ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাঠে ভোটার আকৃষ্ট করতে রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিশ্রুতির ঝাঁপি খুলেছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের দিকে এবার বেশি মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে। কারণ মোট ভোটারের প্রায় এক–তৃতীয়াংশই ১৮ থেকে ৩৩ বছরের মধ্যে। এনসিপি তাদের ৩৬ দফা ইশতেহারে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, চাঁদাবাজি বন্ধ ও দুর্নীতি রোধের শ্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিএনপি ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি তরুণ ও শিক্ষার্থীদের টেকসই উন্নয়নে এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে, যেখানে দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা তৈরিও গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। জামায়াত ক্ষমতায় এলে ‘প্রত্যেক নাগরিকের হাতে কাজ’ তুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যাতে বেকারত্ব ও সামাজিক বৈষম্য কমানো সম্ভব হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ভোটার তালিকায় তরুণদের সংখ্যা বাড়ায় রাজনৈতিক দলগুলো এবার উন্নয়ন ও আদর্শের পাশাপাশি চাকরি ও জীবিকার প্রশ্নকে নির্বাচনের মূল ইস্যুতে পরিণত করেছে। গতকাল এনসিপি তাদের ৩৬ দফা ইশতেহারে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। দলটির দাবি, তরুণদের উৎপাদনমুখী কাজে যুক্ত না করা গেলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
অন্যদিকে বিএনপি সাম্প্রতিক বক্তব্যে ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি টেকসই উন্নয়ন কার্যক্রমে তরুণদের এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। কর্মসংস্থানের পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা তৈরির ওপরও জোর দিচ্ছে। জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনী বক্তব্যে বলছে, তারা ক্ষমতায় এলে ‘প্রত্যেক নাগরিকের হাতে কাজ তুলে দেওয়ার’ ব্যবস্থা করবে। দলটির মতে, নৈতিকতা ও সুশাসনের সঙ্গে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা গেলে বেকারত্ব ও সামাজিক বৈষম্য কমানো সম্ভব। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৪ সালের গণ–আন্দোলনে মূল ভূমিকা ছিল তরুণদের। নির্বাচন নিয়েও অতীতের সময়ের চেয়ে তরুণরা আগ্রহী। বর্তমানে মোট ভোটারের এক–তৃতীয়াংশই তরুণ। তাই তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে সব প্রার্থী বিশেষ মনোযোগ দিচ্ছেন। তরুণরা ভোটকেন্দ্রে গেলে নির্বাচনের ফল যে কোনো দিকে মোড় নিতে পারে। ফলে আসন্ন নির্বাচনে জয়–পরাজয়ের চাবিকাঠি তরুণদের হাতেই থাকবে। নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মোট ভোটারের সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ছয় কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭, নারী ভোটার ছয় কোটি ২৮ লাখ সাত হাজার ৯৪২। এর মধ্যে ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সী ভোটার প্রায় চার কোটি ৩২ লাখ। জাতীয় যুবনীতি অনুযায়ী ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সসীমাকেই ‘যুব’ বা ‘তরুণ’ হিসেবে গণ্য করা হয়।
এতে দেখা যায়, দেশের মোট ভোটারের প্রায় এক–তৃতীয়াংশই তরুণ জনগোষ্ঠী। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০০৮ সালের পর তিনটি জাতীয় নির্বাচনে তরুণদের বড় অংশ ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে তরুণরা দল ও প্রার্থীদের কর্মকাণ্ড ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারছেন। তারা এবার অন্ধভাবে কোনো দলকে ভোট দেবে না। তারা বিশ্লেষণ করেই ভোট দেবেন। ফলে জয়–পরাজয়ের নির্ধারক হয়ে উঠতে পারেন তরুণ ভোটাররা। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত হবে, তাদের ইশতেহারে পরিষ্কারভাবে তরুণদের স্বার্থ তুলে ধরা। ঢাকা কলেজে অর্থনীতির ছাত্র আলীম হাসান বলেন, গত জাতীয় নির্বাচনের আগে ভোটার হলেও এবারই প্রথম ভোট দিতে যাবেন। গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে তিনি প্রার্থীদের পর্যবেক্ষণ করছেন। তিনি মার্কা দেখে নয়, প্রার্থীকে দেখে ভোট দেবেন। তবে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রার্থীর সততার পাশাপাশি দেশের প্রতি কমিটমেন্টও তিনি দেখবেন। সেই সঙ্গে দেশের স্বার্থে প্রার্থীর দল বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থ আদায়ে কী ধরনের প্রভাব তৈরি করতে পারবে সেই বিষয়টিও বিবেচনা করবেন। গত ২২ জানুয়ারি সিলেটের হজরত শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরাণ (রহ.)-এর মাজার থেকে বিএনপির নির্বাচনী প্রচার শুরু করেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
