নির্যাতন একটি পুর্ণাঙ্গ অর্থবহ শব্দ। এ শব্দটি অভিধানে স্থান পাবার পূর্বেই সমাজদেহে স্বমহিমায় কার্যরত অবস্থান স্থান পেয়েছে। ভারতবর্ষ একটি সুসভ্য প্রাচীন দেশ। তবে দেশটি যুগ যুগ ধরে সাক্ষ্য বহন করে আসছে শোষণ নির্যাতনের; যেমন কপর্দকশুন্য পরিবারে রূপসী নারীদের থাকে সাধু অসাধু নানা প্রকার অভিজ্ঞতা। একইভাবে, ভারতবর্ষ বহুপূর্ব থেকেই শোষণ নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছে প্রাশ্চ্য–পাশ্চাত্তের বেনীয়াদের দ্বারা, যা বড়ই অসহনীয় এক করুন ইতিহাস। বনের হিংস্র জীব–জানোয়ার বাগে পেলে মানুষকে খোরাক বানাতে যেমন দিক পাশ ভাবেনা, আবার সসস্র বাহীনি বাঘ ভাল্লুক শিকার করতেও দ্বিধাবোধ করে না।
নির্যাতন হলো সবলের ক্ষমতা দুর্বলের উপর প্রয়োগ করা, নির্যাতন কোনো প্রেম কেন্দ্রীক আবহ থেকে সৃষ্টি হতে পারে না। সেখানে রয়েছে স্বার্থ আদায়, দুর্বল নিয়ত দিয়ে যাবে, পরিতৃপ্ত করবে, আর সবল মনের সুখে তা উপভোগ করে সুলোলিত শ্লোক তেলাওয়াত করে চলবে, যাকে বলতে হবে সমঅধিকারের স্বর্গীয় বাস্তবায়ন। দুর্বলের মুখে তাড়না নির্যাতনেরর কোানো প্রতিক্রিয়া ফুটে ওঠার উপায় নেই।
একটি বাস্তব ঘটনা আমি প্রত্যক্ষ করেছি। কতিপয় পরিবারকে আমরা তাদের দুর্দিনে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছিলাম। কথায় বলে, মিয়াবিবি যেন রান্না করার হাঁড়ি ঢাকনার মত, পরষ্পর পরিপুরক; রান্না করার জন্য যেমন হাঁড়ির প্রয়োজন, একইভাবে ডাকনারও আবশ্যকতা রয়েছে সুসিদ্ধ সপক্ক খাদ্য উপভোগ করার জন্য। ভিন্ন দৃষ্টান্ত দেয়া চলে, যেমন কালি কলম। কলমে কালি না থাকলে আপনি লিখবেন কেমন করে। যদিও খোদা নিজের সুরতে মানুষ (আদম) সৃষ্টি করেছেন, কিন্তু গোটা বিশ্ব আবাদ করার জন্য তিনি হাওয়াকেও (নারী) সৃষ্টি করেছেন, যেন উভয় মিলেমিশে ঐশি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারে। প্রজননের ক্ষেত্রে কেবল নরের একক ভুমিকা অর্থবহ হবার নয়, তেমন ক্ষেত্রে নারীর ভুমিকা অপরিহার্য। আর প্রজনন কোনো ক্রোধ, হিংসা, তুচ্ছ–তাচ্ছিল্যের বিষয় নয়, অবশ্যই উভয় উভয়কে আত্মবৎ প্রেম করতে হবে, দুই দেহ আর দুই থাকবে না, মনে প্রাণে, উৎসাহ উদ্দীপনায় মহান ব্রত পালনের জন্য প্রেম সহমর্মীতায় একাকার হয়ে যেতে হবে। সমাজটিকে নতুন কিছু উপহার দিতে হলে কারিগরদের হৃদয়ে থাকতে হবে প্রেমের অফুরান ফল্গুধারা, যে ক্ষেত্রে ক্ষেদ–প্রতিহিংসা, জিঘাংসাকাতরতার চিহ্ন মাত্র থাকা উচিৎ হবে না। যেমন খোদার দরবারে হাজির হবার পুর্বে হৃদয় মন পূতপবিত্র রেখে হাজির হতে হবে, মনে কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ রেখে মাবুদের সাথে বাক্যালাপ করা চলবে না। তদ্রুপ প্রেম হতে হবে সম্পূর্ণ নির্জলা প্রেম। মিয়াবিবি যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন তারা নিঃখাদ প্রেমে পরষ্পরকে বেধে রাখবে, যা হলো ঐশি প্রেমের বাস্তবায়ন।
