বিশ্বপরিক্রমা শব্দটি গোটা বিশ্বচপরে বিচরণের কথা মনে জাগিয়ে তোলে। আসলে বিশ্ব প্রদক্ষিণ করাই হলো বিশ্ব পরিক্রমা। পূর্বে মানুষ বিশ্ব ভ্রমণে নেমে পড়তেন পদব্রজে, কেননা তখনকার যানবাহন ততটা উন্নত ছিল না, যতোটা অত্যাধুনিক যানবাহন বর্তমান যুগে দেখতে পাওয়া যায়! কোনো এক সময় মানুষ নাকি পৃথিবীতে বসেই পৃথিবীর নিকটতম উপগ্রহ চাঁদকে আগুলের দ্বারাই দুই টুকরো করে রেখেছে! আজ বিজ্ঞানের চরমতম উন্নতির ফলে উক্ত চাঁদ পর্যন্ত ছুয়ে আসছে নাসার বৈজ্ঞানিকগণ।
যে কথা বলছিলাম, বিশ্ব পরিক্রমা প্রসঙ্গে, তা বাস্তবায়নের স্বার্থে নিয়ত বহুধরণের উপায় আবিস্কৃত হয়ে চলছে নিত্যদিন। সর্বশেষ আবিষ্কার যন্ত্র বা উপায় হলো ইন্টারনেট, ইলোক্ট্রনিক মাধ্যম। সেকেন্ড সময়ে বিশ্বের এক প্রান্তের খবরাখবর অন্যপ্রান্তে পৌছে দেয়া হচ্ছে উক্ত মাধ্যমে। আবিষ্কার মানুষকে জ্ঞাত করছে সবকটা গোপনে রাখা হাড়ির খবর। যেমন একটি গল্প আছে, ঈসা মসিহের ছেলে বেলার তাঁর খেলার সাথীদের পিতা-মাতা বারণ করতে মসিহের সাথে মেলামেশা করার ব্যাপারে। একদা তিনি যখন দেখতে পেলেন খেলার সাথীরা কেউ আসছে না, তখন তিনি নিজেই গেলেন সাথীদের খুঁজে নিতে। তখন সাথীদের পিতা-মাতা বলতো, ছেলেপুলেরা ঘরে নেই। মসিহ তখন জানতে চাইতেন, বর্তমানে ঘরে যারা আছে, তবে তারা কারা? পিতা মাতা পরিণামফল বুঝতে না পেরে বলে দিতেন, ওগুলো শুকরের ছানা। একথা শুনে মসিহ আচ্ছা বলে চলে আসতেন। পিতামাতা ঘরে ঢুকে নিজেদের সন্তানদের আর দেখতে পেতেন না, পরিবর্তে কতিপয় শুকরের ছানা দেখতো ছুটাছুটি করতে। চালাকি ও প্রতারণার মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখতে পেয়ে তারা হতবিহŸল হয়ে পড়তেন, দ্রুত মসিহের কাছে ছুটে গিয়ে অনুরোধ জানতেন, তাদের সন্তানদের পুর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দেবার জন্য। জানিনা, ধান ভাঙ্গতে এসে শিবের গীত গেয়ে বসলাম কিনা! পরিক্রমার অর্থ সবকিছু প্রকাশ্যে নিয়ে আসা, সাধারণ মানুষের গোচরে তুলে ধরা।
বিশ্ব পবিক্রমার সর্বপ্রথম কাজ হবে বিশ্বটাকে যেন সকলে জানতে পারে সে পদক্ষেপ গ্রহণ করা। কে এ বিশাল রহস্যময় বিশ্ব নির্মাণ করলেন, কি আছে তার উদ্দেশ্য, গোটা বিশ্ব কেন নিয়ম শৃঙ্খলা মোতাবেক আপন আপন বলয় নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যারা বিশ্বটাকে জানতে পারছে, কি করেই বা তারা অতটুকু জ্ঞান আহরণ করলো। মানুষ বলে আমরা যারা নিজেদের মনে করি, আজ আমরা কি সকলে একই মানুষের (আদমের) ঔরষ থেকে জাত হয়েছি, না আমাদের প্রজনন হয়েছে অন্যকোনো উপায়ে যা আসলে ভিন্ন ভিন্ন? বাহ্যত দেখা যায়, আমাদের ক্ষুৎপিপাসা নিবৃত করার জন্য কম বেশি অভিন্ন খাদ্যদ্রব্যের প্রয়োজন পড়ে। শীত-গ্রীষ্মের অনুভুতি একই প্রকার। কেবল ভাষা ভিন্ন, তবুও যে সকল দ্রব্য আমাদের দ্বারা ব্যবহৃত হয়ে আসছে তা তো কোনো ভিন্ন উৎস থেকে উৎপন্ন নয়; যেমন ‘জল’ যা প্রত্যেক প্রাণীর জন্য প্রতিটি মুহুর্তে বেঁচে থাকার জন্য অত্যাবশ্যক, তা তো একই উৎসমূল থেকে সৃষ্ট, ভাষান্তরের কারণে দ্রব্যের মধ্যে কোনো অন্তরায় হবার উপায় নেই।
কথায় আছে, জ্ঞানই আলো! তাই আজ আমাদের জ্ঞান নিয়ে পরিক্রমা শুরু করা যাক। কালামপাকে রয়েছে, খোদা ভয় জ্ঞানের আরম্ভ। খোদা হলেন বিশ্ব নির্মাতা, যিনি মাত্র একজন মানুষ সৃষ্টি করেছেন স্বীয় সুরতে, নিজের বিমূর্ত সত্ত¡া মূর্তমান করার জন্য, আর তাকে দেখার মাধ্যমে বাতেনি খোদা-দর্শন পাবে পূর্ণতা।
