বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনে গত ৫ জানুয়ারি অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। এতে দগ্ধ হয়ে ৪ জনের মৃত্যু হয়। আগুনে পুড়ে আহত হয়েছেন অনেকে। ওই দিনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত ৬–৭ জানুয়ারি পশ্চিমাঞ্চলের বেনাপোল ও ঢালারচর এক্সপ্রেস না চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। একই সঙ্গে লোকাল সব ট্রেন বন্ধ রাখা হয়। সাধারণ যাত্রীরা বলছেন, বেশকিছুদিন ধরে রেল দুর্ঘটনা বেড়ে গেছে। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো দুর্ঘটনা ঘটছে তাই এখন রেলে চলাচল আগের মতো নিরাপদ মনে হয় না। মনের ভিতর একটা আতঙ্ক কাজ করে।
পুরো ট্রেনের যাত্রীরাই এমন শঙ্কায়। কেউ খেয়াল করছেন অস্বাভাবিক কিছু নেই তো! কেউবা জানালা দরজা পরখ করছেন ঠিকঠাক কাজ করে কিনা। ভয়ে বন্ধও করে দিচ্ছেন কেউ কেউ। বলছেন, দোয়া দুরুদ পড়তে পড়তে যাচ্ছি। তাদের জীবনে হুমকি বা আশঙ্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, ট্রেনে উঠলে শেষ পর্যন্ত বাসায় পৌঁছতে পারা যাবে কিনা।
এখন সারা দেশের সঙ্গে ঢাকার ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। ট্রেনগুলো যথা সময়ে ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন ছেড়ে যাচ্ছে। তবে ঢাকাগামী বেনাপোল এক্সপ্রেস (৭৯৫) ট্রেনে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় ট্রেন যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এর ফলে যাত্রীর সংখ্যা কিছুটা কম দেখা গেছে ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনে। ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেন। মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বলেন, অন্যান্য দিনের মতো সকাল থেকে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক আছে। ট্রেনগুলো যথা সময়ে স্টেশন ছেড়ে গেছে।
সরিষাবাড়ীগামী জামালপুর এক্সপ্রেস ট্রেনের এক যাত্রী বলেন, বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনের অগ্নিকান্ডের ঘটনার পর থেকে ট্রেনের যাত্রীদের মাঝে কিছুটা আতঙ্ক বিরাজ করছে। এছাড়া নানা ধরনের ট্রেন দুর্ঘটনার খবর গত কয়েক মাসে দেখেছি।
পঞ্চগড়গামী একতা এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রী বলেন, সকাল থেকে প্রতিটি ট্রেন ঠিক সময়ে ছাড়তে দেখেছি। তবে স্টেশনে ও ট্রেনে যাত্রীর সংখ্যা অনেক কম। অনেক দূরের পথ, যেতে কিছুটা ভয়ও কাজ করছে।
আরেক ট্রেন যাত্রী বলেন, ট্রেন জার্নি নিরাপদ ও আরামদায়ক বলেই জানি। তবে গত কিছুদিনের ঘটনার কারণে আতঙ্ক কাজ করছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা অন্তত এ সময় আরও জোরদার করা উচিৎ।
এর আগে রাজধানীর কমলাপুর প্ল্যাটফরম থেকে রওনা হওয়ার সময় পঞ্চগড়গামী একতা এক্সপ্রেসের চারটি চাকা লাইন থেকে বেরিয়ে যায়। আড়াই ঘণ্টা পর ট্রেনটি ছেড়ে যায়। এ দীর্ঘ সময় যাত্রীদের অপেক্ষা করতে হয়েছে। এর আগের দিন ঢাকার উত্তরার আবদুল্লাহপুরে মালবাহী ট্রেনের পাঁচটি বগি লাইনচ্যুত হয়। একইদিনে ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জে একটি রেলক্রসিংয়ে ট্রাকে ট্রেনের ধাক্কায় ৪ জন নিহত হন। এগুলো এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গত ৩০ অক্টোবর থেকে নাশকতা। ৩ হাজার ২০০ কিলোমিটার রেলপথ পাহারা দেওয়া চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ দেশব্যাপী রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে। বড় ক্ষতির শিকার সরকারি গণপরিবহন ট্রেন।
২০১৪ সালে নির্বাচনের আগে ট্রেন পুড়িয়ে দেওয়া এবং রেললাইন উপড়ে ফেলার ঘটনায় রেলের ক্ষতি হয়েছে ৭০ কোটি টাকা। এবারও সেই অপ্রত্যাশিত ধারাবাহিকতা। রেলওয়ে প্রথম বড় নাশকতার শিকার ৩১ অক্টোবর। প্রায় প্রতিদিনই নাশকতার খবর আসছে। নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস ভোর চারটার দিকে ভয়াবহ নাশকতার শিকার হয়। ওই সময় গাজীপুরের ভাওয়াল রেলওয়ে স্টেশন পার হওয়ার পর বনখড়িয়া এলাকার সেতুর অদূরে বিকট শব্দে ট্রেনের ইঞ্জিন লাইনচ্যুত হয়। এতে ইঞ্জিনসহ ১৪ কোচের (বগি) সাতটিই রেললাইন থেকে ছিটকে পড়ে। দুর্বৃত্তরা বনের মধ্যে রেলপথের ২০ ফুট কেটে রাখলে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এ নাশকতায় যাত্রীবাহী ট্রেনের একজন নিহত ও ১১ জন আহত হয়। ওই ঘটনায় পুরো দিন লেগে যায় রেলপথটি চলাচলের উপযোগী করতে। পরের দিন রাতে নীলফামারীর ডোমারে রেললাইনের ফিশপ্লেট ক্লিপ খুলে নাশকতার চেষ্টা করেছে দুর্বৃত্তরা। তবে এলাকাবাসী এগিয়ে আসায় বড় দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পায় চিলাহাটি–খুলনাগামী সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেন।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক কামরুল আহসান ইতোমধ্যে বলেছেন, রেলওয়ের নিরাপত্তায় রেলওয়ে পুলিশ, আরএনবি, আনসারসহ বিভিন্ন বাহিনী অত্যন্ত সতর্ক। সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দিয়েই ট্রেন পরিচালনা করা হচ্ছে। যাত্রীদের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। বরং নিরাপত্তার স্বার্থেই একেবারের কম প্রয়োজনীয় ট্রেন বন্ধ রাখা হয়েছে। আর রেলপথের লাইনচ্যুতি এড়াতে রক্ষণাবেক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। লেভেলক্রসিং গেটে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। যাতে করে ট্রেনের সঙ্গে বাস, ট্রেন বা অন্য বাহনের কোনো ধাক্কা না লাগে।