আমার আজীবন প্রয়াস একটি বৈসম্যহীন সমাজ গড়ে তোলা। তবে সমাজ বলতে কতকগুলো অগণীত উপপদ লাগিয়ে বৈসম্য সৃষ্টি করার ভ্রান্তশিক্ষা দিতে চাই না। বলছি মানব সমাজের কথা।
আসলে মানুষ অবশ্যই হলো মাত্র একটি সমাজ। খোদা নিজ হাতে মানুষ সৃষ্টি করেছেন। মানুষ হলো অদৃশ্য খোদার দৃশ্যমান প্রতিভূ। কাচের পাত্র ভেঙ্গে শত শত খন্ডে যেমন টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে চেনার স্থানে একইভাবে খোদাদ্রোহীতার ফলে মানুষ অভিশপ্ত ইবলিসে কব্জাগত, পারষ্পরিক মিলন ভ্রাতৃত্যের স্থলে তাদের মধ্যে সৃষ্ট হয়েছে অমিল, দলাদলি, হীনস্বার্থপরতা, কোন্দল, যুদ্ধ, এক কথায় মানুষ কতল করে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার অশুভ পায়তারা।
সমাজ সংস্কারক ব্যক্তিবর্গ তথা ধর্মীয় নেতানেত্রীগণ পর্যন্ত কলুষিত, সাম্যের নামে অসাম্য সৃষ্টিকারী কুটচাল চেলে অখন্ড মানবতাকে ব্যবচ্ছেদ করে আসছে সেই আদিযুগ থেকে। যদিও মুল শব্দ মানুষ যাকে খোদা সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে ও স্বীয় প্রতিনিধি করে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, কিন্তু খোদার তেমন উত্তম পরিকল্পনা বানচাল হয়ে গেল নিজেদের ভাগ্য নিজেদের ক্ষুদে প্রচেষ্টায় গড়তে গিয়ে। মহাসাগরে চলমান জাহাজ বানচাল হয়ে গেলে আরোহীদের ঘটে শলীল সমাধি, একইভাবে আজ আমরা খোদাদ্রোহীতার কুফলে পাপ অন্ধকারে ডুবে জ্ঞানহারা, দিশে হারা অবস্থায় হাতড়ে বেড়াচ্ছি। হারানো অধিকার ফিরে পাবার সম্ভাবনা আমাদের কারো হাতেই আর অবশিষ্ট নেই, যে কথা হলফ করে বলা চলে।
আমাদের সমাজে ইদানিং ঘটে যাওয়া সাম্য প্রতিষ্ঠার অযুহাতে যত যা কিছু ঘটে গেল তা তো পরিষ্কার সর্বগ্রাসী সুনেমি, চোখের পলকে নগর–জনপদ ধ্বংসস্তুপে পরিণত করে দেয়া। জনমনে ত্রাস সৃষ্টি করে পুরো দেশটি বিশৃঙ্খল বিবদমান পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং তেমন অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য নিয়মবহির্ভূত অনিয়মের ঝান্ডা উড্ডীন করে রাখা হয়েছে। তাদের দুষ্ট মন্ত্র হলো, প্রয়োজনের সময় আশ্রয় গ্রহণ করা যাবে, আবার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে সমূলে উচ্ছেদ করাও যাবে।
মানুষকে পুনরায় ঐক্যে ডাক দেবার সকল ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে গেছে। আজ মানুষের পরিচয় দিতে গিয়ে বলতে হয় চন্ডা, মুন্ডা, গুন্ডা, সন্ডা প্রভৃতি; আসলে এ সকল উপপদগুলো মানুষের উপর ধার্য করা হয়েছে বহুপূর্বে। মূলত: তারা সকলেই মানুষ ছিল এবং বর্তমানেও মানুষই রয়ে গেছে। যাদেরকে এমন উপপদ দিয়ে ডাকা হয় তারা অনেকেই হয়ত জানেই না, তারাও মানুষ বটে! ‘মানুষ’ শব্দের আগে পরে নানাবিধ উপপদ দেবার পিছনে রয়েছে সুক্ষ্ম কারচুপি, যা উৎপন্ন হয়েছে কতিপয় হীনস্বার্থন্বেষী মহলের উষড় মস্তিস্ক থেকে। এরা মানুষকে কখনোই ভালবাসতে পারে নি; অবশ্য তারা মহান মাবুদকেও