প্রশ্ন হলো, কেন তিনি মাত্র একজন মানুষ সৃষ্টি করলেন, অভিপ্রায় কি তাঁর গোটা বিশ্ব মিলেমিশে শান্তিতে, একান্নভুক্ত পরিবার হিসেবে, জগতে বসবাস করুক? অবশ্য কালামের বিভিন্নস্থানে তেমন ধারণারই ইঙ্গিত পাওয়া যায়। যেমন ‘তারা যেন এক হয়’, ‘তোমরা পরষ্পরকে আত্মবৎ প্রেম করো’, ‘প্রতিবেশিকে নিজের মতো প্রেম করো’ ইত্যাদি ইশারা ইঙ্গিত রয়েছে পুরো পাক-কালাম জুড়ে।
তাছাড়া, নবী-রাসুলদের মধ্যে কেউ যেন কোনো ভাগাভাগি না করে, তেমন সাবধানবাণী দেয়া আছে কালামপাকে; ‘লানু ফারেরকু বাইনা আহাদের মেররুসুলিহি’ যার অর্থ হলো নবী-রাসুলগণ খোদা কর্তৃত হারানো বিশৃঙ্খল বিবদমান জনগোষ্টিকে এক কাতারে একই প্লাটফর্মে সংগ্রহ করার জন্য, কেননা, তারা সকলেই তো একই আদমের ঔরষজাত সন্তান, খোদার প্রিয় ও সম্মানিত প্রতিনিধি। মানুষ হলো খোদার বড়ই প্রিয়, চোখের মণিতুল্য। মানুসের বেঁচে থাকার জন্য তথা প্রয়োজন মিটাবার জন্য গোটা বিশ্বচরাচর তিনি নিখুঁতভাবে সুন্দরভাবে সৃষ্টি করেছেন।
দুঃখজনক হলেও সত্য, এতই আদর ও সম্মানের সৃষ্টি অভিশপ্ত ইবলিসের কুটচালে বিভ্রান্ত হয়ে পড়লেন, খোদার নিষেধাজ্ঞা ভুলে গেলেন অথবা তুচ্ছজ্ঞান করে মাংসিক কামনা বাসনাকে প্রধান্য দিয়ে নিজেদের ক্ষতি নিজেরাই ডেকে আনলেন। যার বড়ই প্রমাণ, আজকের কলুষতায় ভরা বিশ্বের প্রত্যেকটি গর্বিত অধিবাসি নিয়ত ভুগে চলছি। কথায় বলে, সংসার সুখের হয় রমণির গুনে, তবে এর সাথে কেউবা জুড়ে দিয়েছে আর একটি পঙক্তি যা হলো ‘যদি গুনবান পতি বাস করে পতিœর সনে’। আমরা যত যা কিছু রচনা করে চলি, তার অধিকাংশ উপাদান সংগ্রীহিত হচ্ছে অতীতের চর্বিতচর্বন বা জাবরকেটে যা পাওয়া যায় তা থেকে, ভবিষ্যতের কোনো কিছু তরতাজা জুড়ে দেবার ক্ষমতা বোধ করি কোনো পার্থিব লেখকের পাতা থেকে খুঁজে সংগ্রহ করা সম্ভব নয়।
আমরা মানুষ, আমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে বিশেষ এক উদ্দেশ্য নিয়ে, আমরা কেউই নিজে নিজেকে সৃষ্টি করতে পারি নি, তেমন চিন্তাটা কেবল অবোধের চিন্তা হবে। তাই মানুষ হলো খোদার হাতে তাঁরই পক্ষে সাক্ষ্য বহন করার নিমিত্তে সৃষ্টি। ব্যত্যয় খুঁজে পাওয়া পন্ডশ্রম মাত্র।
এবার আসুন, যারাই আজ স্বীকার করে একই খোদার অস্তিত্তে, তারা কেন হয়ে আছে বহুধা বিভক্ত, শুধু তাই নয়, পরষ্পর অহিনকুল সম্পর্ক নিয়ে ফন্দি-ফিকির করে ফিরছে পরষ্পরকে বধ ও বিনাশ করার জন্য। শুরুতে দেখতে পাই কাবিল তাঁর সহোদর ভ্রাতা হাবিলকে বধ করে বসলো। তারপর ভ্রাতৃহনন যেন ফরজে আইনে পরিণত হয়ে গেল। খোদা নাকি নিজেই এমন আজ্ঞা করেন তথাকথিত নবী-রাসুলদের খুন-খারাবী চালিয়ে যেতে। অবশ্য গ্রন্থগুলো যে কতোটা সঠিক অবস্থানে আছে তা ভাবনার বিষয়, কেননা, বিশ্বের উপর দিয়ে বয়ে চলা মারাত্মক ঝড়-ঝঞ্জা, যুদ্ধ-বিগ্রহ, অতীতে যতকিছু ঘটে গেছে এবং বর্তমানেও ঘটে চলছে, তাতে ইতিহাস ঐতিহ্য আর কতোটা ঠিক থাকতে পারে। তবে প্রত্যয়ের সাথে বলতে পারি, মাবুদ কিন্তু সনাতন, অব্যয় অক্ষয়, অতীতে তিনি যেমন ছিলেন, বর্তমানেও তেমনই আছেন, আর ভবিষ্যত জুড়ে একইভাবে থাকবেন। সে সুবাদে আমাদের মস্তবড় একটা সুযোগ আছে, খোদ তাঁরই কাছ থেকে