অন্তর্বর্তী সরকার শেষ সময়ে তড়িঘড়ি করে নানান বিতর্কিত প্রকল্প ও সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এসব সিদ্ধান্তের সঙ্গে বর্তমান সরকারের কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা না থাকলেও গোঁজামিল দিয়ে পরবর্তী সরকারের ওপর চাপ তৈরি করতে প্রকল্পগুলো নেওয়া হচ্ছে। সরকারের গৃহীত এসব সিদ্ধান্ত পরবর্তী সরকার বাস্তবায়ন করতে গেলে বড় ধরনের চাপে পড়বে। কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন মহলে তীব্র সমালোচনা হয়েছে। জুলাই আন্দোলনে অংশীজনদের জন্য দায়মুক্তি অধ্যাদেশ ক্ষমতার শেষে এসে তড়িঘড়ি করে জারি করা হয়েছে। সরকারি চাকরিজীবীদের নবম পে–কমিশন, মন্ত্রী ও আমলাদের জন্য বিলাসবহুল ফ্ল্যাট নির্মাণ, চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে চুক্তি, মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে সমরাস্ত্র জোন তৈরির ঘোষণা, র্যাবের জন্য ১৬৩টি গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে রকেট গতিতে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া, গণমাধ্যম আইন নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে। এসব উদ্যোগ জনস্বার্থের চেয়ে দেশিবিদেশি গোষ্ঠীর স্বার্থে বেশি কাজ করছে কি না, সেই প্রশ্ন সামনে তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। গৃহীত কিছু সিদ্ধান্তের সঙ্গে দীর্ঘ মেয়াদি অর্থনৈতিক ঝুঁকি ও জাতীয় নিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল প্রশ্ন জড়িত রয়েছে। পরবর্তী নির্বাচিত সরকার ও জনগণকে দীর্ঘমেয়াদে তার বোঝা এবং দায় বহন করতে হবে। এসব প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে যখন সরকারের হাতে আর কার্যকর সময় প্রায় নেই বললেই চলে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায় বর্তমান সরকার নিজেরা নিচ্ছে না। ভবিষ্যতের নির্বাচিত সরকারের কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে এক ধরনের শেষ মুহূর্তের গোঁজামিল সৃষ্টি করা হচ্ছে। তড়িঘড়ি করে সরকার বড় যে প্রকল্পটির কথা ঘোষণা করেছে সেটি হচ্ছে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে–স্কেল। ২০তম গ্রেডে সবচেয়ে বেশি ১৪৪ শতাংশ বেতন বাড়ানোর সুপারিশসহ প্রজাতন্ত্রের কর্মীদের মধ্যে বেশি মূল বেতন বর্তমান সচিবদের ৭৮ হাজার টাকা। যা ১০৫ শতাংশ বাড়িয়ে প্রস্তাব করা হয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
এর সঙ্গে অন্যান্য ভাতা ও আনুতোষিক মিলিয়ে একজনের মোট বেতন ছাড়াতে পারে ৩ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মচারীদের বেতন–ভাতা বাবদ বরাদ্দ প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা। তবে কমিশনের নতুন সুপারিশ বাস্তবায়ন হলে এ খাতে খরচ বাড়বে আরও প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা। পরবর্তী সরকার এ বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করবে। সরকারের বর্তমান নীতিনির্ধারকরা জানিয়েছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে–স্কেল বাস্তবায়ন বিষয়ে পে–কমিশনের প্রতিবেদন কেবল গ্রহণ করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়নের কোনো সিদ্ধান্ত বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার নেয়নি। বর্তমান সরকারের মেয়াদ আর মাত্র ১৫ দিনের মতো আছে। এই সময়ে এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেবে না এ সরকার। জুলাই গণ অভ্যুত্থান চলাকালে রাজনৈতিক প্রতিরোধমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণকারীদের ফৌজদারি দায়মুক্তি এবং আইনি সুরক্ষা দিয়ে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। ২৫ জানুয়ারি প্রকাশিত এক গেজেটে এ অধ্যাদেশ জারি করা হয়। গেজেটে বলা হয়, বাংলাদেশের ছাত্র–জনতা ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে ফ্যাসিস্ট শাসকের পতন ঘটানোর মাধ্যমে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি সর্বাত্মক গণ অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করে। যা পরবর্তীতে জুলাই গণ অভ্যুত্থান হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এই দায়মুক্তির গেজেট ক্ষমতার শেষ মুহূর্তে এসে কেন প্রকাশ করা হলো সেটা নিয়ে নানান আইনি জটিলতার কথা বলছেন অনেকে। পরবর্তী সরকারের জন্য বোঝা হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন। ১৭ মাসের মধ্যে এ অধ্যাদেশ না করে এখন শেষ সময় এসে গেজেট জারি করেছে। আইনবিদরা বলছেন, যেভাবে দ্রুততার সঙ্গে এই গেজেট জারি করা হয়েছে পরবর্তীতে আইনগত অনেক অসংগতি ও সংকট তৈরি করতে পারে। মন্ত্রীদের জন্য ৯ হাজার ৩০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট বানাবে সরকার।
