ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর দক্ষিণ এশিয়ার ভূ–রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ দুই দশক পর ক্ষমতায় ফেরা বিএনপির চেয়ারম্যান ও হবু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে টেলিফোন করে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এই ফোনালাপকে দুই দেশের ঐতিহাসিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের এক নতুন মাইলফলক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অভাবনীয় সাফল্যের পর বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। শুক্রবার দুপুরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডলে এই শুভেচ্ছাবার্তার তথ্য প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি তারেক রহমানের নেতৃত্ব ও বাংলাদেশের মানুষের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর বার্তায় লিখেছেন, “তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। বাংলাদেশের নির্বাচনে তাঁর দলের এই ঐতিহাসিক বিজয়ের জন্য আমি তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছি।
বাংলাদেশের জনগণের আশা–আকাঙ্ক্ষা পূরণে তাঁর যে প্রচেষ্টা, তার প্রতি ভারতের পূর্ণ সমর্থন ও শুভকামনা থাকবে।” দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ওপর জোর দিয়ে মোদি আরও বলেন, “আমরা দুই প্রতিবেশী দেশ গভীর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনে আবদ্ধ। দুই দেশের মানুষের শান্তি, প্রগতি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে ভারত তার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করছে। আমি আমাদের এই বহুমাত্রিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে এবং অভিন্ন লক্ষ্যগুলো অর্জনে তারেক রহমানের সঙ্গে একযোগে কাজ করার প্রত্যাশা করি।” গতকাল বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি ও তার জোটভুক্ত দলগুলো ২১২টি আসনে জয়লাভ করে দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত ২৯৭টি আসনের ফলাফল অনুযায়ী: বিএনপি ও মিত্র ২১২ আসন। ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য (জামায়াত ও এনসিপি) ৭৭ আসন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১ আসন। স্বতন্ত্র ৭ আসন। আইনি জটিলতার কারণে চট্টগ্রাম–২ ও চট্টগ্রাম–৪ আসনের ফলাফল স্থগিত রয়েছে। এছাড়া শেরপুর–৩ আসনে জামায়াত প্রার্থীর মৃত্যুতে ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়।
এই বিপুল বিজয়ের মধ্য দিয়ে তারেক রহমান বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছেন—যা বিএনপি আগেই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মোদির এই আগাম অভিনন্দন দিল্লির ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ বা প্রতিবেশী প্রথম নীতিরই অংশ। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে যে স্নায়ুযুদ্ধ বা অস্বস্তি বিরাজ করছিল, মোদির এই ফোনের মাধ্যমে তার অবসান ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, একটি গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে ভারত সবসময়ই আগ্রহী। তারেক রহমানের সঙ্গে এই ফোনালাপ মূলত দিল্লির পক্ষ থেকে একটি শক্তিশালী ইতিবাচক সংকেত, যা ভবিষ্যতে সীমান্ত নিরাপত্তা, কানেক্টিভিটি এবং জ্বালানি বাণিজ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে দুই দেশের সহযোগিতা বৃদ্ধি করবে। নির্বাচনের আগে থেকেই তারেক রহমান আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের নতুন ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে সচেষ্ট ছিলেন।
তিনি বারবার ‘প্রতিশোধের রাজনীতি’ পরিহার করে ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। দিল্লির এই সরাসরি অভিনন্দন তাঁর সেই রাজনৈতিক অবস্থানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবেই দেখছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা। বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারেক রহমানও ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন এবং ভবিষ্যতে দুই দেশের জনগণের স্বার্থে পারস্পরিক সম্মান ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়, বরং পুরো দক্ষিণ এশিয়ার ভূ–রাজনীতিতে পরিবর্তনের হাওয়া নিয়ে এসেছে। নরেন্দ্র মোদির অভিনন্দন বার্তা সেই পরিবর্তনের পালে নতুন হাওয়া যোগ করল। এখন দেখার বিষয়, নতুন সরকার ও দিল্লি প্রশাসন দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যুগুলো (যেমন– তিস্তা চুক্তি বা সীমান্ত হত্যা) সমাধানে কতটুকু কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে।



