চলতি সপ্তাহেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে নবনির্বাচিত সরকার। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের মুহূর্তে দেশের অর্থনীতির চিত্র মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা, বেকারত্ব, অস্বাভাবিক খেলাপি ঋণ ও দুর্বল ব্যাংকিং খাত– সব মিলিয়ে অর্থনীতি নানা সংকটে জর্জরিত। অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতিতে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরানোই হবে নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তাদের মতে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, দুর্বল রাজস্ব ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, বিনিয়োগে গতি ফেরানো এবং ব্যাংক খাতের সংস্কার– এসব ক্ষেত্রে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের শুরু করা সংস্কার কার্যক্রমও অব্যাহত রাখতে হবে। ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। তারা ভঙ্গুর অর্থনীতিকে সচল করতে নানা পদক্ষেপ নেয়। কিছু সামষ্টিক সূচকে স্থিতিশীলতা এলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অস্বস্তি কাটেনি। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নতুন সরকারকে চলমান কাঠামোগত সংস্কার এগিয়ে নিতে হবে এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
এ জন্য অবশ্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নতুন সরকারের সামনে একাধিক বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। মূল্যস্ফীতি এখনও উচ্চপর্যায়ে, বিনিয়োগে স্থবিরতা আছে, কর্মসংস্থান বাড়েনি এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণে গতি নেই। অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংকিং খাতে কিছু সংস্কার শুরু করলেও তা শেষ করতে পারেনি। নতুন সরকারকে সেগুলো সম্পন্ন করতে হবে। পাশাপাশি নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিÑ যেমন মিড–ডে মিল, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাড়তি বরাদ্দ, ফ্যামিলি কার্ড–বাস্তবায়নে বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হবে। ঋণনির্ভর ব্যয়ে গেলে তা মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে। তাই ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, ট্যাক্স–জিডিপি অনুপাত বাড়াতে হবে। অপ্রত্যক্ষ করের চাপ কমিয়ে প্রত্যক্ষ কর বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে এনবিআরকে শক্তিশালী করা জরুরি। কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে রাজস্ব আদায়ও বাড়বে।
তা না হলে নতুন সরকারও ঋণের ফাঁদে পড়তে পারে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবে রাজস্ব আয় কমেছে। ফলে সরকার দেশি–বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক সরকারের ব্যয় তুলনামূলক বেশি হয়, নতুন সরকারের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হবে না। সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের চাপও আসতে পারে। কিন্তু আয় না বাড়িয়ে ব্যয় বাড়ালে ঋণনির্ভরতা বাড়বে। এতে ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিতে হলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হতে পারে, যা বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক ও অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনীতিতে মন্দা চলছে। অন্তর্বর্তী সরকার রাজস্ব ব্যবস্থায় সংস্কার শুরু করলেও অস্থিরতার কারণে রাজস্ব আয় কমেছে। আয় কম, ব্যয় বেশি– এই ভারসাম্যহীন অবস্থায় নতুন সরকার বড় ঘাটতির মুখে পড়বে। ব্যাংক খাত দুর্বল থাকায় সরকার বড় অঙ্কের ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়বে না, ফলে অর্থনীতি আরও চাপে পড়তে পারে। বর্তমানে সবচেয়ে দৃশ্যমান সংকট হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি। দীর্ঘদিন ধরে চড়া দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে।
সর্বশেষ হিসাবে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে পৌঁছেছে। এ পরিস্থিতিতে গত ৯ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদের হার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে। আইএমএফও সুদের হার কমানোর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাদের মতে, মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে না নামা পর্যন্ত নীতি সুদহার কমানো সম্ভব নয়। ফলে ঋণের সুদ কমার সম্ভাবনা নেই, যা ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের উদ্বিগ্ন করছে। বেসরকারি বিনিয়োগেও স্থবিরতা স্পষ্ট। গত ডিসেম্বরে বেসরকারি ঋণের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ২০ শতাংশে, যা দীর্ঘ সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। টানা আট মাস ধরে প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ঘরে রয়েছে। নতুন বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় ঋণের প্রবৃদ্ধি কমেছে। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যবসা–বাণিজ্যে আস্থা ফিরবে–এমন আশা থাকলেও উচ্চ সুদহার বিনিয়োগ বাড়ানোর পথে বাধা হয়ে থাকতে পারে। সবচেয়ে জটিল চ্যালেঞ্জ হবে দুর্বল ব্যাংক খাতকে স্থিতিশীল করা। বিগত সরকারের সময় অনিয়ম–দুর্নীতির কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে।
অনেক ব্যাংক তারল্য সংকটে রয়েছে। পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা সময়সাপেক্ষ হওয়ায় দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি কঠিন হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক তাদের পৃথক প্রতিবেদনে নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারলে বিনিয়োগে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে অর্থনীতিতে নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। নতুন সরকারের জন্য অর্থনীতিতে আস্থা ও স্থিতিশীলতা ফেরানোই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। সুসংগঠিত সংস্কার, কার্যকর রাজস্ব নীতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সমন্বয় ঘটাতে পারলেই অর্থনীতিকে টেকসই পথে ফেরানো সম্ভব হবে।