আমি ইতোপূর্বে বলেছি, মানুষের বক্তব্য এবং বাস্তব জীবন কখনোাই সমান্তরাণ অবস্থানে ছিল না, এবং আদৌ সম্ভব নয়। মানুষ হলো ক্ষণভঙ্গুর। তারা তাদের যাত্রারম্ভ থেকেই খোদার অবাধ্য হয়ে পড়েছে। দেহের কামনা, চোখের লোভ ও সাংসারিক বিষয়ের আদম্যটানে আজ তরা খোদাদ্রোহী। গানের সুরে বলতে হয় কেউ তো জানেনা প্রাণের আকুতি বারে বারে সে কি চায়, স্বার্থের টানে প্রিয়জন কেন দূরে সরে চলে যায়। ধরণীর বুকে পাশাপাশি তবু কেউ বুঝি কারো নয়। গানটি লিখেছেন মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান আর সুর দিয়েছেন সত্য সাহা। মানুষের মধ্যে হীনস্বার্থ যখন পরিপক্ক হয়, ব্যক্তিকে করে তোলে মোহান্ধ, ঠিক তখন অতীতের প্রতিজ্ঞাত প্রেমার্দ বিবেক–বিবেচনা অর্থহীন আবর্জনা হয়ে দেখা দেয়, আর অবিবেচক মোহ তাকে উচ্ছৃঙ্খল অপশক্তিতে পরিণত করে তোলে। বধির অন্ধ মাতালের পক্ষে কান্ডজ্ঞান বিবর্জীত সবকিছুই করা অতীসহজ হয়ে দাড়ায়। মাতাল হওয়ার জন্য কেবল নর একাই যোগ্য নয়, নারীর পক্ষেও মাতাল হওয়া সম্ভব। যদি সময় থাকে তবে ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব নারী ক্লিওপেট্রার বর্ণনা জানতে চেষ্টা করুন। আবার এতদেশিয় চরিত্র ভাওয়ালের রাণীর বর্ণনা জানার চেষ্টা করুন, তৃপ্তি পাবেন। বিপরীত পক্ষে ৮ম রাজা হেনরী বিশ্বাস ঘাতকতার অপবাদে স্বীয় দুই স্ত্রী হত্যা করেছিলেন। তাই নরের হাতে নারী এবং নারীর হাতে নর নির্যাতিত, আহত–নিহত হবার ঘটনা বাস্তবে ও ইতিহাসের পাতায় রয়েছে অগণীত। নির্যাতক মানুষের পর্যায় থেকে অমানুষে পরিণত হবার ফলে নিয়ত ঘটে চলছে নির্যাতন। এক কথায় বলা চলে নির্যাতিত হয়ে আসছে পুরুষের হাতে নারী আর নারীর হাতে পুরষ যা চরম ঘৃণার বিষয়। কালামপাকে একটি শিক্ষা রয়েছে, সূর্য ডুবিবার পুর্বেই নর–নারী উভয়ই যেন পরষ্পরের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ ক্ষমা করে দেয়। যা হবে নিজেদের মিলন ভ্রাতৃত্বের আবহে বাঁচিয়ে রাখার উপায়। সত্যিকারের মানব প্রেমে জাড়িত হয়ে নির্যাতনের স্থলে যদি প্রেম, মহব্বত, শ্রদ্ধাভক্তি, সহমর্মীতা উৎপাদন করা সম্ভব হয় তবে গোটা বিশ্ব আজ নরকপুরীর পরিবর্তে অবশ্যই শান্তি নিকেতনে পরিণত হবে, যে কথা হলফ করে বলা চলে।