ঢাকার মন্ত্রিপাড়ায় তিনটি ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে এ সরকার। এসব ভবনে থাকবে ৭২টি ফ্ল্যাট, যার আয়তন হবে ৮ হাজার ৫০০ থেকে ৯ হাজার ৩০ বর্গফুট। এজন্য নেওয়া হচ্ছে ৭৮৬ কোটি টাকার একটি প্রকল্প। নতুন তিন ভবন হবে বেইলি রোড ও মিন্টো রোডে। নতুন প্রকল্পে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী এবং সাংবিধানিক সংস্থার প্রধানসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের আবাসনের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। বিলাসবহুল এই প্রকল্প বর্তমান সরকার কেন নিয়েছে এর কোনো সদুত্তর নেই। এ প্রকল্প পরবর্তী সরকারকে চাপে ফেলতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। মন্ত্রীদের জন্য এত বড় আয়তনের ফ্ল্যাট নির্মাণের উদ্দেশ্য কী? কেউ বলতে পারে না। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ উপেক্ষা করে গণমাধ্যম কমিশন ও সম্প্রচার কমিশন নামে দুটি প্রতিষ্ঠান গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার ১০ মাসেও কোনো সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়নি। অথচ সরকারের মেয়াদের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে এখন জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় ‘জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর একটি খসড়া তৈরি করেছে। এমনকি এ কমিশন গঠনে মতামত দেওয়ার জন্য মাত্র তিন দিন সময় দিয়েছে। সংস্কার কমিশনের সুপারিশ উপেক্ষা করে তাড়াহুড়ো করে অনেকটা জোড়াতালি দিয়ে জাতীয় গণমাধ্যম অধ্যাদেশটি করতে যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন গত বছরের মার্চে প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল। সংস্কার কমিশনের প্রধান ছিলেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক কামাল আহমেদ। তাড়াহুড়ো করে সরকারের নেওয়া এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন তিনি। কঠোর বিধান রেখে সম্প্রচার নীতিমালা জারি করার তোড়জোড় শুরু করেছে সরকার। খসড়া জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন ও সম্প্রচার কমিশন অধ্যাদেশ সম্পর্কে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এ দুই সংস্থা তৈরির পর মাত্র তিন দিন সময় দিয়ে মতামত চাওয়া সরকারের বিদায়ি পরিহাস। প্রস্তাবিত কমিশনের গঠন ও স্ট্যাটাস, কমিশনারদের পদমর্যাদা ও কর্মক্ষমতা, প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনাসহ সব ক্ষেত্রে সম্পূর্ণভাবে আমলাতন্ত্রের কর্তৃত্বাধীন দুটি প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। খসড়া দুটিকে তড়িঘড়ি করে অধ্যাদেশে প্রণীত না করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।
দেশে আনম্যানড এরিয়াল ভেহিকল (ইউএভি) বা ড্রোন উৎপাদন, সংযোজন কারখানা স্থাপন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের লক্ষ্যে জি–টু–জি (সরকারি পর্যায়ে) কাঠামোর আওতায় চীনের রাষ্ট্রমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান চায়না ইলেকট্রনিক্স টেকনোলজি গ্রুপ করপোরেশন (সিইটিসি) ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে চুক্তি সই করেছে সরকার। এ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ও সিইটিসি ইন্টারন্যাশনাল যৌথভাবে বাংলাদেশে একটি অত্যাধুনিক ইউএভি বা ড্রোন উৎপাদন ও সংযোজন কারখানা স্থাপন করবে। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের কয়েক মাসের মধ্যেই চট্টগ্রাম নিউমুরিং ইজারা দেওয়ার জন্য তোড়জোড় শুরু করে। এ প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রামে শ্রমিকদের আন্দোলনের কারণে সরকার কিছুটা পিছিয়ে আসে। তবে ১ ফেব্রুয়ারি নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার চুক্তি করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে আদালতে এই চুক্তির বিরোধিতা করে রিট করা হয়। সেই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত সরকারের করা চুক্তি বৈধ বলে রায় দিয়েছেন। এখন সরকার তড়িঘড়ি করছে দ্রততম সময়ের মধ্যেই চুক্তি সই করার জন্য। যেকোনো সময় ইজারা দেওয়ার জন্য এই চুক্তি স্বাক্ষর হতে যাচ্ছে!
