দেশের তৈরি পোশাক খাতে কর্মরত শ্রমিকদের প্রায় ৩২ শতাংশ ন্যূনতম মজুরি থেকেও কম আয় করেন। এ ছাড়া মোট ৭৮ শতাংশ শ্রমিক তাঁদের পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য জোগাতে পারেন না। শ্রমিকদের মধ্যে প্রতি আটজনের একজন ঋণের জালে আটকা পড়েছেন। সাব–কন্ট্রাক্টেড ও মিশ্র ধরনের কারখানায় ১২ ঘণ্টার শিফট বা অতিরিক্ত কাজ করা শ্রমিকদের জন্য একটি সাধারণ ঘটনা। বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশন (বিএলএফ) পরিচালিত ‘বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে জবরদস্তিমূলক শ্রম ও শিশুশ্রম : ঝুঁকি চিহ্নিতকরণ ও সমাধানে দিকনির্দেশনা’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদনে পোশক শ্রমিকদের এই দৈন্যদশা ওঠে এসেছে। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানী বনানীর একটি হোটেলে গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়– পোশাক সরবরাহ শৃঙ্খলের নিম্নস্তরে এখনও জবরদস্তিমূলক শ্রম ও শিশুশ্রম বিদ্যমান।
শিশু শ্রমিকদের প্রায় ৮০ শতাংশ সাব–কন্ট্রাক্টেড বা মিশ্র চুক্তিভিত্তিক কারখানায় কাজ করে। তাদের ৯৯ শতাংশ সপ্তাহে ৩৬ ঘণ্টার বেশি কাজ করে এবং চাকরিতে যোগদান করার ক্ষেত্রে বয়স–সংক্রান্ত নথি জাল করার ঘটনাও খুবই সাধারণ বিষয়। চট্টগ্রাম অঞ্চলে শিশুশ্রমের হার ঢাকার তুলনায় বেশি পাওয়া গেছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো– সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়া ৯৮ শতাংশ শিশুশ্রমিক বর্তমানে স্কুলে যায় না, যার প্রধান কারণ আর্থিক সংকট। প্রতিবেদনটি সব খাতে ন্যায্য জীবিকা নির্বাহযোগ্য মজুরি (ষরারহম ধিমব) বাস্তবায়নের সুপারিশ তুলে ধরেছে। তাতে বলা হয়েছেÑ অর্থনৈতিক কষ্টই শিশু শ্রম ও জোরপূর্বক শ্রমের মূল কারণ। পাশাপাশি শিশুদের শিক্ষা অব্যাহত রাখার সুযোগ নিশ্চিত করতে একটি বিশেষ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে কাজ করতে পারে। গবেষণাটি বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশন (বিএলএফ) ও যুক্তরাজ্যের নটিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাইটস ল্যাবের যৌথ উদ্যোগে, অলাভজনক প্রতিষ্ঠান গুডউইভের সহায়তায় এবং যুক্তরাজ্য সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত হয়েছে। অনুষ্ঠানে বিএলএফের প্রোগ্রাম কো–অর্ডিনেটর এএইচএম মোরশেদ স্বাগত বক্তব্য দেন। গবেষণার পটভূমি তুলে ধরেন বিএলএফের সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার ইয়াসিন আরাফাত।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন গুডউইভের কান্ট্রি কো–অর্ডিনেটর শাহিনুর রহমান। গবেষণার মূল ফলাফল তুলে ধরেন বিএলএফের প্রোগ্রাম অফিসার মো. জুবায়ের আলম। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, গবেষণার প্রধান উদ্দেশ্য হলোÑ বাংলাদেশের পোশাক খাতে জবরদস্তিমূলক শ্রম ও শিশুশ্রমের অস্তিত্ব লিপিবদ্ধ করা। এ ছাড়া অন্যান্য উদ্দেশ্যের মধ্যে রয়েছে অদৃশ্যমান এবং অনিবন্ধিত সাব–কন্ট্রাক্ট কারখানাগুলোর বিস্তারিত পর্যালোচনা এবং পোশাক খাতে হোম–বেজড উৎপাদন কার্যক্রমের অস্তিত্ব নথিভুক্ত করা। অনুষ্ঠানের বক্তারা বলেন বাংলাদেশ যখন এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশের) থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং জিএসপি+ বাণিজ্য সুবিধা পেতে চায়, তখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের ফোর্সড লেবার অ্যাক্টের পরিপ্রেক্ষিতে, পোশাক শিল্পের সরবরাহ চেইন থেকে জবরদস্তিমূলক শ্রম ও শিশুশ্রম শ্রম নির্মূল করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা সরকার, শিল্প খাতের অংশীজন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগীদের যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পকে আরও নৈতিক, মানবিক ও টেকসইভাবে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান।