সত্য মিথ্যার মধ্যে যে কি পার্থক্য রয়েছে তা জেনে নেয়া যাবে। বিলম্ব কেন, ঠিক এই মুহুর্তে প্রশ্ন করিÑ কি ভাবছেন প্রিয় পাঠক, আমরা কি নিষিদ্ধ গলীর অধিবাসি? তিনি তো পরিষ্কার ঘোষণা দিয়েছেন, যে কোনো স্তরের পতিত ব্যক্তি, হৃদয় খুলে তাঁর কাছে যদি প্রশ্ন করে, তবে তিনি তাৎক্ষণিক জবাব দিবেন, কেননা, রোগীর জন্য যেমন চিকিৎসকের প্রয়োজন, তদ্রুপ পাপীর জন্যই তো ঘটেছে মসিহের আগমন। আমরা পাইকারীহারে সকলেই গুনাহগার, আর আমাদের ফিরিয়ে নেবার জন্য তিনি কলুষিত বিশ্বে নেমে এসেছেন, আমাদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত শোধ দিলেন, যারাই তার পূতপবিত্র রক্তে হয়েছে স্নাতশুভ্র, তারাই আজ মুক্তপাপ, পরিণত হলো খোদার বেগুনাহ সন্তানরূপে।
গোটা বিশ্ব খোদার কাছে আসতে চায় বটে, তবে তারা চরমভাবে ফেঁসে আছে ক্লেদাক্ত ভূমে। নিজেরা নিজেদের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে ক্লেদমুক্ত হবার জন্য। পরিষ্কার দৃষ্টান্ত হবে, ডুবো চরে ডুবে যাওয়া, ব্যক্তিদের উদ্ধার করার জন্য অত্যাবশ্যক উপর থেকে আগত সাহায্য, আর তেমন সাহায্য খোদা মানবরূপে প্রেরণ করলেন তারই কালাম ও রূহ, খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসিহকে, গোটা বিশ্ববাসি উদ্ধারের জন্য। আপনি কি ভাবছেন মৃতদের বিষয় নিয়ে, অর্থাৎ মসিহের ধরাপৃষ্টে মানুষরূপে আগমনের পূর্বে যারা অন্ধকারের মারা গিয়েছে তাদের বিষয় নিয়ে? আপনার চিন্তাটি অবান্তর নয়, বরং সামাজিক চিন্তা। আমি স্বাগত জানাই আপনাকে।
তবে আসুন, খোদা যিনি পরিকল্পনা নিলেন মানুষ সৃষ্টি করার, তিনি তো স্বীয় সুরতে অতি আদর যতেœ মানুষ সৃষ্টি করলেন, তাদের জন্য বরাদ্দ দিলেন উত্তম আবাসভূমি, যার নাম হলো এদন উদ্দান, বড়ই আরামদায়ক স্থান। অবশ্য খোদা তাদের জমি জমার ফসল উপভোগ করার নির্দেশ দিলেন, হুকুম দিলেন প্রজাবন্ত ও বহুবংশ হবার জন্য। মানুষকে তিনি সৃষ্টির স্রেষ্ট জীব, সর্বোত্তম সৃষ্টি, হিসেবে অভিষেক দিলেন। তিনি আদম ও বিবি হাওয়াকে আগেই সাবধান করে দিয়েছিলেন, নিষিদ্ধ গাছের ফল উপভোগ না করার জন্য। আর সেক্ষেত্রেই অভিশপ্ত ইবলিস গিয়ে হাজির, বিভ্রান্ত করলো তাদের, প্রেরণা যোগালো নিষিদ্ধ কাজে রাজি হবার জন্য।
খোদা সবসময়ই ছিলেন অস্তিত্বমান এবং বর্তমানেও আছেন মহাপরাক্রান্ত, তবে কখনও কালামরূপে যেমন ‘প্রথমেই কালাম ছিলেন, কালাম আলাহর সঙ্গে ছিলেন এবং কালাম নিজেই আলাহ ছিলেন। আর প্রথমেই তিনি আলাহর সঙ্গে ছিলেন। সব কিছুই সেই কালামের দ্বারা সৃষ্ট হয়েছিল, আর যা কিছু সৃষ্ট হয়েছিল সেগুলোর মধ্যে কোন কিছুই তাঁকে ছাড়া সৃষ্ট হয় নি। তাঁর মধ্যে জীবন ছিল এবং সেই জীবনই ছিল মানুষের নূর। সেই সূর অন্ধকারের মধ্যে জ্বলছে কিন্তু অন্ধকার নূরকে জয় করতে পারে নি (ইউহোন্না ১ ঃ ১-৫)।
আবার উক্ত কালাম মানুষের পাপের কাফফারা পরিশোধ করার জন্য পুত্রের বেশে অর্থাৎ মানুষরূপে ভূতলে নেমে আসলেন, বিশ্বের পাপের কাফফারা পরিশোধ দিলেন স্বীয় পূতপবিত্র রক্তের মূল্যে, হলেন কবরপ্রাপ্ত; আবার পুনরায় জীবিত হয়ে দেখা দিলেন তাঁর ভক্ত সাহাবীদের সাথে, শিক্ষা দিয়ে ফিরছেন অদ্যাবধি, যার ফলে প্রকৃত ভক্তবৃন্দ আজ তার বিষয় প্রচার না করে নিরব থাকতে পারছে না। এর সবচেয়ে বড় কারণ হলো, মসিহের সাথে যাদের সার্থক মোকাবেলা