শেষ সময় এসে ৪৫ হাজার কোটি টাকার ২৫ প্রকল্প অনুমোদন :
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ৪৫ হাজার ১৯১ কোটি ২৭ লাখ টাকা ব্যয় সংবলিত ২৫টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ১০ হাজার ৮৮১ কোটি ৪০ লাখ টাকা, প্রকল্প ঋণ ৩২ হাজার ১৮ কোটি টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ২ হাজার ২৯১ কোটি ৭৮ লাখ টাকা পাওয়া যাবে। গত ২৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় সভায় এই অনুমোদন দেওয়া হয়। এই প্রকল্পে সরকারের পছন্দের ব্যক্তিকে খুশি করতেই বেশির ভাগ গ্রহণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি একটি বিশেষ এলাকার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। সরকারের একদম শেষ সময় এসে এসব প্রকল্প লুটপাটের ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। ওই দিনের সভায় একনেকের অনুমোদন ছাড়াই ৫০ কোটি টাকার ক্ষুদ্র কয়েক প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করেছে–যা শুধু সভায় অবহিত করা হয়। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে তড়িঘড়ি করে সরকার নিয়োগ দিয়ে যাচ্ছে। র্যাবের জন্য আসন্ন নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং র্যাবের আভিযানিক কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে ১৬৩টি গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। উন্মুক্ত দরপত্রের পরিবর্তে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে এসব গাড়ি কেনার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ১৬৩টি গাড়ি কেনার চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হলেও এ খাতে কত টাকা ব্যয় করা হবে সেটা সরকার প্রকাশ করেনি।
সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ চলতি অর্থবছরের জন্য সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘আরামকো ট্রেডিং (সিঙ্গাপুর) পিটিই লিমিটেড’ থেকে স্বল্প মেয়াদে পাঁচটি এলএনজি কার্গো আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের এই তড়িঘড়ি করে নেওয়া প্রকল্প নিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আগামী সরকারের মন্ত্রীদের জন্য ঢাকার মন্ত্রিপাড়ায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাট নির্মাণ, নির্বাচনি দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের জন্য সিদ্ধান্ত বহাল রয়েছে। গত দেড় বছরে প্রায় কয়েক লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছে। নির্বাচনের মাত্র ১২ দিন আগে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে কনসেশন চুক্তি এবং নির্বাচনের ছয় দিন আগে জাপানের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করতে অন্তর্বর্তী সরকার গোপন তৎপরতা চালাচ্ছে। সব যুক্তি, তথ্য এবং জাতীয় স্বার্থ অগ্রাহ্য করে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল দীর্ঘমেয়াদে ইজারা দেওয়া ও যথাযথ আলোচনা ছাড়াই জাপানের সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তির ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকারের এ তৎপরতায় অস্বচ্ছতা, গোপনীয়তা এবং তাড়াহুড়ো খুবই সন্দেহজনক। দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ‘ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক’ বলে তারা বিবৃতিতে উল্লেখ করে।


