পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার চর মোন্তাজ ঘাট। বুড়াগৌরাঙ্গ নদীর পূর্বপাড়ে ২০২১ সালে চালু হয়েছে লঞ্চঘাট। আর পশ্চিম পাড়ে তপসীর চর। উপকূলীয় এলাকায় তপসীর চরের মতো অসংখ্য চর আছে। যেখানে এখনো মনুষ্য বসতি শুরু করার মতো পরিস্থিতি হয়নি। জোয়ারের পানির উৎপাতে এখনো মানুষ এসব চরে ঘরবাড়ি করতে পারছে না। সাথে বন বিভাগের বিধিনিষেধ তো আছেই। তপসীর চরের পশ্চিম পাড়ে আগুন মুখা নদী। নদী পেরিয়ে ২০২২ সালে চর তুফানিয়া গিয়েছিলাম। তখন সকাল বেলায় রওনা হয়েছিলাম তাই মাছ ধরার দৃশ্য ততটা চোখে পড়েনি, যেমনটা এবার চোখে পড়ল। কেওড়ার মতোই উপকূলীয় বনের ফল ছৈলা। ছৈলা ফল পাকলে মানুষ খায়। দেখতে কাঁচা টমেটোর মতো। এই ছৈলা ফলের সন্ধানেই এবার মায়া চর ও মেছেরের চর থেকে ফেরার সময় চর হেয়ার হয়ে এলাম এ তপসীর চরে। তিন কিলোমিটার লম্বা এই তপসীর চরে পৌঁছাতে আমাদের পড়ন্ত বিকেল হয়ে গেল। আমরা দুপুরের খাবার এবং অন্য একটি কাজের জন্য কিছুক্ষণ চর হেয়ারে অবস্থান করতে চেয়েছিলাম। তবে সেখানে ঘটে যাওয়া ছোট্ট একটি দুর্ঘটনা বিলম্ব ঘটায়। চর হেয়ারে আমি ৩০টি নারিকেল গাছ লাগিয়েছিলাম গত সেপ্টেম্বর মাসে।
আগের দিন চর হেয়ারে এসে পৌঁছাই সন্ধ্যার পরে। তাই গাছগুলো দেখা হয়নি। সেই রাতে চর হেয়ারে ট্রলারে রাতযাপন করেছিলাম। তবে রুপার চর, মেছেরের চর হয়ে চর হেয়ারে আসতেই ঘটে যায় বিপত্তি। ট্রলার থেকে লাফিয়ে গোড়ালি ভেজা পানিতে নামতে গিয়ে পা পড়ল পানির নিচে থাকা ফুট দুয়েকের গর্তে। আমার আগে আমাদের নয়া দিগন্তের রাঙ্গাবালী প্রতিনিধি রফিকুল ইসলাম যেখানে লাফ দিয়ে অনায়াসেই পার হয়েছেন আমিও সেখানেই লাফ দিয়েছিলাম। তবে দুই জনের লাফের মাঝে কয়েক মিনিট কেটেছিল আমার অন্য ব্যস্ততায়। এতে ঢেউয়ে ট্রলার সামান্য দূরে সরে যাওয়ায় এই অবস্থার শিকার। আমার পা ওই গর্তে পড়ে যাওয়ায় হারিয়ে ফেলি ভারসাম্য। এতে পানিতে পড়ে পুরো শরীর ভিজে যায়। সাথে মোবাইল ও পাওয়ার ব্যাংক। আমি অতিদ্রুত উঠেই মোবাইল ও পাওয়ার ব্যাংক পকেট থেকে বের করে জেলেদের মাছের কর্কশিটের ওপর শুকাতে দেই। পাশে কয়েকটি ট্রলারে থাকা জেলেরাও এগিয়ে এলেন আমাকে সহায়তা করতে। সাথে আরেক সেট কাপড় ছিল বলে রক্ষা। দ্রুত পরিবর্তন করে নিলাম পোশাক। এতেই মোটামুটি সময় নষ্ট ঘণ্টাখানেক।
যে কারণে কলাগাছিয়ার চর হয়ে তপসীর চরে যেতে যেতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। আগুন মুখা নদীর পূর্ব পাড় দিয়ে কলাগাছিয়ার চরের পশ্চিম পাড় হয়ে আমরা এগোতে থাকি তপসীর চরের দিকে। তপসীর চরের কাছে গিয়েও হতাশ হতে হলো। ভাঙনে ভূমি হারাচ্ছে তপসীর চর। বড় বড় কেওড়া, গেওয়া, বাইন গাছগুলো ভাঙনে উপড়ে পড়ে আছে। অবশ্য পাড়ে ভেঙে পড়া গাছগুলো ঢেউ থেকে আপাতত রক্ষা করছে তপসীর চরের পাড়কে। একটু এগোতেই একটি বড় মরা মহিষকে ভেসে থাকতে দেখলাম চরের পাড়ে। জীবন্ত এই মহিষের দাম দেড় লাখ টাকার উপরে হতো। মাঝি শহীদুল হাওলাদারের মতে, ‘হয়তো বিষাক্ত সাপের কামড়ে মহিষটি মারা গেছে বা রোগাক্রান্ত হয়েও মরতে পারে। এই তপসীর