মানুষ ও অমানুষ, এ শব্দদ্বয়ের মধ্যে আক্ষরিক ব্যবধান যে খুব একটা বেশি রয়েছে তা বলা যাবে না। মূল শব্দ হলো মানুষ যার পূর্বে একটি উপপদ জুড়ে দিলে অর্থ হয়ে গেল নেতিবাচক বা বিপরীত অর্থবহনকারী শব্দ।
প্রশ্ন জাগে, কে এই মানুষ? মানুষের নির্মাতাই বা কে? অবশ্য এক সুমহান নির্মাতা তাকে সৃষ্টি করেছেন, এক বিশেষ সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে তিনি সৃষ্টি করেছেন।
কিতাবী বর্ণনায় দেখা যায়, তিনি অর্থাৎ খোদ নির্মাতা হলেন অদৃশ্য মহাপরাক্রমি, বিজ্ঞ, প্রাজ্ঞ, অনন্তকালস্থায়ী সত্ত্বা, যাকে চর্মচোখে দেখতে পাওয়া যায় না।
তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন স্বীয় প্রতিবিম্বে, ঐশি গুণাবলী দিয়ে, যাকে বলা চলে খোদার ফটোকপি হিসেবে। যেমন কোনো মুল্যবান দলিলের ফটোকপি দিয়ে মূল দলিলের বিষয় প্রাঞ্জল ধারণা লাভ করা সম্ভব। খোদা নিজের হাতে মানুষ সৃষ্টি করেছেন, যেন তারা স্বভাব আচরণে বাতেনী খোদার হুবহু প্রকাশ ঘটাতে পারেন।
প্রশ্ন জাগে, কে মানুষের বিষয় সর্বপ্রথম বর্ণনা বা ঘোষণা দিয়েছেন? অবশ্যই নির্মাতা নিজেই, মানুষ সৃষ্টির পূর্বে কারো পক্ষে মানুষের বিষয় ধারণা করা ছিল সম্পূর্ণ অসম্ভব! মহান মাবুদ মানুষ সৃষ্টি করার প্রস্তাব ফেরেশতাদের কাছে ঘোষণা করলেন। তিনি জানতে চাইলেন, এমন প্রস্তাবে তাদের নিজস্ব মতামত। ফেরেশতাকুল পরিষ্কার নেতিবাচক মন্তব্য করে বসলেন। খোদা তখন তাদের বললেন, “আমি যা জানি, তোমরা তা জান না।” ফেরেশতাদের মন্তব্য ছিল, মানুষ জগতে ঝগড়া ফাসাদ এবং পরষ্পরের রক্তক্ষরণ ঘটাবে। বাস্তবে কি দেখা যায়? প্রথম মানুষ হযরত আদম ও বিবি হাওয়ার প্রথম জোড়া পুত্র কাবিল স্বীয় সহোদর ভ্রাতা হাবিলকে খুন করে বসলো।
মানুষের এহেন পাপাচারিতা সৃষ্টি লগ্ন থেকে চলে আসছে। আর এমন বর্ণনা খোদা নিজেই দিয়েছেন। বিশ্বের যাবতীয় ভাষায় আমরা তা দেখতে পাব। আদমের যুগে কোন ভাষা কার্যকর ছিল, তা কি আপনি জানেন? তার কাছে ঘোষিত মাবুদের বাণী অবশ্যই এমন বর্ণনা দিয়েছে। আদমের পরবর্তী পর্যায়ে নবী–রাসুলগণের কাছেও খোদার হেদায়েত বাণী প্রচারিত হয়েছে। কারো কাছে সহিফা আকারে প্রকাশ পেয়েছে, আবার কারো কাছে গ্রন্থাকারে প্রকাশ পেয়েছে। আর কেউ পূর্বের প্রকাশিত সহিফাসমূহ সংকলন করে সাধারণের কাছে পরিবেশন করেছেন।
মজার বিষয় হলো, খোদা মানুষের জন্য যা কিছু করেছেন, অর্থাৎ মানব কল্যানজনক কর্মকান্ড, সেগুলোর বর্ণনা বহুবার বর্ণীত হলেও খোদা কিন্তু একবারই প্রকাশ করেছেন। যেমন একটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরছি: সুরা আল ইমরান আয়াত নং ৩। নাজ্জালা আলাইকাল কিতাবা বেল হাক্কি মুসাদ্দিকাল্লিমা বাইনা ইয়াদাইহি, ওয়া আনজালাত তাওরাতা ওয়াল ইঞ্জিলা।