মানুষের শক্তি প্রজ্ঞা ধার্মিকতা যেখানে সম্পূর্ণ ফতুর হয়ে যায়, সর্বশক্তিমান মাবুদ তেমন পর্যায় থেকেই স্বীয় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে চলেন। যেমন ৪ দিনের মৃত লাসার নামে এক ব্যক্তিকে মসীহ ডাক দিয়ে জীবিত করে তুললেন (ইউহোন্না ১১ : ৪৩)। যে বিষয়টি ছিল মানুষের ধারণারও অতীত। প্রান্তরে পুঁতে ধরা পুরাতন হাড়গোর দিয়ে একটি বাহীনি পুনরুজ্জীবিত করলেন, যে বিষয় মানুষের চিন্তারও বাহিরে ছিল (ইহিস্কেল ২৭ অধ্যায়)। খোদার উপর প্রকৃত বিশ্বাসী ব্যক্তি নতুন জীবন লাভ করে। যা কেবল খোদার নিজস্ব বিষয়; তেমন ক্ষেত্রে মানুষের কোনো ভুমিকাই থাকতে পারে না। তিনি স্বীয় সৃষ্টিকে অতীব মহব্বত করেন বিধায় কেবল বিশ্বাসহেতু আজ মানুষ লাভ করল পুনর্জন্ম। আর এই নতুন জীবন কোনো দৈহিক বিষয় নয়, যা কেবল আত্মিক বা রূহানি বিষয়। ফলে মানুষের পরিবর্তন এলো চিন্তাচেতনায়, ধ্যান–ধারণায়, স্বভাব আচরণে; তার মধ্য থেকে দূরীভুত হলো খোদার দুষমন অভিশপ্ত ইবলিসের সার্বিক কুটচাল, যেগুলো খোদার উপর সন্দেহই সৃষ্টি করেনি, উপরন্তু সহমানবের সার্বিক সর্বনাশও করে চলতো। যা হলো পাপাক্রান্ত খোদাদ্রোহীদের একমাত্র নেশা ও পেশা।
কথায় বলে, লোকটা বিদ্যার জাহাজ, যার অর্থ জগতের যাবতীয় বিদ্যাবুদ্ধি রয়েছে তার মুখস্ত। তা নীতিবাক্য যতই কণ্ঠস্থ থাক না কেন, তাতে কোনো লাভ হতে পারে কি? যতক্ষণ পর্যন্ত বেদবাক্য অনুযায়ী বাস্তব জীবন সমান্তরাল না থাকে! তা বলতে বাধা কোথায়, আদম থেকে শুরু করে সকলেই অবাধ্যতা ও খোদাদ্রোহী ও বিনাশপ্রাপ্ত। কেউই নিজেকে পাপের কালিমা থেকে স্নাতশুভ্র করার ক্ষমতা রাখে না। বিধির বিধান যতটাই মুখস্ত থাক বা যতটাই সুরেলা কণ্ঠে তেলাওয়াত করুক না কেন তাতে তো হৃদয়ে পুঞ্জিভুত পাপ কালিমা অপসারিত হবার কথা নয়। মানুষ বাঁচে খোদার রহমতে, যা তাদের কর্মফলের দ্বারা কষ্মিণকালেও লভ্য হবার নয়। অর্থ বিত্ত, মেধা বা পান্ডিত্য দিয়ে নাজাত বা মুক্ত পাপ হওয়া অসম্ভব। পাপের কবল থেকে মুক্তি পেতে হবে খোদার রহমতে, যে বিশেষ ব্যবস্থাটি সর্বকালে সর্বলোকের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য।
জাতিভেদ মানুষের হাতে মানুষের দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে। খোদা মানুষ সৃষ্টি করে তাদের দোয়া করেছেন প্রজাবন্ত হতে ও গোটা বিশ্ব আবাদ করতে। তিনি মাত্র একজন মানুষ সৃষ্টি করেছেন, তারপরে পরবর্তী বশং জন্মলাভ করেছে প্রজননের মাধ্যমে। সেই সুবাদে বিশ্বাবাসী আদমের ঐরষজাত আদমকুল। কালামের আলোকে বিষয়টি বাস্তব ও বিতর্কের উর্দ্ধে (পয়দায়েশ ১ : ২৬–২৮)।