ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর দুই থেকে চার দিনের মধ্যেই নতুন সরকারের শপথ নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের গেজেট প্রকাশের জন্য নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। নতুন কোনো পরিস্থিতি তৈরি না হলে ১৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে গেজেট প্রকাশ হতে পারে। এরপর ১৫ থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শপথের তারিখ নির্ধারণ করা হবে। প্রেসিডেন্ট মনোনীত কোনো ব্যক্তি শপথ গ্রহণ করাতে পারেন। সেই হিসেবে প্রধান বিচারপতি শপথ পাঠ করাতে পারেন। রমজানের আগে ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার আনুষ্ঠানিক ভাবে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে চায়। ইতোমধ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, সংসদ সচিবালয় ও বঙ্গভবনকে এজন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিতরা সংসদ সদস্যদের শপথের আয়োজন করা হবে। শপথ গ্রহণ শেষে সংসদ ভবনে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রাজনৈতিক দল সংসদীয় দলের সভা করবেন। ওই সভায় নতুন সংসদ নেতা নির্বাচন করবেন এমপিরা। নির্বাচিত করা হবে সংসদের উপনেতাও। পরে এমপিদের শপথের পর বঙ্গভবনে প্রেসিডেন্ট মো.সাহাবুদ্দিনের কাছে শপথ গ্রহণ করবে নতুন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা।
আর এর মধ্য দিয়ে নতুন সরকার গঠন করা হবে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক কর্মকর্তা ইনকিলাবকে বলেন, আগামী ১৫ থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শপথ অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। শপথ অনুষ্ঠানটি স্মরণীয়ভাবে আয়োজনের নির্দেশনা রয়েছে এবং আমন্ত্রিত অতিথিদের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। শপথ অনুষ্ঠান বঙ্গভবনের দরবার হলে হলেও এর ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। অতিথিদের আসা–যাওয়া, প্রটোকল ও নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। প্রেসিডেন্টের সামরিক বিভাগ শপথ অনুষ্ঠানের সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকবে বলে প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানান। দরবার হল ও আশপাশের আসন বিন্যাস নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এবিষয়ে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা ইনকিলাবকে বলেন, জাতীয় সংসদ ভবন এখন পুরোপুরি প্রস্তুত।
নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের গেজেট প্রকাশ হওয়ার সাথে সাথে এমপিদের শপথ হবে। জানা গেছে. মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, সংসদ সচিবালয় ও বঙ্গভবনকে এজন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বঙ্গভবন, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, সংসদ সচিবালয়, গণপূর্ত ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো জানায়, সংসদ সদস্যদের শপথ, নতুন সরকারের শপথ ও দায়িত্ব হস্তান্তর নিয়ে সরকারের একাধিক বৈঠক হয়েছে। কর্মকর্তারা সংসদ সচিবালয় ও গণভবন পরিদর্শন করে শপথ নেওয়ার প্রস্তুতি পরীক্ষা করেছেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের গেজেট প্রকাশের জন্য নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। নতুন কোনো পরিস্থিতি তৈরি না হলে ১৩ বা ১৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে গেজেট প্রকাশ হতে পারে। এরপর ১৬ থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শপথের তারিখ নির্ধারণ করা হবে। আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারিকেই জোর দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া নতুন প্রধানমন্ত্রীর জন্য চারটি বিকল্প বাসভবন নিয়ে আলোচনা চললেও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সংসদ সচিবালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনার পর সংসদ ভবনের যে ক্ষতি হয়েছিল, তা সংস্কার করা হয়েছে। এখন অধিবেশন পরিচালনায় কোনো বাধা নেই। এমপি হোস্টেল, ন্যাম ভবন এবং স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বাসভবনও সংস্কার করা হয়েছে। গতকাল প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব বলেন, সবচেয়ে দ্রুত সময়ে (ক্ষমতা) হস্তান্তর হবে। যদি দেখা যায় তিন দিনের মধ্যে এমন হয় যে সংসদ সদস্যরা শপথ নিয়েছেন, তারপর সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের লিডারকে (নেতা) ডাকা হচ্ছে যে আপনি আসেন শপথ নেন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে।
তিন দিনের মধ্যে এটা হয়ে যেতে পারে। আগামী ১৫ থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারিতে হতে পারে। আমরা মনে হয় না এটি ১৭, ১৮ ফেব্রুয়ারির পরে যাবে। প্রধান উপদেষ্টার উপ প্রেস সচিব মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ মজুমদার বলেন, নির্বাচনের পর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে যত দ্রুত সম্ভব দায়িত্ব হস্তান্তর করা হবে। এ বিষয়টি তিনি গতকালই জানিয়েছেন। আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, এটা (নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ) সরকারের নীতিগত পর্যায়ের সিদ্ধান্ত। এখন আপনাদের চূড়ান্ত কিছু বলতে পারব না। তবে আমাদের সামনে দুটি অপশন (বিকল্প) আছে। একটা হচ্ছে রাষ্ট্রপতি মনোনীত কোনো ব্যক্তি শপথ গ্রহণ করাতে পারেন। উদাহরণ হিসেবে হয়তো আমাদের প্রধান বিচারপতি হতে পারেন। আর এটা যদি না হয়, তাহলে আমাদের প্রধান নির্বাচন কমিশনার আছেন, তিনিই শপথ গ্রহণ করাবেন। এ ক্ষেত্রে একটি সমস্যা আছে, তিন দিন অপেক্ষা করতে হবে। আমরা আসলে অপেক্ষা করতে চাই না, আমরা নির্বাচন হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব শপথ গ্রহণের ব্যবস্থা করতে চাই। এদিকে নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন নির্বাচনের জন্য গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব নজরুল ইসলামকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি চারটি ভবন পরিদর্শন করেছেন। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন চূড়ান্ত করবে নতুন সরকার।
অস্থায়ীভাবে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা, সংসদ এলাকার স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বাসভবন অথবা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভবনের একটি ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে। বর্তমানে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা থাকেন। দায়িত্ব হস্তান্তরের পর রীতি অনুযায়ী কিছুদিন তিনি সেখানেই থাকতে পারেন। এ সময়ের জন্য বিকল্প বাসভবনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বসবাসের উপযোগী করে একাধিক বাড়ি প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নতুন সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের পরপরই যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে চায়। সেজন্য তারা আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছেন। নতুন সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী এবং উপদেষ্টারা পদাধিকারবলে ঢাকা শহরে সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের মাধ্যমে বিশেষ শর্তে ও কোটায় মিনিস্টার্স অ্যাপার্টমেন্ট বা বাংলো বরাদ্দ পান। পদ থেকে পদত্যাগ বা মেয়াদ শেষ হলে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাসা হস্তান্তর করতে হয়। ইতোমধ্যে দুজন উপদেষ্টা তাদের বসবাসের জন্য সরকার থেকে দেওয়া বাসা ছেড়ে দিয়েছেন। বাসাটি বুঝে নেওয়ার জন্য তারা গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন। সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের পরিচালক মো. আসাদুজ্জামান জানান, একজন উপদেষ্টার সরকারি বাসা ছেড়ে দেওয়ার চিঠি আমাদের দপ্তরে পাওয়া গেছে। গত ৩১ জানুয়ারি তিনি বাসা ছেড়েছেন বলে চিঠিতে উল্লেখ করেন।