হয়ে গেছে, তারা জেনে ফেলেছে, সত্যিকারের উত্তম ব্যক্তি হলেন একমাত্র খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসিহ, যিনি সকল মানুষ আত্মবৎ প্রেম করেন, যার প্রেমের মধ্যে ভন্ডামি নেই, নেই পক্ষপাত দোষ। তিনি কাওকে ঘৃণা করেন নাই বা কোনো অপরাধিকেই প্রত্যাখ্যান করছেন না। কারো কোনো ছিদ্র অন্বেষণ করার জন্য তিনি নন প্রেরিত। এর অর্থ এ নয় যে মানুষের মধ্যে বেগুনাহ ব্যক্তি অবস্থান করছে, আসলে তা নয়, কেননা সকলেই পাপ করেছে এবং খোদার গৌরব হারিয়ে বসেছে (রোমীয় ৩ ঃ ২৩)। আর মেহেরবান খোদা সকলকে রক্ষা করার জন্যই ঐশি মেষ হিসেবে মসিহকে করেছেন জগতে প্রেরণ। যেমন ইব্রাহিম নবীর পুত্র ইসহাককে রক্ষা করার জন্য তিনি কোরবানি দেবার জন্য একটি নিখুত মেষ প্রেরণ করেছিলেন। যদিও খোদা ইব্রাহিমের ঈমানের পরীক্ষা নিয়েছিলেন, আর সে পরীক্ষায় তিনি হলেন উত্তীর্ণ। গোটা বিশ্ববাসি আজ বেঁচে আছি খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসিহের জানের কোরবানির কারণে, কেননা আমাদের পাপের কাফফারা পরিশোধ হয়েছে মসিহের পূতপবিত্র রক্তের মূল্যে।
বিশ্ব পরিক্রমার নিরীখে আজ প্রমাণিত, বিবদমান বিশ্ব সকলেই ভুলের খেসারত দিয়ে কাল কাটাচ্ছে। তারা যা কিছুই করে চলছে, তার ফলে নিজেদের বিপন্ন দশা মারাত্মক জটিল করে তুলছে। ধর্মধামে পর্যন্ত মানুষ খুন করে ফিরছে। একই ধর্মাবলম্বি, নিজেরা নিজেদের ডুবিয়ে মারছে। জ্বালিয়ে মারছে, ফাঁসিতে ঝুলাচ্ছে; কত বিচিত্রভাবে মানুষ বধ করে চলছে আজকের সুসভ্য মানুষগুলো, যারা আবার নিজেদের ধার্মিক বলে ঘোষণা দিয়ে ফিরছে।
একই মানুষ, একই আদমের ঔরষজাত সন্তান, নিজেদের এমন এমন অভিধায় চিহ্নিত করে চলছে, যাতে মনে হয় তারা ভিন্ন ভিন্ন গ্রহ-নক্ষত্র থেকে ভিন্ন ভিন্ন বীজ মাটির ধরনীতে হয়েছে উপ্ত। এ সকল প্রবণতা সৃষ্ট হয়েছে কেবল অজ্ঞতা ও খোদার পরিচয় না জানার কারণ। খোদা নবী-রাসুলদের প্রেরণ করেছেন, কেবল বিবদমান বিশৃঙ্খল মানুষগুলোকে এককাতারে জড়ো করার জন্য, আর নবীদের দায়িত্ব হলো রাখালের দায়িত্ব, মেষের মালিক হবার কোনো অধিকার দেয়া হয় নি নবী রাসুলদের উপর। গোটা মেষের পাল সদাসর্বদা একক মালিকের অধিকারে থাকবে, বরাবরের মতো, চিরকালের জন্য, তিনি হলেন খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসিহ, যিনি আদিতে ছিলেন, বর্তমানেও আছেন আর অনন্তকাল জুড়ে বহাল থাকবে তার রাজত্ব। ভ্রান্ত মেষদের এক চুড়ান্ত মূল্যে তিনি ক্রয় করে নিলেন স্বীয় পূত পবিত্র রক্তের মূল্যে। মেষদের প্রতি তিনিই প্রকাশ করেছেন চূড়ান্ত প্রেম, যা আর কারো পক্ষে সাধন করা হয় নি সম্ভব।
ফলতঃ আজ যতজন মসিহের রক্তের মাধ্যমে হয়েছে স্নাতশুভ্র তারা পরিণত হলো খোদার সন্তানরূপে; তারা সকলেই আজ সামিল হয়েছে খোদার ক্রোড়ে, তাদের মধ্যে আর কোনো ভেদাভেদ থাকার প্রশ্নই জাগতে পারে না। মসিহের মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেল পূর্বের সকল মতভেদ। তারা সকলে উজ্জ্বল আলো ও স্বাদযুক্ত লবনের তুল্য, যাদের উপস্থিতি হলো আলোর বন্যা, অমানিশার বিনাস।