তিনি সত্য সহকারে তোমার উপর কিতাব অবতীর্ণ করেছেন, যা ইতোপূর্বে অবতীর্ণ কিতাবের সত্যতার সাক্ষ্য প্রদানের জন্য এবং তিনি তৌরাত ও ঈঞ্জিল প্রদান করেছেন।
বিবেচ্য বিষয় হলো, সত্যসহকারে “যার অর্থ দাড়ায়, কেবলমাত্র একজন সত্যবাদীর পক্ষে সদা সত্য কথা বলা সাজে। কোনো মিথ্যাবাদীর কাছ থেকে সত্য প্রত্যাশা করা নির্বুদ্ধিতা ছাড়া অধিক কিছু নয়।” যার হস্ত ভ্রাতার রক্তে হয়েছে রঞ্জিত, তেমন ধোকাবাজদের কাছ থেকে কেউ কি সত্য প্রত্যাশা করতে পারে? বিষয়টি আপন আপন হৃদয়ে বিবেচনার জন্য রেখে দিলাম।
একটা সাধারণ দৃষ্টান্ত তুলে ধরছি। প্রাকৃতিক সৃষ্টি, গ্রহ–নক্ষত্র, চন্দ্র–সূর্য গোটা বিশ্বে আলো দিয়ে ফিরছে। লক্ষকোটি লোক এর দ্বারা হচ্ছে উপকৃত, শতসহ¯্র ভাষায় তাদের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে, তাই বলে ভাষার ভিন্নতার বা বহুধার কারণে সূর্য বা চন্দ্র কিন্তু বহুসংখ্যক নয়। একইভাবে খোদার বিষয়ে হাজার প্রকার ভাষায় বয়ান দেয়া হচ্ছে বিশ্বব্যাপী, অথচ খোদা তো মাত্র একজনই। “বনি–ইসরাইলরা, শোন, আমাদের মাবুদ আল্লাহ্ এক। তোমরা প্রত্যেকে তোমাদের সমস্ত দিল, সমস্ত প্রাণ ও সমস্ত শক্তি দিয়ে তোমাদের মাবুদ আল্লাহকে মহব্বত করবে” (দ্বি:বি ৬:৪)। “তোমরা অনেক অনেক দিন আগেকার বিষয় স্মরণ কর। আমিই আল্লাহ্, অন্য আর কেউ নয়; আমিই আল্লাহ্, আমার মত আর কেউ নেই” (ইশাইয়া ৪৬:৯)। “মাবুদ বলছেন, “মিসর থেকে তোমাকে বের করে আনবার সময় থেকে আমিই তোমার মাবুদ আল্লাহ্। আমি ছাড়া তোমার আর কোন মাবুদ নেই; আমি ছাড়া তোমার আর কোন উদ্ধারকর্তা নেই” (হোসেয়া ১৩:৪)। “তোমাকে, অর্থাৎ একমাত্র সত্য আল্লাহকে আর তুমি যাঁকে পাঠিয়েছ সেই ঈসা মসীহকে জানতে পারাই অনন্ত জীবন” (ইউহোন্না ১৭:৩)।
এবার আমরা দেখে নেব, মানুষ এবং তাদের ভাষা। মানুষ হলো খোদার হাতে সৃষ্ট, খোদার প্রতিনিধি, “ইন্নি যায়েলুন ফিল আরদি খালিফা”। কার প্রতিনিধি এই মানুষ? অবশ্যই মানব নির্মাতা মহান খোদার। মানুষের দায়িত্ব হলো খোদার পক্ষে প্রতিনিধিত্ব বজায় রাখা। ব্যক্তির স্বভাব আচরণ, কর্মকান্ড ইত্যাদি দেখে বাতেনি খোদাকে দেখতে পাবে, এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা নিজেদের জীবনাদর্শ রূপান্তরীত করতে উৎসাহ পাবে। তাই বলে মানুষের ভাষা একক নয়। বর্তমান বিশ্বে প্রচলিত ভাষার সংখ্যা প্রায় ৭১৫৯টি রয়েছে। সমাজের পন্ডিত ব্যক্তিরা বড়জোর ১০/২০টি ভাষায় পান্ডিত্ব অর্জন করতে পারে, তাই বলে সাত হাজার ভাষা বোঝার মত কোনো লোক বিশ্বে থাকতে পারে কি? অসম্ভব! সেই সুবাদে ভাষাগত দিক দিয়ে আমরা আপামর জনতা সকলে ঐক্যে আসতে না পারলেও মানুষ হিসেবে সকলে সহজেই এক কাতারে উপনীত হতে পারি। আমরা সকলেই মানুষ, খোদার সুরতে গড়া, খোদার যোগ্য প্রতিনিধি, খোদার প্রজ্ঞা, পবিত্রতা, প্রেম সহমর্মীতা বজায় রেখে বিশ্বে শান্তি ফিরিয়ে আনতে পারি এবং তা বজায় রাখতেও পারি।
