নহিমিয়া নবীর পুস্তক থেকে ৯ম ও ১০ অধ্যায় দুটো প্রকাশ করে মানুষের পাপাচারিতা আর মাবুদের সীমাহিন প্রেম ও ক্ষমার ইতিকথা। বস্তুত পক্ষে মানুষের মধ্যে পাপাচার হয়ে আছে অস্তিমজ্জাগত, স্বভাবে আচরণে তারা বড়ই অহংকারী, পরনিন্দুক, পরশ্রীকাতর আত্মকেন্দ্রীক একগুয়ে জাতি। প্রথম জোড়া মানুষ আদম–হাওয়া থেকে শুরু হয়েছে খোদাদ্রোহীতা। যখনই তাদের উপর তাদের কর্মফল আপতিত হত, অমনি তারা ছুটাছুটি আরম্ভ করত, মাবুদের কাছে ফরিয়াদ করে নিজেদের বাধ্যগত সাধুসন্তে পরিণত হতো, যখনই সমস্যা কেটে যেত অমনি মন্দ কাজে পুনরায় জড়িয়ে পড়তো। একদিকে পাপ অপরাধের জন্য কুম্ভিরাশ্রু ঝড়াতো আবার পরক্ষণেই যেই লাউ সেই কদু হয়ে যেত। তারা দাস্যগৃহ অধিক পছন্দ করতো, স্বাধীনতা মেনে নিতে পারতোনা। চরম বিপন্ন অবস্থায় তওবা করে মাবুদের কাছে কসম খেত, যেমন “কেবল তুমিই মাবুদ। তুমি আকাশ, মহাকাশ ও তার মধ্যেকার সবকিছু, দুনিয়া ও তার উপরকার সবকিছু এবং সাগর ও তার মধ্যেকার সবকিছু তৈরী করেছ। তুমিই সকলের প্রাণ দিয়েছ এবং বেহেশতের সকলেই তোমার এবাদত করে” (নহিমিয়া ৯ : ৬)।
এমন হলো তাদের স্বীকারোক্তি, আবার পর মুহুর্তে তারা প্রতিমার পূজাও করতে দ্বিধা বোধ করতো না। যেমন “তারা বাধ্য থাকতে অস্বীকার করেছিল, আর যে সব অলৌকিক চিহ্ন তুমি তাদের মধ্যে করেছিলে তাও তারা মনে রাখে নি। তারা একগুঁয়েমি করে আবার গোলামী করতে মিসরে ফিরে যাবার জন্য একজন নেতাকে নিযুক্ত করেছিল। কিন্তু তুমি মাফদানকারী আল্লাহ, দয়াময় ও মমতায় পূর্ণ; তুমি সহজে অসন্তুষ্ট হও না এবং তোমার মহব্বতের সীমা–পরিসীমা নেই। তাই তুমি তাদের ত্যাগ কর নি। এমন কি, তারা নিজেদের জন্য ছাঁচে ফেলে একটা বাছুরের মূর্তি তৈরী করে বলেছিল, ‘ইনিই তোমাদের আল্লাহ; মিসর দেশ থেকে ইনিই তোমাদের বের করে এনেছেন।’ এভাবে যখন তারা তোমাকে ভীষণ কুফরী করেছিল তখনও তোমার প্রচুর মমতার জন্য তুমি মরুভূমিতে তাদের ত্যাগ কর নি। দিনের বেলায় তাদের চালিয়ে নেবার জন্য মেঘের থাম এবং রাতে তাদের যাওয়ার পথে আলো দেবার জন্য আগুনের থাম তাদের কাছ থেকে সরে যায় নি” (৯ : ১৭–১৯ )। কিতাবুল মোকাদ্দস নিয়ে অধ্যয়ন করা হলে মানবজাতির ইতিহাস দেখা যাবে কেবল বৈচিত্রেপূর্ণ। একটি প্রবাদ বাক্য রয়েছে, কাক যখন গাব খায় তখন গাবের বীজ গিলে ফেলে। পরিশেষে গাবের বীজ পায়ুপথ দিয়ে পেট থেকে বের হতে বেশ কষ্ট্ই হয়। তখন প্রতিজ্ঞা করে, আর গাব খাব না। যখনই গাবের জীবন পায়ুপথ দিয়ে পেট থেকে বের হয়ে যেত, অমনি সুর বদলে দিত, “গাব খাব না খাব কি, গাবের তুল্য মজা কি?”