সমাজের পচন দূর করতে লবনের ব্যবহার অপরিহার্য, তাই একজন মসিহ হলেন খোদার হাতে ব্যবহৃত আলো ও লবন। আপনি কি সত্যিকার আলোতে পরিণত হতে পেরেছেন, মসিহের মধ্যে ডুবে যান, তিনি তো আপনাকেই খুঁজে ফিরছেন, সকল প্রহেলিকার সমাপ্তি ঘটেছে মসিহের আগমনে। ঈসা মসিহই আমাদের কাছে আলাহর দেওয়া জ্ঞান; তিনিই আমাদের ধার্মিকতা, পবিত্রতা ও মুক্তি। এজন্য পাক-কিতাবের কথামত, ‘যে গর্ব করে সে মাবুদকে নিয়েই গর্ব করুক’। (১করিন্থীয় ১ ঃ ৩১)
যে কথা বলছিলাম, বিশ্ব পরিক্রমা প্রসঙ্গে, তা বাস্তবায়নের স্বার্থে নিয়ত বহুধরণের উপায় আবিস্কৃত হয়ে চলছে নিত্যদিন। সর্বশেষ আবিষ্কার যন্ত্র বা উপায় হলো ইন্টারনেট, ইলোক্ট্রনিক মাধ্যম। সেকেন্ড সময়ে বিশ্বের এক প্রান্তের খবরাখবর অন্যপ্রান্তে পৌছে দেয়া হচ্ছে উক্ত মাধ্যমে। আবিষ্কার মানুষকে জ্ঞাত করছে সবকটা গোপনে রাখা হাড়ির খবর। যেমন একটি গল্প আছে, ঈসা মসিহের ছেলে বেলার তাঁর খেলার সাথীদের পিতা-মাতা বারণ করতে মসিহের সাথে মেলামেশা করার ব্যাপারে। একদা তিনি যখন দেখতে পেলেন খেলার সাথীরা কেউ আসছে না, তখন তিনি নিজেই গেলেন সাথীদের খুঁজে নিতে। তখন সাথীদের পিতা-মাতা বলতো, ছেলেপুলেরা ঘরে নেই। মসিহ তখন জানতে চাইতেন, বর্তমানে ঘরে যারা আছে, তবে তারা কারা? পিতা মাতা পরিণামফল বুঝতে না পেরে বলে দিতেন, ওগুলো শুকরের ছানা। একথা শুনে মসিহ আচ্ছা বলে চলে আসতেন। পিতামাতা ঘরে ঢুকে নিজেদের সন্তানদের আর দেখতে পেতেন না, পরিবর্তে কতিপয় শুকরের ছানা দেখতো ছুটাছুটি করতে। চালাকি ও প্রতারণার মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখতে পেয়ে তারা হতবিহŸল হয়ে পড়তেন, দ্রুত মসিহের কাছে ছুটে গিয়ে অনুরোধ জানতেন, তাদের সন্তানদের পুর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দেবার জন্য। জানিনা, ধান ভাঙ্গতে এসে শিবের গীত গেয়ে বসলাম কিনা! পরিক্রমার অর্থ সবকিছু প্রকাশ্যে নিয়ে আসা, সাধারণ মানুষের গোচরে তুলে ধরা।
বিশ্ব পবিক্রমার সর্বপ্রথম কাজ হবে বিশ্বটাকে যেন সকলে জানতে পারে সে পদক্ষেপ গ্রহণ করা। কে এ বিশাল রহস্যময় বিশ্ব নির্মাণ করলেন, কি আছে তার উদ্দেশ্য, গোটা বিশ্ব কেন নিয়ম শৃঙ্খলা মোতাবেক আপন আপন বলয় নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যারা বিশ্বটাকে জানতে পারছে, কি করেই বা তারা অতটুকু জ্ঞান আহরণ করলো। মানুষ বলে আমরা যারা নিজেদের মনে করি, আজ আমরা কি সকলে একই মানুষের (আদমের) ঔরষ থেকে জাত হয়েছি, না আমাদের প্রজনন হয়েছে অন্যকোনো উপায়ে যা আসলে ভিন্ন ভিন্ন? বাহ্যত দেখা যায়, আমাদের ক্ষুৎপিপাসা নিবৃত করার জন্য কম বেশি অভিন্ন খাদ্যদ্রব্যের প্রয়োজন পড়ে। শীত-গ্রীষ্মের অনুভুতি একই প্রকার। কেবল ভাষা ভিন্ন, তবুও যে সকল দ্রব্য আমাদের দ্বারা ব্যবহৃত হয়ে আসছে তা তো কোনো ভিন্ন উৎস থেকে উৎপন্ন নয়; যেমন ‘জল’ যা প্রত্যেক প্রাণীর জন্য প্রতিটি মুহুর্তে বেঁচে থাকার জন্য অত্যাবশ্যক, তা তো একই উৎসমূল থেকে সৃষ্ট, ভাষান্তরের কারণে দ্রব্যের মধ্যে কোনো অন্তরায় হবার উপায় নেই।
কথায় আছে, জ্ঞানই আলো! তাই আজ আমাদের জ্ঞান নিয়ে পরিক্রমা শুরু করা যাক। কালামপাকে রয়েছে, খোদা ভয় জ্ঞানের আরম্ভ। খোদা হলেন বিশ্ব নির্মাতা, যিনি মাত্র একজন মানুষ সৃষ্টি করেছেন স্বীয় সুরতে, নিজের বিমূর্ত সত্ত¡া মূর্তমান করার জন্য, আর তাকে দেখার মাধ্যমে বাতেনি খোদা-দর্শন পাবে পূর্ণতা।
