বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের যে প্রক্রিয়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শুরু হয়েছিল, তাতে হঠাৎ এক ধরনের নেতিবাচক পরিবর্তনের আভাস মিলছে। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদ থেকে পেশাদার অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুরকে যেভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং একজন ব্যবসায়ী ও হিসাববিদকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তা যে বিস্ময় জাগাচ্ছে; তেমনি দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করছে। গভর্নর হওয়ার পর ড. মনসুর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা, ব্যাংক কোম্পানি আইনের পরিবর্তন এবং খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার মতো বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তাঁর কর্মপদ্ধতি নিয়ে দ্বিমত থাকতে পারে, কিন্তু তাঁর পেশাদারিত্ব ও আইএমএফের মতো সংস্থায় কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ খুবই কম। দুঃখজনক হলো– সংস্কারগুলো যখন শুরু হলো, তখন প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকে এক ধরনের শক্তিশালী প্রতিরোধ তৈরি করা হয়েছে। সরকারি চাকরির যে নির্দিষ্ট শৃঙ্খলা থাকে, তাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ক্ষেত্রবিশেষে ‘মব’ বা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টাও আমরা দেখলাম গতকালের ঘটনায়। বাংলাদেশে কর ও ব্যাংকিং খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ‘সংস্কারবিরোধী গোষ্ঠী’ সক্রিয়।
এই গোষ্ঠীর মধ্যে অসাধু ব্যবসায়ী, আমলাতন্ত্রের একটি অংশ এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তি মিলেমিশে থাকে। ব্যাংকিং খাতের সংস্কারগুলো মূলত এই কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর ওপর আঘাত করেছিল। ফলে তারা একজোট হয়ে এই পরিবর্তনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম, বর্তমান সরকার অতীতের সেই দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসবে এবং পেশাদার ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রাখবে। এ প্রত্যাশা আরও জোরালো হয়েছিল যখন নির্বাচনের আগে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপির উচ্চ পদের নেতারাই জনগণকে আশ্বাস দিয়েছিলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো পেশাদার ব্যক্তিদের দ্বারা স্বাধীনভাবে চলতে দেবেন এবং রাজনীতিকীকরণ করা হবে না। কিন্তু পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, আমরা আবার সেই রাজনৈতিক ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট বলয়ের মধ্যেই ঢুকে পড়ছি। শ্রীলঙ্কা বা নেপালের মতো দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরদের যোগ্যতা উচ্চ পর্যায়ের। ড. মনসুর ছিলেন তুলনামূলকভাবে যোগ্য ও পেশাদার। তাঁকে সরিয়ে দেওয়া এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে ‘মব কালচার’ সৃষ্টির পর ভবিষ্যতে কোনো দক্ষ ও অভিজ্ঞ পেশাদার ব্যক্তি এ ধরনের দায়িত্বে আসতে চাইবেন কিনা, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এই অস্থিরতা আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিরূপ প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা যদি ব্যাংকিং খাতের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেন, তবে পুরো অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। সরকারের পক্ষ থেকে এটি স্পষ্ট করা উচিত, কোন প্রক্রিয়ায় একজন অর্থনীতিবিদকে বিদায় করা হলো এবং কীসের ভিত্তিতে নতুন গভর্নরকে নিয়োগ দেওয়া হলো। সংস্কারের পথে হাঁটতে গিয়ে যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব থাকে, তবে সংস্কারবিরোধী গোষ্ঠীর জয় হবে এবং দেশ পিছিয়ে যাবে। আমরা পিছিয়ে যাওয়ার এই আশঙ্কা থেকে দ্রুত মুক্তি চাই এবং ব্যাংকিং খাতে সত্যিকার পেশাদারিত্বের প্রতিফলন দেখতে চাই। নতুন গভর্নর হিসেবে যাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাঁর নিয়োগ প্রক্রিয়া ও পটভূমি নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের উদয় হয়েছে। বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে দেখছি, গত বছরই তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠানের একটি বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ পুনঃতপশিল করেছেন। যিনি নিজে ঋণখেলাপি ছিলেন বা যাঁর প্রতিষ্ঠান এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত, তিনি কীভাবে অন্য ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবেন? এ ধরনের পদে যখন এমন কাউকে বসানো হয়, তখন পুরো ব্যাংকিং খাতের সংস্কার প্রচেষ্টাই বড় ধরনের হোঁচট খায়।



