাপড়া করে। এসব শিক্ষার্থী লেখাপড়া শেষ হওয়ার আগেই ঝরে পড়ে। কারণ যোগাযোগ ব্যবস্থা ও দারিদ্র্যতা। স্বাস্থ্যসেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন চার গ্রামের মানুষ। একটি কমিউনিটি ক্লিনিক ছাড়া এখানে চিকিৎসা নেওয়ার অন্য কোনো ব্যবস্থা নেই। অন্তঃসত্ত্বা নারীদের আসতে হয় ২২ কিলোমিটার দূরে সেবা নিতে। কথা হয় বালিঝুরি উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ও কোচপাড়ার বাসিন্দা শ্রীদেবী কোচের সঙ্গে। আক্ষেপ করে সে জানায়, একদিকে দারিদ্র্যতা, অন্যদিকে যাতায়াতের দুর্ভোগের কারণে এসএসসির পর তাদের আর পড়তে দিতে চান না মা–বাবা। অধিকাংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়। সে জানায়, প্রতিদিন নদী পার হতে ২০ টাকা এবং দুই প্রান্তে ভ্যানে করে আসতে হলে আরও ২০ টাকার দরকার হয়। দরিদ্র মা–বাবার সামর্থ্য নেই এত খরচ করে পড়াশোনা করানোর। একই বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমাইয়া বলে, নদীতে সেতু নাই এবং সড়ক যোগাযোগ খারাপ থাকায় সময়মতো বিদ্যালয়ে আসা যায় না।
অনেক সময় পরীক্ষার দিনও সময়মতো স্কুলে আসতে পারে না শিক্ষার্থীরা। এ কারণে চার গ্রামে শিক্ষার হার খুব কম। বালিঝুরি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তাইবুল ইসলামের ভাষ্য, তাঁর বিদ্যালয়সহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ওই গ্রামগুলোর প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী নদী পার হয়ে এসে পড়াশোনা করে। নদীটি বালিঝুরি ও উপজেলা সদর থেকে চার গ্রামকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। তিনি বলেন, ‘এমনও হয় বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্লাসে আছে, নদীতে জোয়ার এসেছে। ছেড়ে দিতে পারি না। রাত পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ধরে রেখে পরে পৌঁছে দেই।’ তিনি জানান, অনেক সময় দেখা যায় পরীক্ষার সময় জোয়ার এসেছে। তখন সময় পেছাতে হয়। তাঁর চাকরি জীবনে অনেকবার এমন সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। এই শিক্ষক বলেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবাও পান না গ্রাম চারটির লোকজন। শিক্ষার হার খুব কম। বিশেষ করে মেয়েরা পিছিয়ে পড়ছে। কৃষিপণ্য সময়মতো বাজারজাত করতে না পারায় অর্থনৈতিক অবস্থাও খারাপ। রানিশিমূল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল হামিদ সোহাগ বলেন, ‘উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বিগত তিন বছর ধরে সেতু নির্মাণ ও সড়ক পাকাকরণের কথা বলছি। কিন্তু প্রশাসনের কর্মকর্তারা আশ্বাস দিলেও কাজ হয় না।’ উপজেলা প্রকৌশলী মশিউর রহমানের ভাষ্য, অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সেতুটি নির্মাণের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছিল। ১০০ মিটারের একটি সেতু করার জন্য নির্দেশনা এলে কাজটি যাতে দ্রুত হয়, সেজন্য তিনি ৯৯ মিটার সেতু করার জন্য প্রস্তাব পাঠান। কিন্তু বুয়েট থেকে একটি টিম এসে প্রতিবেদন দিলেন সেতুটি বড় করে ১২৬ মিটার করতে হবে। কিন্তু তখন শেরপুরে ১২৬ মিটার সেতু করার কোনো প্রকল্প ছিল না, সুযোগও ছিল না। ফলে সেতুটি আর হলো না। তিনি বলেন, ‘সেতুটি উপজেলার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে গুরুত্ব দিচ্ছি এবং করার চেষ্টা চালাচ্ছি।’