প্রশ্ন হলো, কেন তিনি মাত্র একজন মানুষ সৃষ্টি করলেন, অভিপ্রায় কি তাঁর গোটা বিশ্ব মিলেমিশে শান্তিতে, একান্নভুক্ত পরিবার হিসেবে, জগতে বসবাস করুক? অবশ্য কালামের বিভিন্নস্থানে তেমন ধারণারই ইঙ্গিত পাওয়া যায়। যেমন ‘তারা যেন এক হয়’, ‘তোমরা পরষ্পরকে আত্মবৎ প্রেম করো’, ‘প্রতিবেশিকে নিজের মতো প্রেম করো’ ইত্যাদি ইশারা ইঙ্গিত রয়েছে পুরো পাক-কালাম জুড়ে।
তাছাড়া, নবী-রাসুলদের মধ্যে কেউ যেন কোনো ভাগাভাগি না করে, তেমন সাবধানবাণী দেয়া আছে কালামপাকে; ‘লানু ফারেরকু বাইনা আহাদের মেররুসুলিহি’ যার অর্থ হলো নবী-রাসুলগণ খোদা কর্তৃত হারানো বিশৃঙ্খল বিবদমান জনগোষ্টিকে এক কাতারে একই প্লাটফর্মে সংগ্রহ করার জন্য, কেননা, তারা সকলেই তো একই আদমের ঔরষজাত সন্তান, খোদার প্রিয় ও সম্মানিত প্রতিনিধি। মানুষ হলো খোদার বড়ই প্রিয়, চোখের মণিতুল্য। মানুসের বেঁচে থাকার জন্য তথা প্রয়োজন মিটাবার জন্য গোটা বিশ্বচরাচর তিনি নিখুঁতভাবে সুন্দরভাবে সৃষ্টি করেছেন।
দুঃখজনক হলেও সত্য, এতই আদর ও সম্মানের সৃষ্টি অভিশপ্ত ইবলিসের কুটচালে বিভ্রান্ত হয়ে পড়লেন, খোদার নিষেধাজ্ঞা ভুলে গেলেন অথবা তুচ্ছজ্ঞান করে মাংসিক কামনা বাসনাকে প্রধান্য দিয়ে নিজেদের ক্ষতি নিজেরাই ডেকে আনলেন। যার বড়ই প্রমাণ, আজকের কলুষতায় ভরা বিশ্বের প্রত্যেকটি গর্বিত অধিবাসি নিয়ত ভুগে চলছি। কথায় বলে, সংসার সুখের হয় রমণির গুনে, তবে এর সাথে কেউবা জুড়ে দিয়েছে আর একটি পঙক্তি যা হলো ‘যদি গুনবান পতি বাস করে পতিœর সনে’। আমরা যত যা কিছু রচনা করে চলি, তার অধিকাংশ উপাদান সংগ্রীহিত হচ্ছে অতীতের চর্বিতচর্বন বা জাবরকেটে যা পাওয়া যায় তা থেকে, ভবিষ্যতের কোনো কিছু তরতাজা জুড়ে দেবার ক্ষমতা বোধ করি কোনো পার্থিব লেখকের পাতা থেকে খুঁজে সংগ্রহ করা সম্ভব নয়।
আমরা মানুষ, আমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে বিশেষ এক উদ্দেশ্য নিয়ে, আমরা কেউই নিজে নিজেকে সৃষ্টি করতে পারি নি, তেমন চিন্তাটা কেবল অবোধের চিন্তা হবে। তাই মানুষ হলো খোদার হাতে তাঁরই পক্ষে সাক্ষ্য বহন করার নিমিত্তে সৃষ্টি। ব্যত্যয় খুঁজে পাওয়া পন্ডশ্রম মাত্র।
এবার আসুন, যারাই আজ স্বীকার করে একই খোদার অস্তিত্তে, তারা কেন হয়ে আছে বহুধা বিভক্ত, শুধু তাই নয়, পরষ্পর অহিনকুল সম্পর্ক নিয়ে ফন্দি-ফিকির করে ফিরছে পরষ্পরকে বধ ও বিনাশ করার জন্য। শুরুতে দেখতে পাই কাবিল তাঁর সহোদর ভ্রাতা হাবিলকে বধ করে বসলো। তারপর ভ্রাতৃহনন যেন ফরজে আইনে পরিণত হয়ে গেল। খোদা নাকি নিজেই এমন আজ্ঞা করেন তথাকথিত নবী-রাসুলদের খুন-খারাবী চালিয়ে যেতে। অবশ্য গ্রন্থগুলো যে কতোটা সঠিক অবস্থানে আছে তা ভাবনার বিষয়, কেননা, বিশ্বের উপর দিয়ে বয়ে চলা মারাত্মক ঝড়-ঝঞ্জা, যুদ্ধ-বিগ্রহ, অতীতে যতকিছু ঘটে গেছে এবং বর্তমানেও ঘটে চলছে, তাতে ইতিহাস ঐতিহ্য আর কতোটা ঠিক থাকতে পারে। তবে প্রত্যয়ের সাথে বলতে পারি, মাবুদ কিন্তু সনাতন, অব্যয় অক্ষয়, অতীতে তিনি যেমন ছিলেন, বর্তমানেও তেমনই আছেন, আর ভবিষ্যত জুড়ে একইভাবে থাকবেন। সে সুবাদে আমাদের মস্তবড় একটা সুযোগ আছে, খোদ তাঁরই কাছ থেকে সত্য মিথ্যার মধ্যে যে কি পার্থক্য রয়েছে তা জেনে নেয়া যাবে। বিলম্ব কেন, ঠিক এই মুহুর্তে প্রশ্ন করিÑ কি ভাবছেন প্রিয় পাঠক, আমরা কি নিষিদ্ধ গলীর অধিবাসি? তিনি তো পরিষ্কার ঘোষণা দিয়েছেন, যে কোনো স্তরের পতিত ব্যক্তি, হৃদয় খুলে