পাপাচারে মানুষ যখন লিপ্ত হয় তখন তার হুসজ্ঞান আর থাকে না। পাপের প্রতিফল ব্যক্তি যখন চরমভাবে ভোগতে থাকে তখন হৃদয়ে অনুশোচনা কাজ করতে থাকে, অপঘাতের হাত থেকে মুক্তি লাভের জন্য, সাধ্যমত প্রচেষ্টা চালাতে থাকে। কখনো কখনো নিঃশ্ব কপর্দকশুণ্য হয়ে পড়ে; অসহ্য যন্ত্রনার কবল থেকে বাঁচার জন্য মাবুদের কাছে মাগফেরাত কামনা করে। মাবুদ ক্রোধে ধীর, দয়াতে মহান। তিনি নিত্য অনুযোগ করেন না। মাবুদ সাথে সাথে অনুতপ্ত ব্যক্তিকে ক্ষমা করে দেন, পুনরায় তাকে সুযোগ সৃষ্টি করে দেন যেন মাবুদের নির্দেশিত পথে চলতে পারে।
দেখা গেছে, মানুষের মধ্যে পাপ অপরাধ এবং তওবা অনুশোচনা পর্যায়ক্রমে চলত থাকে। যেহেতু পাপ স্বভাব তার হৃদয়ে ইবলিস কর্তৃক বুনে দেয়া হয়েছে তাই যথাযোগ্য পরিবেশ পরিস্থিতি পাবার সাথে সাথে হৃদয়ে কুডাক ডেকে ওঠে। চুলকানি বা এলার্জীর মত মন্দস্বভাব ভিতরে থাকে, কখনো শুপ্তাকারে আবার ঢোলের আওয়াজ পাবার সাথে সাথে জাগ্রত ও ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে।
মাবুদ মানুষের এহেন করুণ অবস্থা বুঝতে পারেন বিধায় তিনি প্রতিজ্ঞা করেছেন, আমাদের কলুষিত হৃদয় পরিবর্তন করে হেথা তাঁর পূতপবিত্র স্নেহমাখা হৃদয় পুনস্থাপন করবেন। “আমি তোমাদের ভিতরে নতুন দিল ও নতুন মন দেব; আমি তোমাদের কঠিন দিল দূর করে নরম দিল দেব” (যিহিষ্কেল ৩৬ : ২৬), “হে আল্লাহ, তুমি আমার মদ্যে খাঁটি অন্তর সৃষ্টি কর; আমার মন আবার স্থির কর” (আল–জবুর ৫১ : ১০), “তোমরাই যে মসিহের লেখা চিঠি আর আমাদের কাজের ফল তা পরিষ্কার দেখা যায়। এই চিঠি কালি দিয়ে লেখা হয় নি বরং জীবন্ত আল্লাহর রূহ দিয়েই লেখা হয়েছে। এটা কোন পাথরের ফলকের উপরে লেখা হয় নি, মানুষের দিলের উপরেই তা লেখা হয়েছে।” (২করিন্থীয় ৩ : ৩), “আমি তাদের এমন মন ও স্বভাব দেব যা কেবল আমারই দিকে আসক্ত থাকবে; তাতে তারা তাদের নিজেদের ও তাদের পরে তাদের ছেলেমেয়েদের উপকারের জন্য সব সময় আমাকে ভয় করবে” (ইয়ারমিয়া ৩২ : ৩৯)।
বাস্তবিক ক্ষেত্রে একই বীজ বপন করা হলে উৎপাদিত ফলতো একই হতে বাধ্য, মুলা বীজ বপন করা হলে মুলাই ফলবে, উক্ত বীজের ফসল আর গাজর হবে না। মাবুদ মাওলা সে বিষয়ের উপর গুরুত্বরোপ করেছেন, যেন মানুষের কলুষিত হৃদয় পরিবর্তন করে তাঁর নিজের হৃদয় রোপন করতে পারেন। এই নতুন হৃদয় হলো পাকরূহ, যিনি খোদার গৌরবজনক কাজে মানুষের অন্তরে থেকে সদাসর্বদা প্রেরণা দিয়ে থাকেন। যেমন লেখা আছে, আমরা সকলে খোদার কার্যকরি নানাবিধ সৎকাজের নিমিত্ত সদাপ্রস্তুত থাকতে পারি। “আমরা আল্লাহর হাতের তৈরী। আল্লাহ মসীহ ঈসার সংগে যুক্ত করে আমাদের নতুন করে সৃষ্টি করেছেন যাতে আমরা সৎ কাজ করি। এই সৎ কাজ তিনি আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন, যেন আমরা তা করে জীবন কাটাই” (ইফিষীয় ২ : ১০)।