ভাষার উপর নির্ভর করে আমরা কতদূর যেতে পারব? মাবুদের দয়া, প্রেম, প্রজ্ঞা ও সার্বজনীন অনুকম্পার উপর বিশ্বাস ও আস্থা বজায় রেখে আমাদের পক্ষে তার নৈকট্য লাভ করা সম্ভব। যেমন লেখা আছে, “আল্লাহ্র রহমতে ঈমানের মধ্য দিয়ে তোমরা নাজাত পেয়েছ। এটা তোমাদের নিজেদের দ্বারা হয় নি, তা আল্লাহ্রই দান। এটা কাজের ফল হিসাবে দেওয়া হয় নি, যেন কেউ গর্ব করতে না পারে। আমরা আল্লাহ্র হাতের তৈরী। আল্লাহ্ মসীহ্ ঈসার সংগে যুক্ত করে আমাদের নতুন করে সৃষ্টি করেছেন যাতে আমরা সৎ কাজ করি। এই সৎ কাজ তিনি আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন, যেন আমরা তা করে জীবন কাটাই” (ইফিষিয় ২ : ৮–১০)।
পৃথিবীতে আদম থেকে অদ্যাবধি নবীরাসুলদের সংখ্যা অগণিত। প্রত্যেকের ভাষা ছিল আলাদা আলাদা, যুগকলাপ, তাও ভিন্ন ভিন্ন, রুজিরুটি, তাও ছিল যার যার তার তার, তবে তারা সকলেই খোদার সুরতে গড়া মানুষ। আপন সুরতে খোদা মানুষই সৃষ্টি করেছেন। উদ্দেশ্য মাত্র একটিই, নিজেকে জনসাধারণের কাছে প্রকাশ করা। যে ব্যক্তি খোদার পথে চলে, সে তো খোদারই বহিপ্রকাশ। আর যে খুনাখুনি, মারামারি করে বিশ্বটাকে নরককুন্ডে পরিণত করে তুলেছে, সে হলো অবিকল ইবলিসের দোসর ও কব্জাবন্দি। পৃথিবীতে সকল মানুষ গুনাহ করে খোদার গৌরব মহিমা বিনাশ করে ছেড়েছে। “দেখ, মাবুদের হাত এত খাটো নয় যে, তিনি উদ্ধার করতে পারেন না; তাঁর কানও এত ভারী নয় যে, তিনি শুনতে পান না। কিন্তু তোমাদের অন্যায় মাবুদের কাছ থেকে তোমাদের আলাদা করে দিয়েছে। তোমাদের গুনাহের দরুন তিনি তাঁর মুখ তোমাদের কাছ থেকে ফিরিয়ে নিয়েছেন; সেইজন্য তিনি শোনেন না। তোমাদের হাত রক্তে আর আংগুল গুনাহে নাপাক হয়েছে। তোমাদের মুখ মিথ্যা কথা বলেছে আর তোমাদের জিভ্ দুষ্টতার কথা বলে” (ইশাইয়া ৫৯ : ১–৩)।
সমস্ত গুনাহগারদের মধ্যে মাত্র একজনকেই খুঁজে পাবেন যিনি হলেন সম্পূর্ণ বেগুনাহ। তিনি হলেন কালেমাতুল্লাহ, যাকে রুহুল্লাহ বলেও আখ্যাত করা হয়। তিনি হলেন বিশ্বের তাবৎ গুনাহগার ব্যক্তিদের বিকল্প কোরবানিযোগ্য মেষ। মানবজাতিকে ভালবেসে তিনি কোরবানি হলেন, যেন বিশ্বাস এনে সকলে নিজেদের পাপের কোরবানি দিতে পারে। কোরবানির মেষ হতে হবে সম্পূর্ণ নিখুঁত। একইভাবে খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসীহ হলেন সম্পূর্ণ নিষ্পাপ, ঐশি সন্তান, পাকরূহের মানবরূপ প্রকাশ। তাঁর পুরো জীবন হলো বাতেনি খোদার হুবহু প্রকাশ “এই পুত্রই হলেন অদৃশ্য আল্লাহর হুবহু প্রকাশ। সমস্ত সৃষ্টির আগে তিনিই ছিলেন এবং সমস্ত সৃষ্টির উপরে তিনিই প্রধান, কারণ আসমান ও জমীনে, যা দেখা যায় আর যা দেখা যায় না, সব কিছু তাঁর দ্বারা সৃষ্ট হয়েছে (কলসীয় ১ : ১৫–১৬)।