তাঁর কাছে যদি প্রশ্ন করে, তবে তিনি তাৎক্ষণিক জবাব দিবেন, কেননা, রোগীর জন্য যেমন চিকিৎসকের প্রয়োজন, তদ্রুপ পাপীর জন্যই তো ঘটেছে মসিহের আগমন। আমরা পাইকারীহারে সকলেই গুনাহগার, আর আমাদের ফিরিয়ে নেবার জন্য তিনি কলুষিত বিশ্বে নেমে এসেছেন, আমাদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত শোধ দিলেন, যারাই তার পূতপবিত্র রক্তে হয়েছে স্নাতশুভ্র, তারাই আজ মুক্তপাপ, পরিণত হলো খোদার বেগুনাহ সন্তানরূপে।
গোটা বিশ্ব খোদার কাছে আসতে চায় বটে, তবে তারা চরমভাবে ফেঁসে আছে ক্লেদাক্ত ভূমে। নিজেরা নিজেদের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে ক্লেদমুক্ত হবার জন্য। পরিষ্কার দৃষ্টান্ত হবে, ডুবো চরে ডুবে যাওয়া, ব্যক্তিদের উদ্ধার করার জন্য অত্যাবশ্যক উপর থেকে আগত সাহায্য, আর তেমন সাহায্য খোদা মানবরূপে প্রেরণ করলেন তারই কালাম ও রূহ, খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসিহকে, গোটা বিশ্ববাসি উদ্ধারের জন্য। আপনি কি ভাবছেন মৃতদের বিষয় নিয়ে, অর্থাৎ মসিহের ধরাপৃষ্টে মানুষরূপে আগমনের পূর্বে যারা অন্ধকারের মারা গিয়েছে তাদের বিষয় নিয়ে? আপনার চিন্তাটি অবান্তর নয়, বরং সামাজিক চিন্তা। আমি স্বাগত জানাই আপনাকে।
তবে আসুন, খোদা যিনি পরিকল্পনা নিলেন মানুষ সৃষ্টি করার, তিনি তো স্বীয় সুরতে অতি আদর যতেœ মানুষ সৃষ্টি করলেন, তাদের জন্য বরাদ্দ দিলেন উত্তম আবাসভূমি, যার নাম হলো এদন উদ্দান, বড়ই আরামদায়ক স্থান। অবশ্য খোদা তাদের জমি জমার ফসল উপভোগ করার নির্দেশ দিলেন, হুকুম দিলেন প্রজাবন্ত ও বহুবংশ হবার জন্য। মানুষকে তিনি সৃষ্টির স্রেষ্ট জীব, সর্বোত্তম সৃষ্টি, হিসেবে অভিষেক দিলেন। তিনি আদম ও বিবি হাওয়াকে আগেই সাবধান করে দিয়েছিলেন, নিষিদ্ধ গাছের ফল উপভোগ না করার জন্য। আর সেক্ষেত্রেই অভিশপ্ত ইবলিস গিয়ে হাজির, বিভ্রান্ত করলো তাদের, প্রেরণা যোগালো নিষিদ্ধ কাজে রাজি হবার জন্য।
খোদা সবসময়ই ছিলেন অস্তিত্বমান এবং বর্তমানেও আছেন মহাপরাক্রান্ত, তবে কখনও কালামরূপে যেমন ‘প্রথমেই কালাম ছিলেন, কালাম আলাহর সঙ্গে ছিলেন এবং কালাম নিজেই আলাহ ছিলেন। আর প্রথমেই তিনি আলাহর সঙ্গে ছিলেন। সব কিছুই সেই কালামের দ্বারা সৃষ্ট হয়েছিল, আর যা কিছু সৃষ্ট হয়েছিল সেগুলোর মধ্যে কোন কিছুই তাঁকে ছাড়া সৃষ্ট হয় নি। তাঁর মধ্যে জীবন ছিল এবং সেই জীবনই ছিল মানুষের নূর। সেই সূর অন্ধকারের মধ্যে জ্বলছে কিন্তু অন্ধকার নূরকে জয় করতে পারে নি (ইউহোন্না ১ ঃ ১-৫)।
আবার উক্ত কালাম মানুষের পাপের কাফফারা পরিশোধ করার জন্য পুত্রের বেশে অর্থাৎ মানুষরূপে ভূতলে নেমে আসলেন, বিশ্বের পাপের কাফফারা পরিশোধ দিলেন স্বীয় পূতপবিত্র রক্তের মূল্যে, হলেন কবরপ্রাপ্ত; আবার পুনরায় জীবিত হয়ে দেখা দিলেন তাঁর ভক্ত সাহাবীদের সাথে, শিক্ষা দিয়ে ফিরছেন অদ্যাবধি, যার ফলে প্রকৃত ভক্তবৃন্দ আজ তার বিষয় প্রচার না করে নিরব থাকতে পারছে না। এর সবচেয়ে বড় কারণ হলো, মসিহের সাথে যাদের সার্থক মোকাবেলা হয়ে গেছে, তারা জেনে ফেলেছে, সত্যিকারের উত্তম ব্যক্তি হলেন একমাত্র খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসিহ, যিনি সকল মানুষ আত্মবৎ প্রেম করেন, যার প্রেমের মধ্যে ভন্ডামি নেই, নেই পক্ষপাত দোষ। তিনি কাওকে