মাবুদের সন্তানগণ যখন একই হৃদয় প্রাপ্ত হয় তখন তারা সকলে একই পথে চলতে থাকে অর্থাৎ খোদার পথে স্থীর থাকে। বাস্তবক্ষেত্রে দেখা যা, নিজেদের খোদার খাদেম বলে দাবি করেও নিজেদের মধ্যে জঘণ্য বৈষম্য সৃষ্টি করে রেখেছে, তাতে অনুমীত হয়, তারা মুখে এক কথা বলে আর তাদের হৃদয়ে থাকে বিপরীত কিছু। গোটা বিশ^ আজ চরমভাবে কলহে লিপ্ত হয়ে আছে। মানবতা বিনাশী যুদ্ধ পরিবার থেকে শুরু করে দেশে দেশে অমানবীয়ভাবে চালানো হচ্ছে; নিকেশ তো মানব নিধন ছাড়া আর কি?
মানুষ মানুষের জানের দুষমণ, এ কথা কেমন করে মেনে নেয়া চলে? আমরা কি পেরেছি অন্ধকার যুগ অতিক্রম করতে? প্রশ্নই জাগে না।
ধর্মীয় ফতোয়া বলুন আর সামাজিক সভ্যতার মতবাদ বলুন, যে সরিষার মধ্যে ভুতের আছর পড়েছে, উক্ত সরিষা দিয়ে ভুত তাড়াবেন কি করে। প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যে রয়েছে দেহ, দেহের কামনা, চোখের লোভ আর সাংসারিক বিষয়ের অহংকার মানুষের বিবেক অসাড় করে রেখেছে। কোনো ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয় নিজেকে পুনর্গঠন দেয়া। পাত কুপে পতিত ব্যক্তি নিজকে নিজে কেমন করে তুলে আনবে বা মুক্ত হবে। অবশ্যই কুয়োর বাহিরে যে আছে তাকে এগিয়ে আসতে হবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে। আদম জাতি পাপের পাত কুয়ায় ফেসে আছে; তারা নিজেরা নিজেদের তুলে আনতে সম্পূর্ণ অক্ষম। তথা কথিত কতিপয় ধর্ম নেতা, পতিত ব্যক্তিদের পাপের কবল থেকে অবমুক্ত করার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ফিরছে। মানুষের পাপের ঋণ পরিশোধ দেবার মত কোনো উপায় নেই গুনাহগার মানুষের হাতে। চাই সম্পূর্ণ এক বেগুনাহ ব্যক্তি যিনি ঐশি প্রাধিকার বলে তাদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত শোধ দেবার জন্য রাজী হবেন। ঐশি তনয় খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসীহ হলেন তেমন একক ব্যক্তি যিনি ধুলির ধরণীতে নেমে এসেছেন খোদার মেষ হিসেবে, মানুষের বিকল্প কোরবানি হবার জন্য। “কিন্তু মসীহ ঈসা মানুষকে গুনাহের হাত থেকে মুক্ত করবার ব্যবস্থা করেছেন এবং সেই মুক্তির মধ্য দিয়েই রহমতের দান হিসাবে