আন্তরিকভাবে ভালবাসেনা। যারা খোদাপ্রেমে পাগলপারা, তারা অবশ্যই মানবপ্রেমিক হতে বাধ্য। যে হৃদয়ে রয়েছে খোদাপ্রেম, সে হৃদয় নিয়ত থাকে মানবকল্যাণে ব্যতিব্যস্ত। কথায় আছে, যে ব্যক্তি দেখা ভাই মহব্বত করতে নারাজ, সে কেমন করে অদেখা খোদার ভক্ত হতে পারে? খোদার প্রতি প্রদর্শিত শ্রদ্ধা ভক্তি হবে দৃশ্যমান মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা ভক্তি আদর যত্ন জ্ঞাপন (ইউহোন্না ৪ : ১৯–২১)।
মহাজ্ঞানী মাবুদ, যিনি হলেন প্রেম ও ক্ষমাধনের অফুরাণ পারাবার, তিনি নিজেই মানুষকে অযাচিতভাবে প্রেম করেছেন, তাদের অসহায় দশা দেখে অনন্তকালের জন্য একক সহায় পাঠিয়েছেন, যিনি প্রেমেরর তাগিদে নিজের পূতপবিত্র রক্ত ঝরিয়েছেন, মানুষের কৃতপাপ ও স্খলনের মূল্য পরিশোধ করার জন্য অর্থাৎ পাপের ঋণ পরিশোধ করে বিশ্ববাসিকে ক্রয় করে নিয়েছেন, যেন সকলে ফিরে পেতে পারে আপন আপন হৃত অধিকার।
যদিও মানুষ আপন দোষে আপন আপন মর্যদা ও অধিকার হারিয়ে আহাম্মক বনে গেছে, তা সত্যেও মেহেরবান মাবুদ নিজের সীমাহিন প্রেম ও উদারতার কারণে পুনরায় তাদের কাছে পেতে উদগ্র বাসনা পোষণ করে আসছেন; আর সে কারণেই স্বীয় কালাম ও পাকরূহ মানবরূপে জগতে প্রেরণ করলেন। তিনি এসে ঐশি প্রেম ও পবিত্রতার জ¦লন্ত দৃষ্টান্ত ঘটালেন, আর তা করতে গিয়ে নিজের প্রাণ পর্যন্ত দিলেন কোরবান। ইব্রাহীম নবীর পুত্র ইসহাকের পরিবর্তে কোরবানির জন্য খোদা যেমন একটি মেষের ব্যবস্থা করেছিলেন ঠিক একইভাবে গুনাহগার বিশে^র জনমানুষের পরিবর্তে খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসীহ হলেন বিকল্প কোরবানির মেষ, যার মৃত্যুতে গুনাহগার বিশে^র পাপার্থক কোরবানি হলো সাধিত। গুনাহগার ব্যক্তির পাপের ঋণ পরিশোধ হলো শতভাগ পূতপবিত্র মসীহের রক্তে। উক্ত কোরবানির উপর বিশ্বাসহেতু আজ বিশ্ববাসী হয়ে গেল মুক্ত–পাপ।
বিশ্বাস হলো একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়, যা বংশ পরম্পরায় লভ্য হবার নয়। এক্ষেত্রে ব্যক্তিকে স্বীয় কৃতপাপের জন্য আন্তরিক অনুতাপ নিয়ে মসীহের কাছে ছুটে আসতে হবে। যে কেউ তাঁর কাছে ছুৃটে আসে, হয় সমর্পীত, তিনি তাকে কোনো অবস্থাতেই বিমুখ করেন না, রিক্ত হাতে ফিরিয়ে দেন না। ব্যক্তি যে মসীহের কাছে সাদরে সমাদৃত ও গৃহীত হয়েছে, তা ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ বুঝতে পারে না। ইমান যেমন ব্যক্তিগত বিষয়, একইভাবে নাজাত প্রাপ্তীর অনুভুতিও একান্ত আত্ম উপলব্ধির বিষয়।
অন্ন, বস্র, বাসস্থানের জন্য মানুষকে দিবানিশি ঘর্মাক্ত কলেবরে শ্রম সাধনা চালিয়ে যেতে হয়, কঠোর পরিশ্রমের জন্য দরকার হয় সুস্বাস্থ্য এবং শুশিক্ষা। এর প্রত্যেকটা বিষয় কৃচ্ছ্রতার দ্বারা দৈহিকভাবে অর্জন করার বিষয়। কিন্তু ধর্মীয় ক্ষেত্রটি হলো সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। যিনি সত্যিকারের ধার্মিক তাঁর সাথে রাখতে হবে মধুময় সুসম্পর্ক। আপনার জানা আছে নিশ্চয়, সকল মানুষ খোদা হাতে খোদার প্রতিনিধি হিসেবে সৃষ্ট; তথাপি আজ তারা খোদাদ্রোহী, কব্জাবন্ধী হয়ে পড়েছে অভিশপ্ত ইবলিসের দ্বারা। মানুষ হারিয়ে ফেলেছে নিজেকে অবমুক্ত করার সার্বিক শক্তি ও কলাকৌশল। পস্তানো ছাড়া মানুষের আর কিছুই করার নেই। তবে হতাশ হবারও কোনো কারণে নেই।