ঘৃণা করেন নাই বা কোনো অপরাধিকেই প্রত্যাখ্যান করছেন না। কারো কোনো ছিদ্র অন্বেষণ করার জন্য তিনি নন প্রেরিত। এর অর্থ এ নয় যে মানুষের মধ্যে বেগুনাহ ব্যক্তি অবস্থান করছে, আসলে তা নয়, কেননা সকলেই পাপ করেছে এবং খোদার গৌরব হারিয়ে বসেছে (রোমীয় ৩ ঃ ২৩)। আর মেহেরবান খোদা সকলকে রক্ষা করার জন্যই ঐশি মেষ হিসেবে মসিহকে করেছেন জগতে প্রেরণ। যেমন ইব্রাহিম নবীর পুত্র ইসহাককে রক্ষা করার জন্য তিনি কোরবানি দেবার জন্য একটি নিখুত মেষ প্রেরণ করেছিলেন। যদিও খোদা ইব্রাহিমের ঈমানের পরীক্ষা নিয়েছিলেন, আর সে পরীক্ষায় তিনি হলেন উত্তীর্ণ। গোটা বিশ্ববাসি আজ বেঁচে আছি খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসিহের জানের কোরবানির কারণে, কেননা আমাদের পাপের কাফফারা পরিশোধ হয়েছে মসিহের পূতপবিত্র রক্তের মূল্যে।
বিশ্ব পরিক্রমার নিরীখে আজ প্রমাণিত, বিবদমান বিশ্ব সকলেই ভুলের খেসারত দিয়ে কাল কাটাচ্ছে। তারা যা কিছুই করে চলছে, তার ফলে নিজেদের বিপন্ন দশা মারাত্মক জটিল করে তুলছে। ধর্মধামে পর্যন্ত মানুষ খুন করে ফিরছে। একই ধর্মাবলম্বি, নিজেরা নিজেদের ডুবিয়ে মারছে। জ্বালিয়ে মারছে, ফাঁসিতে ঝুলাচ্ছে; কত বিচিত্রভাবে মানুষ বধ করে চলছে আজকের সুসভ্য মানুষগুলো, যারা আবার নিজেদের ধার্মিক বলে ঘোষণা দিয়ে ফিরছে।
একই মানুষ, একই আদমের ঔরষজাত সন্তান, নিজেদের এমন এমন অভিধায় চিহ্নিত করে চলছে, যাতে মনে হয় তারা ভিন্ন ভিন্ন গ্রহ-নক্ষত্র থেকে ভিন্ন ভিন্ন বীজ মাটির ধরনীতে হয়েছে উপ্ত। এ সকল প্রবণতা সৃষ্ট হয়েছে কেবল অজ্ঞতা ও খোদার পরিচয় না জানার কারণ। খোদা নবী-রাসুলদের প্রেরণ করেছেন, কেবল বিবদমান বিশৃঙ্খল মানুষগুলোকে এককাতারে জড়ো করার জন্য, আর নবীদের দায়িত্ব হলো রাখালের দায়িত্ব, মেষের মালিক হবার কোনো অধিকার দেয়া হয় নি নবী রাসুলদের উপর। গোটা মেষের পাল সদাসর্বদা একক মালিকের অধিকারে থাকবে, বরাবরের মতো, চিরকালের জন্য, তিনি হলেন খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসিহ, যিনি আদিতে ছিলেন, বর্তমানেও আছেন আর অনন্তকাল জুড়ে বহাল থাকবে তার রাজত্ব। ভ্রান্ত মেষদের এক চুড়ান্ত মূল্যে তিনি ক্রয় করে নিলেন স্বীয় পূত পবিত্র রক্তের মূল্যে। মেষদের প্রতি তিনিই প্রকাশ করেছেন চূড়ান্ত প্রেম, যা আর কারো পক্ষে সাধন করা হয় নি সম্ভব।
ফলতঃ আজ যতজন মসিহের রক্তের মাধ্যমে হয়েছে স্নাতশুভ্র তারা পরিণত হলো খোদার সন্তানরূপে; তারা সকলেই আজ সামিল হয়েছে খোদার ক্রোড়ে, তাদের মধ্যে আর কোনো ভেদাভেদ থাকার প্রশ্নই জাগতে পারে না। মসিহের মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেল পূর্বের সকল মতভেদ। তারা সকলে উজ্জ্বল আলো ও স্বাদযুক্ত লবনের তুল্য, যাদের উপস্থিতি হলো আলোর বন্যা, অমানিশার বিনাস।
সমাজের পচন দূর করতে লবনের ব্যবহার অপরিহার্য, তাই একজন মসিহ হলেন খোদার হাতে ব্যবহৃত আলো ও লবন। আপনি কি সত্যিকার আলোতে পরিণত হতে পেরেছেন, মসিহের মধ্যে ডুবে যান, তিনি তো আপনাকেই খুঁজে ফিরছেন, সকল প্রহেলিকার সমাপ্তি ঘটেছে মসিহের আগমনে। ঈসা মসিহই আমাদের কাছে আলাহর দেওয়া জ্ঞান; তিনিই আমাদের ধার্মিকতা, পবিত্রতা ও মুক্তি। এজন্য পাক-কিতাবের কথামত, ‘যে গর্ব করে সে মাবুদকে নিয়েই গর্ব করুক’। (১করিন্থীয় ১ ঃ ৩১)