এদিকে, শীতের রুক্ষ, রিক্ত, হিমেল দিনের অবসান ঘটিয়ে বসন্ত আসার কথা থাকলেও প্রকৃতিতে এখনো শীতের আমেজ সম্পূর্ণ বিদায় নেয়নি। তবুও আজ যেন কীসের শিহরন, অবাক ছোঁয়া, যেন সোঁদা মাটি আর বহেড়া ফুলের গন্ধ মেশানো। হাওয়াটাও আজ যেন কেমন কেমন! একটু এলোমেলো, কবোষ্ণ। পুরো প্রকৃতিতে চলছে ‘মনেতে ফাগুন এলো…’ আবহ। কচি পাতায় আলোর নাচনের মতোই বাঙালি তরুণ মনে লাগে দোলা। হূদয় হয় উচাটন। ‘ফুলের বনে যার পাশে যাই তারেই লাগে ভালো…’ কবিগুরুর এই পুলকিত পঙিক্তমালা হয়তো বসন্তেই সবারই বেশি মনে পড়ে। বসন্ত বাতাসে পুলকিত ভাটিবাংলার কণ্ঠ শাহ আবদুল করিম গেয়ে ওঠেন :‘বসন্ত বাতাসে…সই গো/ বসন্ত বাতাসে/ বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ আমার বাড়ি আসে…।’ ‘শীতের রুক্ষ–রিক্ততা মুছে প্রকৃতিতে বইছে ফাল্গুনী হাওয়া।’ বিপুল ঐশ্বর্যের ঋতু—ঋতুরাজ বসন্তের প্রথম দিন। আজ পয়লা ফাল্গুন। ‘প্রাণে প্রাণে মন্দ্রিত হচ্ছে ‘আকাশে বহিছে প্রেম, নয়নে লাগিল নেশা। কারা যে ডাকিল পিছে! বসন্ত এসে গেছে।’ শীতের রুক্ষ–রিক্ততা মুছে প্রকৃতিতে বইছে ফাল্গুনী হাওয়া। ‘আজি দখিন দুয়ার খোলা/ এসো হে এসো হে এসো হে আমার বসন্ত’—কবি কণ্ঠের এ প্রণতির মাহেন্দ্র লগন এলো। গণমানুষের কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ভাষায় ‘ফুল ফুটুক না ফুটুক/ আজ বসন্ত… গোলাপের সুবাস আজ না ছড়াক/ কুসুমকলি আজ না হোক জীবন, তবু আজ বসন্ত…।’ এমন মধুর সময়ে প্রকৃতি আর প্রাণের আপন উচ্ছ্বাস উৎসবের রঙে ঢঙে মদিরায় মেতে ওঠে। ফুল ফুটবার পুলকিত এই দিনে বন–বনান্তে কাননে কাননে পারিজাতের রঙের কোলাহলে ভরে উঠবে চারদিক। শীতের স্পর্শে ঘুমিয়ে পড়া, বিবর্ণ জারুল–পারুল, মাধবী–মালতি–রজনিগন্ধা, পলাশ–জবা, আম্রমুকুল, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, নাগলিঙ্গম, দোপাটি, কনকচাঁপার গুচ্ছ আড়মোড়া ভেঙে আন্দোলিত হবে দখিনা বাতাসে, নবজীবনের স্পন্দনে।
সেই প্রাচীন প্রাকৃত পেঙ্গলের দিকে তাকালে আমরা দেখব বসন্তরাজের করতলে ভালোবাসার নৈবেদ্য তুলে দিতে কেমন ব্যস্ত কবিরা। বসন্তের বন্দনা করে একটি পঙিক্তও লেখেননি, এমন বাঙালি কবি খুঁজে পাওয়া যাবে না। ভানুসিংহ ঠাকুরের উতলা চিত্তের আকুলতা এমন—‘বসন্ত আওলরে! মধুকর গুনগুন,/ অমুয়া মঞ্জুরী কানন ছাওলরে।/ মরমে বহই বসন্ত সমীরণ, মরমে ফুটই ফুল/ মরমকুঞ্জ’ পর বোলই কুহুকুহু অহরহ কোকিলকুল…।’ আবহমান বাংলার নৈসর্গিক প্রকৃতিতে এখন সাজ সাজ রব। হিমেল পরশে বিবর্ণ প্রকৃতিতে জেগে উঠছে নবীন জীবনের প্রাণোল্ল্লাস। নীল আকাশে সোনা ঝরা আলোকের মতোই হূদয় আন্দোলিত–আলোড়িত–আপ্লুত। আহা! কী আনন্দ আকাশে বাতাসে…। ‘আহা আজি এ বসন্তে/ এত ফুল ফোটে এত বাঁশি বাজে এত পাখি গায়…।’ ফাগুনে আগুন লাগে প্রকৃতিতে। ‘কুঁড়িদের ওষ্ঠপুটে লুটছে হাসি ফুটছে গালে টোল।’ অশোকে–অশ্বত্থে–শিরীষে–শালে–পিয়ালে হাওয়ার নাচন, আলোর কাঁপন যখন তখন মাতামাতির দিন এখন। ‘অতি মঞ্জুল, শুনি মঞ্জুল গুঞ্জন কুঞ্জে, শুনিরে/ শুনি মর্মর পল্লবপুঞ্জে, পিককূজন পুষ্পবনে বিজনে, মৃদু বায়ু হিলোলবিলোল বিভোল বিশাল সরোবর–মাঝে কলগীত সুললিত বাজে/ শ্যামল কান্তার-’পরে অনিল সঞ্চারে ধীরে রে, নদী তীরে শরবনে উঠে ধ্বনি সরসর মর্মর্। কত দিকে কত বাণী, নব নব কত ভাষা, ঝরঝর রসধারা…।’ ঋতুরাজ বসন্তের দিনগুলো অপার্থিব মায়াবী এক আবেশ ঘিরে রইবে বৃক্ষ, লতা, পাখ–পাখালি আর মানুষকে। এ ফাগুন সুখের মতো এক ব্যথা জাগিয়ে দেবে চিত্তে :‘একটুকু ছোঁওয়া লাগে, একটুকু কথা শুনি—/ তাই দিয়ে মনে মনে রচি মম ফাল্গুনী…।’ মন রাঙিয়ে গুনগুন করে অনেকেই গেয়ে উঠবেন—‘মনেতে ফাগুন এলো…।’ অথবা ‘পলাশ ফুটেছে, শিমুল ফুটেছে, এসেছে দারুণ মাস… কৃষ্ণচূড়া লাল হয়েছে ফুলে ফুলে, তুমি আসবে বলে…।’
ঋতুচক্র এখন যেন আর পঞ্জিকার অনুশাসন মানছে না। কুয়াশার চাদরমোড়া শীত তার তীব্রতা ছড়াতে না ছড়াতেই এলো বসন্ত। প্রকৃতির দিকে তাকালে শীত বরষার মতো বসন্তকেও সহজে চেনা যায়। বাঙালির জীবনে বসন্তের উপস্থিতি সেই অনাদিকাল থেকেই। সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শনেও বসন্ত ঠাঁই পেয়েছে নানা অনুপ্রাস, উপমা, উেপ্রক্ষায় নানাভাবে। আমাদের ঋতুরাজ বসন্তের এ সময়ে মানুষের মতোই পাখিরাও প্রণয়ী খোঁজে। বাসা বাঁধে। রচনা করে নতুন পৃথিবী। বাংলা বছরের পক্রিমায় সব শেষে আসে বসন্ত। বসন্ত মানেই পূর্ণতা। বসন্ত মানেই নতুন প্রাণের কলরব। কচিপাতায় আলোর নাচনের মতোই বাঙালির মনেও লাগবে দোলা। বিপুল তরঙ্গ প্রাণে আন্দোলিত হবে বাঙলি মন। বাঙালি জীবনে বসন্তের আগমন বার্তা নিয়ে আসে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’। তিয়াত্তর বছর আগে এ বসন্তেই ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালির স্বাধীনতার বীজ রোপিত হয়েছিল। বসন্তেই বাঙালি মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছিল। দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের দানবীয় প্রতিভূ হাসিনা পতনে জুলাই অভ্যুত্থানের মর্ম প্রেরণা এসেছে বসন্ত আন্দোলন থেকে। তাই কেবল প্রকৃতি আর মনে নয়, বাঙালির জাতীয় ইতিহাসেও বসন্ত আসে এক বিশেষ মাহাত্ম্য নিয়ে। বসন্ত হয়ে উঠেছে এক অনন্য উৎসব। ঋতুরাজ বসন্ত বাঙালি আর বাংলাদেশের মানুষের জীবনে নিয়ে আসে প্রেম ও বিদ্রোহের যুগল আবাহন। এমনই এক বসন্তে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা কারাগারে ‘ধূমকেতু’ প্রকাশের কারণে দেশদ্রোহের অভিযোগে আটকে রেখেছিল বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে। আমাদের চেতনায় ভাস্বর মাতৃভাষার আন্দোলন তুঙ্গে পৌঁছেছিল এই কৃষ্ণচূড়া–পলাশ ফোটার বসন্তকালে। বসন্ত তাই বাঙালির জীবনে বাঁধনহারা হয়ে সৃষ্টির উল্লাসে প্রেমের তরঙ্গে ভাসার সময়। তাই বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় :‘এল খুন মাখা তূণ নিয়ে/ খুনেরা ফাগুন…।’ আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লেখেন, ‘হাসির আঘাতে তার/ মৌন রহে না আর,/ কেঁপে কেঁপে ওঠে খনে খনে।’ এখন শহরের যান্ত্রিকার আবেগহীন সময়ে বসন্ত যেন কেবল বৃক্ষেরই, মানুষের আবেগে নাড়া দেয় কমই। তার পরও আজ বসন্তের পয়লা দিনে অনুষ্ঠানমালার আয়োজন হবে ঢাকায়। পাতার আড়ালে লুকানো কোকিলের কুহুতান ব্যাকুল করবে অনেক বিরহী অন্তর। কবি মনের অনুরাগ ছড়াবে—‘সে কি আমায় নেবে চিনে/ এই নব ফাল্গুনের দিনে…।’



