রপ্তানি আয়ের শীর্ষস্থানে থাকা বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের চাহিদা বিশ্ববাজারে নানা কারণে কমছে। এর পেছনে বড় কারণ, ট্রাম্প সরকারের বাড়তি শুল্কারোপ ও মূল্যস্ফীতি। বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোতে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ক্রেতাদের ব্যয় সংকুচিত হচ্ছে। চাহিদা থাকলেও প্রয়োজনের বাইরে বাড়তি খরচ করতে নারাজ তারা। এমন পরিস্থিতিতে হাত গুটিয়ে বসে না থেকে নতুন সরকারের প্রতি কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন নতুন বাজার খোঁজার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সেই সঙ্গে দেশে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি ও ব্যবসায়ীদের জন্য নীতিসহায়তা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশি পোশাকের দীর্ঘদিনের বড় বাজার হচ্ছে ইউরোপের দেশগুলো। অথচ এ বাজারেই ধাক্কা লেগেছে, যার প্রভাব পড়েছে পুরো রপ্তানির ওপর। অন্যদিকে ট্রাম্প সরকারের বর্ধিত শুল্কারোপে চাহিদা কমছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে। নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান আমাদের সময়কে বলেন, নতুন সরকারের প্রথমেই উচিত হবে কূটনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করা।
পাশাপাশি নতুন নতুন বাজার খুঁজতে ব্যবসায়ীদের সহায়তা করা এবং সরকারের পক্ষ থেকে নীতিসহায়তা বৃদ্ধি করা। সম্প্রতি প্রকাশিত ইউরোপীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের মতে, ২০২১–২০২৫ সালে ইইউ পোশাক আমদানি বাজার সম্প্রসারিত হয়েছে, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে প্রবৃদ্ধি স্পষ্টতই ধীর হয়ে গেছে। গেল দুই বছরের পরিসংখ্যান খুব একটা চিত্তাকর্ষক নয়। ২০২৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিশ্ব থেকে ইইউর পোশাক আমদানি মাত্র ২.১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, ৮৮.১৫ বিলিয়ন ইউরো থেকে ৯০ বিলিয়ন ইউরোতে। চীন থেকে আমদানি সামান্য ১.১৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, ২৬.২৭ বিলিয়ন ইউরো থেকে ২৬.৫৮ বিলিয়ন ইউরোতে; সেখানে বাংলাদেশ থেকে আমদানি ৫.৯৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ের মধ্যে তুরস্ক থেকে আমদানি ১০.৭৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। তবে ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের দীর্ঘ সময় ধরে চিত্রটি ভিন্ন। বিশ্ব থেকে ইইউর পোশাক আমদানি ৭২.২৫ বিলিয়ন ইউরো থেকে বেড়ে ৯০ বিলিয়ন ইউরো হয়েছে, যা ২৪.৫৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সময়ে চীন থেকে আমদানি ২১.৪৮ শতাংশ (২১.৮৮ বিলিয়ন ইউরো থেকে ২৬.৫৮ বিলিয়ন ইউরো), বাংলাদেশ থেকে ৩৫.৮১ শতাংশ (১৪.৩০ বিলিয়ন ইউরো থেকে ১৯.৪১ বিলিয়ন ইউরো) এবং ভারত থেকে ৩৩.১৮ শতাংশ (৩.৪০ বিলিয়ন ইউরো থেকে ৪.৫২ বিলিয়ন ইউরো) বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে তুরস্ক থেকে আমদানি ৯.৪৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা ২০২১ সালে ৯.২২ বিলিয়ন ইউরো থেকে ২০২৫ সালে ৮.৩৪ বিলিয়ন ইউরোতে দাঁড়িয়েছে। জানা গেছে, ২০২৫ সালের পুরো বছরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পোশাক বাজারে সামান্য প্রবৃদ্ধি থাকলেও বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে ধাক্কা লেগেছে।
ইউরোস্ট্যাটের মতে, ডিসেম্বর ২০২৪–এর তুলনায় ডিসেম্বর ২০২৫–এ ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট পোশাক আমদানির মূল্য কমেছে ২.২৭ শতাংশ। পুরো বছরের হিসাবে বাজার ২.১০ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু ডিসেম্বরের পতন দেখাচ্ছে বছরের শেষভাগে চাহিদা কমেছে এবং দামের ওপর তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নিম্নগতি সাময়িক না দীর্ঘস্থায়ী, তা নির্ভর করবে ইউরোপের ভোক্তা ব্যয়ের প্রবণতার ওপর। শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, বছরের শেষ প্রান্তিকে ইউরোপীয় খুচরা বিক্রেতারা মজুদ সমন্বয়ে মনোযোগ দেন। উৎসব–পরবর্তী বিক্রয় কমে যাওয়া এবং ভোক্তাদের ব্যয়সংকোচন এতে প্রভাব ফেলেছে। ফলে নতুন অর্ডারে দামে চাপ বেড়েছে। ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) অঞ্চলে তৈরি পোশাক আমদানি ২.১০ শতাংশ বেড়ে মোট ৯০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। এ প্রবৃদ্ধির পেছনে মূল চালিকাশক্তি ছিল আমদানির পরিমাণে (মিলিয়ন কেজি) ১৩.৭৮ শতাংশ বৃদ্ধি।
তবে একই সময়ে গড় একক মূল্য (ইউরো/কেজি) ১০.২৭ শতাংশ কমেছে, যা বাজারে মূল্যচাপের ইঙ্গিত দেয়। অন্য প্রধান রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যেও সার্বিকভাবে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। চীন ইইউতে ২৬.৫৮ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১.১৭ শতাংশ বেশি। দেশটির রপ্তানি পরিমাণ ১১.৬৪ শতাংশ বেড়েছে, যদিও একক মূল্য ৯.৩৮ শতাংশ কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় বাজারে চীনের কৌশলগত মনোযোগ বৃদ্ধির প্রতিফলন এতে স্পষ্ট। ভারত, পাকিস্তান ও কম্বোডিয়াও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। ভিয়েতনাম ৯.৬৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে ৪.৩৮ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি করেছে এবং দেশটির একক মূল্য ৪.৫১ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে তুরস্কের রপ্তানি ১০.৭৩ শতাংশ কমে ৮.৩৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের পরিমাণ বাড়লেও ইউনিট প্রাইস কমে যাওয়ায় প্রকৃত আয় প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি।
ইইউ বাজারে সার্বিক আমদানি বেড়েছে, কিন্তু মূল্য হ্রাসের কারণে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়েছে। এখন উচ্চমূল্যের পণ্য, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বাজার বৈচিত্র্যকরণের দিকে আরও জোর দিতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে শীর্ষ সরবরাহকারী চীন। ডিসেম্বর মাসে দেশটির ক্ষেত্রেও দামে চাপ ছিল। বেশি পরিমাণ সরবরাহের কৌশল অব্যাহত থাকলেও গড় একক দাম কমেছে। এতে বোঝা যায়, বাজার ধরে রাখতে চীনও দামে সমন্বয় করেছে। তুরস্কের ক্ষেত্রে পতন আরও প্রকট। দেশটির রপ্তানি মূল্য দুই অঙ্কে কমেছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও দামের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া এর কারণ বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীলতা দেখাতে সক্ষম হয়েছে। ভারত ও পাকিস্তান সীমিত প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে।