চরে শিয়াল, সাপ, বন্য মহিষ, জনগণের পালিত মহিষ সবই আছে। আর শালিক, ঘুঘু, দোয়েল, বক, কয়েক জাতের মাছরাঙ্গা, পান কৌড়ি, ঈগল, চিল সবকিছুরই দেখা মিলবে। আছে আরো নানান জাতের পাখি ও কিটপতঙ্গ। নিরাপদ বন মানেই এসব পশু পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল। এই তপসীর চরের সামনে ও পেছনের নদীতে মাছ ধরার জন্য রাজধানী ঢাকায় এসে পর্যন্ত তদবির করতে হয়। ২০২৩ সালে ঢাকার এক আওয়ামী লীগের উঠতি নেতার কাছে একজন এসেছিলেন তপসীর চরে মাছ ধরার অনুমতি আদায়ে তদবির করার জন্য। আমরা যখন তপসীর চরে পৌঁছলাম তখন বন লাগোয়া এলাকায় বেশ কয়েকটি ইলিশের জাল ফেলা নৌকার দেখা মিলল। সব নৌকার মাঝি এবং জেলেরা নদীর এই অংশে জাল ফেলেছে। কেউ কিছুক্ষণ আগে জাল ফেলে মাছও ধরেছে। এরপর ফের জাল ফেলেছে পানিতে। মাঝি আবদুর রশীদ জানান, তপসীর চরের এই অংশে প্রচুর ইলিশ মাছ পাওয়া যায়। এ ছাড়া অন্য মাছও ধরা পড়ে। তাই ছোট ট্রলার বা নৌকাওয়ালা জেলেদের প্রিয় এই এলাকা।
আমিও আগে এই এলাকায় মাছ ধরতাম। যোগ করেন, ‘এখন আমি বড় ট্রলারের মালিক। এই আগুন মুখা নদীতে মাছ ধরে আর পোষায় না। তাই চলে যাই গভীর সাগরে। শিপ চর, মায়া চর, তিন চর, লাল চর ও পয়ষট্টির চরের আশে পাশের বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরি।’ তপসীর চরের পূর্ব প্রান্তেও ইলিশের মাছ ধরা জেলে এবং তাদের ব্যস্ততা চোখে পড়ল। ইলিশের সাথে পোয়া, রামচুস, ফাইসা, চডা বাইলাসহ নানান জাতের মাছ ধরা পড়ে। নদীর পাঙ্গাসও পাওয়া যায় এই এলাকায়। তবে এই পাঙ্গাসের পরিমাণ খুবই কম। তপসীর চরের ভেতরে বয়ে গেছে খাল। এই খাল জোয়ার ভাটার পানি উঠা নামার মাধ্যম। এই খালও মাছের ভাণ্ডার। খালে ধরা পড়ে পোয়া, বগনি (দাঁতিনা কোরাল) চডা বাইলা, ফাইসাসহ নানা জাতের মাছ। আবার কাঁকড়া মিলবে তপসীর চরের দুই পাশে। এই এলাকায় মাছ ধরে মান্দা সম্প্রদায়ের লোকজনই। এরা অবশ্য মাছের দাম অন্যদের চেয়ে অত্যধিক বেশি চায়। মাত্রই ধরা একটি ছোট ইলিশ, দু’টি পোয়া, চারটি রামচুস, একটি চডা বাইলার দাম ৫০০ টাকার উপরে চেয়ে বসলো। এর কমে তারা বিক্রিই করবে না। অথচ এগুলোর দাম দুই আড়াইশত টাকার বেশি হবে না। তাই মাছ আর কেনা হলো না। শেষ পর্যন্ত আমরা তপসীর চরের প্রধান খালের পাড়ে পেলাম সেই ছৈলা ফল। একসাথে ৮–১০টি ফল ঝুলে আছে। তবে কাঁচা হওয়ায় খাওয়ার জন্য পাড়তে পারলাম না। সন্ধ্যার ঠিক আগেই আমরা খালের পাড়ে নামলাম বনের ভেতরে যাওয়ার জন্য। কাদা ডিঙ্গিয়ে মহিষের হাঁটা পথ ধরে আমাদের এগোতে হলো। বনের ভেতর থেকে ভেসে আসছিল শিয়ালের ডাক। পাখির ডাকও ভেসে আসছিল। উপকূলীয় কিছু অচেনা পাখির ডাকও ছিল। তখন সূর্য ডুবু ডুবু অবস্থায়। তাই তাড়াতাড়ি বন ছেড়ে ট্রলারে ওঠার সতর্কবার্তা দিচ্ছিলেন মাঝি শহীদুল হাওলাদার। যে কারণে শক্ত চিকন ঘাস আর কাদা ডিঙ্গিয়ে দ্রুতই ফিরতে হলো। এরপর তপসীর চরের উত্তর মাথা দিয়ে বুড়া গৌরাঙ্গ ও আগুন মুখা নদীর মিলনস্থল পেরিয়ে চলে এলাম চর মোন্তাজের স্লুইসের ঘাটে। তবে সেখানে ট্রলার ভেড়ানোর মতো পরিস্থিতি না থাকায় লঞ্চ ঘাটেই ট্রলার ভেড়াতে হলো।