কোরান শরীফে প্রদত্ত শিক্ষা হলো: হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর উপর ঈমান আনো, তাঁর রাসুলের উপর, সেই কিতাবের উপর যা তিনি তাঁর রাসুলের উপর নাযিল করেছেন এবং সেই কিতাবগুলোর উপর যা তিনি পূর্বে নাযিল করেছিলেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসুলগণ এবং শেষ দিনের প্রতি কুফরি করে– সে তো সুদূর ভ্রান্তিতে পতিত হলো। (সুরা আল নিসা ৪ : ১৩৬)
তোমার প্রতিপালকের বাণী সত্য ও ন্যায়ের দিক থেকে পরিপূর্ণ হয়েছে। তাঁর বাণী পরিবর্তন করার কেউ নেই। আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। (সুরা আল আনআম ৬ : ১১৫)
ফেরেশতাগণ বললেন, হে মরিয়াম! আল্লাহ তোমাকে তাঁর পক্ষ থেকে একটি কালেমার সুসংবাদ দিচ্ছেন; তার নাম হবে মসীহ ঈসা ইবনে মরিয়াম। সে দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মানিত এবং আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্তদের একজন। সে দোলনায় থাকা অবস্থায় এবং পরিণত বয়সেও মানুষের সাথে কথা বলবে এবং সে সৎ কর্মশীলদের একজন হবে। মরিয়ম বললেন, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে কোনো পুরুষ স্পর্শ না করলেও আমার সন্তান কীভাবে হবে? তিনি বললেন, এভাবেই আল্লাহ যা চান তিনি তা সৃষ্টি করেন। তিনি যখন কোনো বিষয়ের ফয়সালা করেন, তখন শুধু বলেন: ‘হও’, আর তা হয়ে যায়। (সুরা আল ইমরান ৩ : ৪৫–৪৭)
মসীহ (ঈসা) কখনোই আল্লাহর বান্দা হতে লজ্জাবোধ করেন না, এবং নিকটবর্তী ফেরেশতারাও নয়। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদত থেকে অহংকার করে এবং গর্ব করে, তিনি সবাইকে তাঁর কাছে একত্রিত করবেন। (সুরা আল নিসা ৪ : ১৭২)
এখন প্রশ্ন হলো, মহাপবিত্র মহাজ্ঞানী খোদা যাকে বেগুনাহ বলে ঘোষণা দিলেন, আমাদের মত গুনাহগার বান্দাদের পক্ষে তাঁকে অন্যথা বলি কোন অধিকারে? অবশ্যই সর্বান্তকরণে, মানবজাতিকে নাজাতদানের জন্য খোদার মহান পরিকল্পনা বিশ্বাসপূর্বক কবুল করে নিতে হবে। মনে রাখবেন কোনো মানুষ তার স্বীয় ধার্মিকতা বা কর্মকুসলতা দিয়ে নিজের গুনাহের কাফফারা থেকে অবমুক্ত করার ক্ষমতা আদৌ রাখে না। মানুষের ধার্মিকতা খোদার পবিত্রতার তুলনায় ছেড়া মলীন ঘৃণীত ন্যাকড়া তুল্য। মানুষ সদা দ্বিচারিতায় ভোগে। “সেই আগেকার কাল থেকে তুমি ছাড়া আর কোন মাবুদের কথা কেউ কানেও শোনে নি চোখেও দেখে নি, যিনি তাঁর অপেক্ষাকারীর জন্য কাজ করে থাকেন” (ইশাইয়া ৬৪ : ৬)
পরম করুনাময় মেহেরবান মাবুদ স্বীয় মহব্বতের তাগিদে নিজেই উদ্দ্যেগ নিয়ে মানুষকে গুনাহমুক্ত করার সার্বিক ব্যবস্থা সুসম্পন্ন করেছেন। “আমি, আমিই আমার নিজের জন্য তোমার অন্যায় মুছে ফেলি; আমি তোমার গুনাহ্ আর মনে আনব না” (ইশাইয়া ৪৩ : ২৫)