এদিন সিলেটের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠের জনসভায় তারেক রহমান বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ধানের শীষকে বিজয়ী করলে দেশের মানুষকে স্বাবলম্বী করা হবে। ফ্যামিলি কার্ডের মতো বিশেষ সহায়তাসহ বেকার সমস্যা সমাধান করে দেশের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে। তরুণ ভোটারদের আকৃষ্টে বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি নিচ্ছে বিএনপি। এর মধ্যে গত রবিবার চট্টগ্রামের একটি হোটেলে তরুণদের সঙ্গে ‘দ্য প্ল্যান : ইয়ুথ পলিসি টক উইথ তারেক রহমান’-এ অংশ নেন। এতে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন শাখার প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে বিএনপির প্রধান তারেক রহমান বলেন, তরুণদের অংশগ্রহণেই আমরা আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব। চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও দুঃশাসনমুক্ত ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতিতে ভোটের মাঠে প্রচার করছেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। বক্তৃতায় তিনি বলেন, আমরা যুবকদের হাতে বেকার ভাতা নয়, তাদের হাতে হাতে কাজ তুলে দিতে চাই। যুবসমাজকে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে তাদের সম্মানিত করতে চাই। জুলাই বিপ্লবে তাদের যে অবদান, কিছুটা হলেও তার ঋণ শোধ করতে চাই। ভোটের মাঠে অঞ্চলভিত্তিক প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। গতকাল শুক্রবার দুপুরে নোয়াখালী জিলা স্কুল মাঠে আয়োজিত ১১ দলীয় জোটের নির্বাচনী জনসভায় তিনি বলেন, নোয়াখালীবাসী বিভাগ চায়, সিটি করপোরেশন চায়।
আমরা ক্ষমতায় গেলে ইনসাফের মাধ্যমে এই দাবিগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করব। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩৬ দফা ইশতেহার ঘোষণা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এতে ভোটাধিকারের বয়স ১৬ বছর করা, আগামী ৫ বছরে দেশে ১ কোটি সম্মানজনক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যবসার রাজনৈতিক ব্যয় শূন্যে নামাতে চাঁদাবাজি সম্পূর্ণ বন্ধ এবং এককালীন তহবিল দিয়ে রিভার্স ব্রেন ড্রেইন (মেধাবীদের দেশে ফেরানো) করাসহ বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি। নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়, স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবসার রাজনৈতিক ব্যয় শূন্যে নামাতে চাঁদাবাজি সম্পূর্ণ বন্ধ করা হবে। মুদ্রাস্ফীতি ৬ শতাংশে নামানো হবে, ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর অর্থনৈতিক ডেটা প্রকাশ বন্ধ করা হবে, রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ স্বাধীনতা ও স্কুলভিত্তিক আর্থিক শিক্ষা চালু করে জনগণের সঞ্চয় ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। আগামী পাঁচ বছরে দেশে এক কোটি সম্মানজনক কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বলা হয়। সরকার–নিয়ন্ত্রিত প্লেসমেন্ট, ভাষা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বছরে ১৫ লাখ নিরাপদ ও দক্ষ প্রবাসী কর্মী গড়ে তোলা হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এনসিপি নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করলেও প্রধান দুইটি দল বিএনপি ও জামায়াত এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের ইশতেহার ঘোষণা করেনি। দল দুইটির নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি শেষপর্যায়ে। দ্রুতই তারা নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করবে। তাদের নির্বাচনকালীন তাদের বক্তব্যই ইশতেহারে তুলে ধরা হবে। তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করাতে উভয় দলই ইশতেহারে চমক রাখবে।