মানুষের শক্তি প্রজ্ঞা ধার্মিকতা যেখানে সম্পূর্ণ ফতুর হয়ে যায়, সর্বশক্তিমান মাবুদ তেমন পর্যায় থেকেই স্বীয় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে চলেন। যেমন ৪ দিনের মৃত লাসার নামে এক ব্যক্তিকে মসীহ ডাক দিয়ে জীবিত করে তুললেন (ইউহোন্না ১১ : ৪৩)। যে বিষয়টি ছিল মানুষের ধারণারও অতীত। প্রান্তরে পুঁতে ধরা পুরাতন হাড়গোর দিয়ে একটি বাহীনি পুনরুজ্জীবিত করলেন, যে বিষয় মানুষের চিন্তারও বাহিরে ছিল (ইহিস্কেল ২৭ অধ্যায়)। খোদার উপর প্রকৃত বিশ্বাসী ব্যক্তি নতুন জীবন লাভ করে। যা কেবল খোদার নিজস্ব বিষয়; তেমন ক্ষেত্রে মানুষের কোনো ভুমিকাই থাকতে পারে না। তিনি স্বীয় সৃষ্টিকে অতীব মহব্বত করেন বিধায় কেবল বিশ্বাসহেতু আজ মানুষ লাভ করল পুনর্জন্ম। আর এই নতুন জীবন কোনো দৈহিক বিষয় নয়, যা কেবল আত্মিক বা রূহানি বিষয়। ফলে মানুষের পরিবর্তন এলো চিন্তাচেতনায়, ধ্যান–ধারণায়, স্বভাব আচরণে; তার মধ্য থেকে দূরীভুত হলো খোদার দুষমন অভিশপ্ত ইবলিসের সার্বিক কুটচাল, যেগুলো খোদার উপর সন্দেহই সৃষ্টি করেনি, উপরন্তু সহমানবের সার্বিক সর্বনাশও করে চলতো। যা হলো পাপাক্রান্ত খোদাদ্রোহীদের একমাত্র নেশা ও পেশা।
কথায় বলে, লোকটা বিদ্যার জাহাজ, যার অর্থ জগতের যাবতীয় বিদ্যাবুদ্ধি রয়েছে তার মুখস্ত। তা নীতিবাক্য যতই কণ্ঠস্থ থাক না কেন, তাতে কোনো লাভ হতে পারে কি? যতক্ষণ পর্যন্ত বেদবাক্য অনুযায়ী বাস্তব জীবন সমান্তরাল না থাকে! তা বলতে বাধা কোথায়, আদম থেকে শুরু করে সকলেই অবাধ্যতা ও খোদাদ্রোহী ও বিনাশপ্রাপ্ত। কেউই নিজেকে পাপের কালিমা থেকে স্নাতশুভ্র করার ক্ষমতা রাখে না। বিধির বিধান যতটাই মুখস্ত থাক বা যতটাই সুরেলা কণ্ঠে তেলাওয়াত করুক না কেন তাতে তো হৃদয়ে পুঞ্জিভুত পাপ কালিমা অপসারিত হবার কথা নয়। মানুষ বাঁচে খোদার রহমতে, যা তাদের কর্মফলের দ্বারা কষ্মিণকালেও লভ্য হবার নয়। অর্থ বিত্ত, মেধা বা পান্ডিত্য দিয়ে নাজাত বা মুক্ত পাপ হওয়া অসম্ভব। পাপের কবল থেকে মুক্তি পেতে হবে খোদার রহমতে, যে বিশেষ ব্যবস্থাটি সর্বকালে সর্বলোকের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য।
জাতিভেদ মানুষের হাতে মানুষের দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে। খোদা মানুষ সৃষ্টি করে তাদের দোয়া করেছেন প্রজাবন্ত হতে ও গোটা বিশ্ব আবাদ করতে। তিনি মাত্র একজন মানুষ সৃষ্টি করেছেন, তারপরে পরবর্তী বশং জন্মলাভ করেছে প্রজননের মাধ্যমে। সেই সুবাদে বিশ্বাবাসী আদমের ঐরষজাত আদমকুল। কালামের আলোকে বিষয়টি বাস্তব ও বিতর্কের উর্দ্ধে (পয়দায়েশ ১ : ২৬–২৮)।