চাঁপাইনবাবগঞ্জের খাদ্যভাণ্ডার খ্যাত বরেন্দ্র ভূমি নাচোল উপজেলার মাঠগুলোতে হলুদের সমারোহ। সরকারি প্রণোদনা পেয়ে উপজেলায় অধিক পরিমাণ জমিতে সরিষার চাষাবাদ হয়েছে। সরিষা চাষে কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া মিলেছে। আবহাওয়া অনুকূল থাকলে বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা দেখছে কৃষকসহ উপজেলা কৃষি বিভাগ।
এবার প্রায় ৯ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে সরিষার চাষাবাদ হয়েছে। চলতি মৌসুমে উপজেলা কৃষি বিভাগ ৮ হাজার ১শ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। পরে সরকারি প্রণোদনা ও বিভিন্ন প্রদর্শনীর ফলে তা বৃদ্ধি পেয়ে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ৯ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে সরিষার চাষাবাদ হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি প্রণোদনা পেয়েছেন ৭ হাজার জন।
সরিষার জাতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আবাদ হয়েছে বারি সরিষা–১৪। দেশের বাজারে সয়াবিন তেলের দাম বেড়ে যাওয়াসহ বিদেশ থেকে ভোজ্য তেলের আমদানি কমাতে সরকার বিনামূল্যে বীজ ও সার বিতরণ করেছে কৃষকদের মধ্যে। এর সুফলও পাওয়া যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে চলতি মৌসুমে নাচোল উপজেলার ৪ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার মাঠগুলোতে শুধু হলুদের সমারোহ। শীতের সিক্ত বাতাশে কৃষকের স্বপ্ন দুলছে সরিষার মাঠে, জেগেছে আনন্দের জোয়ার। মাঠগুলোতে চোখ জুড়ানো সরিষা ফুলের অপরূপ দৃশ্য।
নাচোল উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, দুই একটি চাষাবাদ বা বিনা চাষেই জমিতে ছিটিয়ে সরিষা বীজবপণ করা হয়ে থাকে। আবাদে সেচ, সার ও কীটনাশক লাগে কম। কম খরচে সরিষা উৎপাদন হয়ে থাকে। বর্তমানে মাঠগুলোতে সরিষার ফল আসতে শুরু করেছে। অনেক কৃষক সরিষা কেটে বোরো ধান চাষাবাদে নেমে পড়বে। ভালো ফলন ফলাতে কৃষকদের প্রদর্শনী ও নানা পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা।
উত্তর চন্ডীপুর ব্লকের উপ–সহকারী কৃষি কর্মকর্তা রাকিবুল হাসান জানান, তার ব্লকে সর্বোচ্চ ১২শ ২০ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকুল থাকলে জমিতে ভালো ফলন হবে বলে তিনি জানান।
এবার উপজেলায় টরি সরিষা ৭– ১২৫ হেক্টর, বারি ১৪– ৭৯২৫ হেক্টর, বারি ১৫– ৬১৫ হেক্টর, বারি ১৭–১৫০ হেক্টর, বারি ৯–১২৫ হেক্টর, বিনা ৯– ১০০ হেক্টর, বিনা ১১– ১০ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি প্রণোদনা বীজ ও সার পেয়েছেন ৭ হাজার জন।
সদর ইউনিয়নের ভুজইল গ্রামের কৃষক আব্দুল বারী ৪০ বিঘা ও নাসিরাবাদ গ্রামের আব্দুস সালাম ৩৫ বিঘা জমিতে এবার সরিষার আবাদ করেছেন। তারা জানান, কৃষি প্রণোদনার অংশ হিসেবে উপজেলা কৃষি অফিস সরিষা চাষাবাদের জন্য সার ও বীজ বিনামূল্যে সহায়তা করেছে। সরিষা চাষে অন্যান্য শস্যের তুলনায় খরচও হয় অনেক কম। এক বিঘা জমিতে প্রায় ৬ থেকে ৭ মণ করে সরিষার ফলন হয়ে থাকে। এতে খরচ হয় প্রায় ২ থেকে ৩ হাজার টাকা। আর ফলনও পাওয়া যায় ৭ থেকে ৮ মণ। তাই কম খরচে অধিক লাভের আশায় বেশি জমিতে সরিষার আবাদ করেছি। উৎপাদন ভালো হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সামনে বছর অতিরিক্ত জমিতে সরিষা চাষ করবেন বলেও তারা জানান। তারা আরও জানান, সরিষা উঠিয়ে ইরি ধান চাষাবাদ করবেন।
এ বিষয়ে নাচোল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সলেহ আকরাম বলেন, সরিষা চাষ একটি লাভজনক আবাদ। এ আবাদে কৃষকের একেবারে কম খরচ হয়ে থাকে। আশা করা যাচ্ছে সরিষা চাষ করে এবার কৃষক ভালো লাভবান হবেন। আগামীতে সরিষা চাষে আরও কৃষক উৎসাহিত হবেন। সরকার তেলের ঘাটতি পূরণে এবং আমদানি নির্ভরতা কমাতে তেল ফসলের আবাদ ও উৎপাদন বাড়াতে কৃষকদের নানা পদক্ষেপ নিয়ে উৎসাহিত করছেন। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাগণ সার্বক্ষণিক কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।
তিনি আরও জানান, সরিষা চাষে আগ্রহ বাড়াতে স্বল্পমেয়াদী আমন ধান চাষ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সরিষা চাষাবাদে খরচ হয় কম, সেচ ও সার লাগে অত্যান্ত কম। সরিষা পাতা উৎকৃষ্ট জৈব সার হিসেবে জমিতে ব্যবহার হয়। এতে মাটির স্বাস্থ্য ভালো থাকে। সরিষা কেটে কৃষকরা ইরি বোরো ধানও উৎপাদন করতে পারবে বলে তিনি জানান।