ঈমানদারদের ধার্মিক বলে গ্রহণ করা হয়। আল্লাহ প্রকাশ করেছিলেন যে, যারা ঈমান আনে তাদের জন্য ঈসা মসীহ তাঁর রক্তের দ্বারা, অর্থাৎ তাঁর জীবন–কোরবানীর দ্বারা তাঁকে সন্তুষ্ট করেছেন। এভাবে আল্লাহ দেখিয়েছেন, যদিও তিনি তাঁর সহ্যগুণের জন্য মানুষের আগেকার গুনাহের শাস্তি দেন নি তবুও তিনি ন্যায়বান। তিনি যে ন্যায়বান তা তিনি এখন দেখিয়েছেন যেন প্রমাণ হয় যে, তিনি নিজে ন্যায়বান এবং যে কেউ ঈসার উপর ঈমান আনে তাকেও তিনি ধার্মিক বলে গ্রহণ করেন” (রোমীয় ৩ : ২৪–২৬), “মসিহও গুনাহের জন্য একবার মরেছিলেন। আল্লাহর কাছে আমাদের নিয়ে যাবার জন্য সেই নির্দোষ লোকটি গুনাহগারদের জন্য, অর্থাৎ আমাদের জন্য মরেছিলেন। শরীরে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল, কিন্তু রূহে তাঁকে জীবিত করা হয়েছিল এবং তিনি বন্দী রূহদের কাছে গিয়ে প্রচার করেছিলেন” (১ম পিতর ৩ : ১৮)।
কালামের আলোকে মানুষ মানুষের উপর নির্ভর করতে না পারলেও অনায়াসে মাবুদের উপর নির্ভর করতে পারে। মানুষ প্রতিজ্ঞা রাখে না বা স্থির থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু খোদার কথা আদিকাল থেকে অনন্ত কাল পর্যন্ত একই থাকবে। “আল্লাহ তো মানুষ নন যে মিথ্যা বলবে; মানুষ থেকে তাঁর জন্মও নয় যে, মন বদলাবেন। তিনি যা বলেন করেনও তা, তাঁর ওয়াদা তিনি সর্বদা পূর্ণ করেন” (গণনা পুস্তক ২৩ : ১৯)।
“মেঘের মত করে তোমার সব অন্যায় আর সকাল বেলার কুয়াশার মত করে তোমার সব গুনাহ্ আমি দূর করে দিয়েছি। তুমি আমার কাছে ফিরে এস, কারণ আমিই তোমাকে মুক্ত করেছি” (ইশাইয়া ৪৪ : ২২)। “দুষ্ট লোক তার পথ ত্যাগ করুক আর খারাপ লোক তার সব চিন্তা ত্যাগ করুক। সে মাবুদের দিকে ফিরুক, তাতে তিনি তার উপর মমতা করবেন; আমাদের আল্লাহ্র দিকে ফিরুক, কারণ তিনি সম্পূর্ণভাবেই মাফ করবেন” (ইশাইয়া ৫৫ : ৭)। “নিজের প্রতিবেশীকে এবং নিজের ভাইকে কেউ এই বলে আর কখনও শিক্ষা দেবে না, ‘মাবুদকে চিনতে শেখ,’ কারণ সবাই আমাকে চিনবে সেজন্য আমি তাদের অন্যায় মাফ করব, তাদের গুনাহ আর কখনও মনে রাখব না। আমি মাবুদ এই কথা বলছি (ইয়ারমিয়া ৩১ : ৩৪)। “তোমার মত আল্লাহ আর কেউ নেই যিনি তাঁর বেঁচে থাকা লোকদের গুনাহ ও অন্যায় মাফ করে দেন। তুমি চিরকাল রাগ পুষে রাখ না বরং তোমার অটল মহব্বত দেখাতে আনন্দ পাও। তুমি আবার আমাদের উপর মমতা করবে; তুমি আমাদের সব গুনাহ পায়ের তলায় মাড়াবে এবং আমাদের সব অন্যায় সাগরের গভীর পানিতে ফেলে দেবে” (মিকাহ ৭ : ১৮–১৯)।


