রাজধানীর নিত্যপণ্যের মূল্য নির্ধারণে সবচেয়ে প্রভাবশালী পাইকারি বাজার হিসেবে পরিচিত কাওরানবাজার। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন শত শত ট্রাক সবজি, মাছ, ফল, চাল–ডালসহ প্রয়োজনীয় পণ্য নিয়ে আসে এই বাজারে। এখান থেকেই খুচরা বাজারে ছড়িয়ে পড়ে দ্রব্য, আর এখানকার দরেই অনেকটা ঠিক হয় সারা শহরের মূল্য। অথচ অভিযোগ– এই গুরুত্বপূর্ণ বাজার এখন চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে এক রকম ‘স্বর্গরাজ্যে’ পরিণত হয়েছে। ব্যবসায়ী ও স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রতিদিন সাধারণ আড়তদার, পরিবহন শ্রমিক, দোকানদার ও হকারদের কাছ থেকে আদায় করা হয় প্রায় অর্ধকোটি টাকা। এই টাকার বড় অংশ ভাগ হয়ে যায় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাকর্মী, কিছু অসাধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং প্রভাবশালী মহলের হাতে। ফলে পণ্যের প্রকৃত দামের সাথে যুক্ত হচ্ছে অতিরিক্ত ‘চাঁদা খরচ’, যা শেষ পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে ভোক্তাদেরই।
সংঘর্ষ, দখল ও রক্তপাত
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাজারের নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে কয়েক দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। গুলিতে নিহত হন সাবেক বিএনপি নেতা আজিজুর রহমান মোসাব্বির ওরফে মুসাব্বির, আহত হন আরো কয়েকজন। এরপর গোয়েন্দা সংস্থাগুলো চাঁদাবাজদের তালিকা ও নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করতে মাঠে নামে।
‘ধাপে ধাপে’ চাঁদা
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বাজারের প্রতিটি আড়ত, ফুটপাথ, ট্রাকস্ট্যান্ড, মাছের আড়ত– সবকিছুই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। পুরো এলাকাকে ১০–১২টি জোনে ভাগ করে প্রতিরাতে টাকা তোলা হয়। কোনো ব্যবসায়ীই বাদ যান না। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ট্রাক এসে মাল আনলোড করা, আড়তে তোলা, সেখান থেকে খুচরা বিক্রেতার গাড়িতে লোড– প্রতিটি ধাপেই আলাদা চাঁদা। এমনকি বাজার থেকে পণ্য বের করতেও দিতে হয় অতিরিক্ত টাকা। ব্যবসায়ীদের ভাষায়, ‘এক ইঞ্চি জায়গা ব্যবহার করলেও চাঁদা দিতে হয়।’ এই বাড়তি ব্যয়ের অজুহাতে পাইকারি সিন্ডিকেট পরে পণ্যের দাম কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে কাগজে–কলমে বাজারে সরবরাহ ঠিক থাকলেও নিয়ন্ত্রণে আসে না মূল্যস্ফীতি।
রাজনৈতিক পালাবদল, চাঁদাবাজি অপরিবর্তিত
স্থানীয়দের অভিযোগ, আগে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বাজার নিয়ন্ত্রণ করলেও গণ–অভ্যুত্থানের পর সেই জায়গা দখল করেছে বিএনপির একাধিক গ্রুপ। অর্থাৎ দল বদলেছে, কিন্তু চাঁদাবাজির ধরন বদলায়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় সিন্ডিকেট আরো বেপরোয়া হয়েছে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বাজার নিয়ন্ত্রণে জড়িত একাধিক বিএনপি–ঘনিষ্ঠ নেতা, লাইনম্যান ও স্থানীয় প্রভাবশালীর নাম উঠে এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে আড়ত, ফুটপাথ, ট্রাকস্ট্যান্ড, সিএনজি ও মাইক্রোস্ট্যান্ড, মাছের বাজার– সব জায়গা থেকে নিয়মিত টাকা তোলার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি একজন প্রভাবশালী সাংবাদিকের বিরুদ্ধেও অভিযোগ– তিনি এসব চক্রকে ‘শেল্টার’ দিয়ে পুলিশ ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের থেকে রক্ষা করেন।
কোথায় কত টাকা
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়– পেট্রোবাংলার সামনে সিএনজি স্ট্যান্ড থেকে প্রতিদিন প্রায় ৩০ হাজার টাকা; একুশে টিভির সামনের মাইক্রোস্ট্যান্ডে গাড়িপ্রতি ১,৮০০ টাকা করে, প্রতিদিন প্রায় ৩৬ হাজার; কয়েকটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের গাড়ি থেকে মাসে লাখ টাকার বেশি; ফুটপাথের ছয়টি লাইনে প্রতি রাতে প্রায় ৩০ হাজার, মাসে প্রায় ৯ লাখ; ২ নম্বর সুপার মার্কেটের পাশের ১৫০টি আড়ত থেকে ঘরপ্রতি চার হাজার, মাসে প্রায় ১৮ লাখ ট্রাকপ্রতি ৪০০–৫০০ টাকা করে রাতভিত্তিক তোলা; ডিআইটি মার্কেটের আশপাশ, পার্কিং, চায়ের দোকান, সিঁড়ির নিচের দোকান, সবখানেই নির্দিষ্ট হারে মাসিক চাঁদা; মাছের আড়তে শ্রমিক, বরফ, লোড–আনলোড, অবৈধ দোকান, সবকিছুতেই আলাদা টাকা। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, শুধু মাছের বাজার থেকেই প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা তোলা হয়।
‘সবার ভাগ আছে’
অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু পুলিশ সদস্য, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতাদের মাসিক নির্দিষ্ট অঙ্ক পৌঁছে দেয়া হয়। ফলে অভিযোগ করলেও প্রতিকার মেলে না। অনেকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক থেকে বলেন, ‘চাঁদা না দিলে ব্যবসা করা যায় না, উল্টো হয়রানি শুরু হয়।’
প্রশাসনের বক্তব্য
অভিযুক্তদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, কাওরানবাজারে চাঁদাবাজি বহু পুরনো সমস্যা। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনেক সময় পুলিশ কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারে না। তবে শক্ত রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে অল্প সময়েই বাজারকে চাঁদাবাজমুক্ত করা সম্ভব।
শেষ কথা
রাজধানীর নিত্যপণ্যের ‘হৃৎপিণ্ড’ যদি চাঁদাবাজির কবলে থাকে, তাহলে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ কেবল কাগুজে প্রতিশ্রুতি হয়ে থাকবে। কাওরানবাজারে সিন্ডিকেট ভাঙা না গেলে ভোক্তাদের পকেট কাটা বন্ধ হবে না– এমনটাই মনে করছেন ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকরা। এখন প্রশ্ন একটাই– সরকার কি সত্যিই এই ‘স্বর্গরাজ্য’ ভেঙে সাধারণ মানুষের বাজার ফিরিয়ে দিতে পারবে?



